
আজ সকালে এক বন্ধুর বাবার মৃত্যুসংবাদ পেলাম। আমরা তো মানুষ-বড়ই স্বার্থপর। বন্ধুর বাবার মৃত্যুসংবাদ অন্তরের গহীন থেকে নিজের বাবার মৃত্যুর কথা মনে করিয়ে দেয়। আর তখন বন্ধুর কষ্ট ভুলে নিজের কষ্ট নিয়েই আর বাঁচি না। সৌজন্যমূলক রেস্ট ইন পিস বলে নিজের অসমাপ্ত সেই আত্মার সম্পর্কের কাটাকুটি খেলতে বসে খেই হারিয়ে মৃত্যু বিষয়ক চিন্তায় ভেসে গেলাম।
মৃত্যু—যে শব্দটি আমরা শুনতে চাই না, যে বিষয়টি নিয়ে আমরা স্বেচ্ছায় আলোচনা এড়িয়ে যাই, অথচ যার সঙ্গে আমাদের প্রত্যেকেরই একদিন সাক্ষাৎ হবেই। পৃথিবীর সমস্ত নিশ্চিত সত্যের মধ্যে মৃত্যু সম্ভবত একমাত্র সত্য, যা ধনী-গরিব, শক্তিশালী-দুর্বল, জ্ঞানী-অজ্ঞ—কাউকেই ছাড় দেয় না।
আমরা জীবনকে নিয়ে এত ব্যস্ত থাকি যে মৃত্যুকে প্রায়ই একটি দুর্ঘটনা বলে মনে হয়। অথচ মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য পরিণতি। জন্মের মুহূর্ত থেকেই আমরা ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে যেতে থাকি। তবুও যখন কোনো প্রিয় মানুষ চলে যায়, তখন আমরা বিস্মিত হই, ভেঙে পড়ি, প্রশ্ন করি—কেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমার মনে পড়ল কোথায় যেন পড়েছি যে , প্রকৃত অর্থে সর্বজ্ঞ কেবল মৃত ব্যক্তিই। কারণ জীবিত অবস্থায় আমাদের চেতনা ও উপলব্ধির পথে অসংখ্য বাহ্যিক বিষয় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
ধরা যাক, একটি জানালা খোলা আছে। সেই জানালা দিয়ে আমরা দূরের পাহাড়, আকাশ, মেঘ, গাছপালা, মানুষের বাড়িঘর—অসংখ্য দৃশ্য দেখতে পাচ্ছি। আমরা মনে করি, আমরা জগতকে জানছি। কিন্তু সত্যিই কি তাই? নাকি এই দৃশ্যগুলোই আমাদের মনকে ক্রমাগত বাইরে ব্যস্ত রাখছে?
আমাদের দৈনন্দিন জীবনও অনেকটা এমন। আমরা কাজ, সম্পর্ক, সাফল্য, ব্যর্থতা, আনন্দ, দুঃখ, ভয়, আকাঙ্ক্ষা—এসবের মধ্যে এমনভাবে জড়িয়ে থাকি যে অস্তিত্বের গভীরতম প্রশ্নগুলোর দিকে তাকানোর অবসরই পাই না। আমরা যা দেখি, যা স্পর্শ করি, যা নিয়ে চিন্তা করি, তার অনেকটাই হয়তো সাময়িক; কিন্তু সেই সাময়িকতার ভিড়েই আমরা চূড়ান্ত সত্যকে আড়াল করে রাখি।
এখন যদি সেই জানালাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়? যদি বাইরের আলো আর ভেতরে প্রবেশ না করে? তাহলে কী থাকে?
থেকে যায় অন্ধকার।
কিন্তু এই অন্ধকারকে আমরা সাধারণত ভুল বুঝি। আমরা মনে করি অন্ধকার মানেই শূন্যতা, সমাপ্তি কিংবা বিলুপ্তি। অথচ এই দর্শন বলছে, অন্ধকার হয়তো কেবল দৃশ্যের অনুপস্থিতি নয়; এটি বাহ্যিক বিভ্রান্তির অবসানও হতে পারে। যখন আর কোনো দৃশ্য, শব্দ কিংবা আকর্ষণ আমাদের মনকে ব্যস্ত রাখে না, তখন হয়তো অন্তর্দৃষ্টির একটি নতুন দরজা খুলে যায়।
এই অর্থে জীবন হলো সেই খোলা জানালা, যেখানে দৃশ্যের অফুরন্ত সমারোহ আমাদের মনকে বাইরের দিকে টেনে নিয়ে যায়। আর মৃত্যু হলো জানালা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরের গভীর অন্ধকার—যেখানে বাহ্যিক সবকিছু মিলিয়ে যায় এবং থেকে যায় কেবল অজানা এক নীরবতা।
মানুষ হিসেবে আমরা সেই নীরবতাকে ভয় পাই। কারণ আমরা জানি না তার ওপারে কী আছে। কিন্তু হয়তো মৃত্যুর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো এই যে, জীবনকে আমরা সম্পূর্ণভাবে অধিকার করি না। মানুষ, সম্পর্ক, ভালোবাসা—সবই একদিন আমাদের হাতছাড়া হবে। তাই ভালোবাসার মানুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার সময় আজই। ক্ষমা করার সময় আজই। ভালোবেসে বলার সময় আজই।
প্রিয়জনের মৃত্যু আমাদের শিখিয়ে দেয় যে শোক কোনো দুর্বলতা নয়; শোক হলো ভালোবাসার আরেকটি রূপ। আমরা কাঁদি কারণ আমরা ভালোবেসেছিলাম। আমরা শূন্যতা অনুভব করি কারণ একসময় সেই জায়গাটি পূর্ণ ছিল।
সময়ের সঙ্গে শোকের তীব্রতা কমে, কিন্তু ভালোবাসা কমে না। প্রিয় মানুষরা হয়তো আমাদের চোখের সামনে থাকেন না, কিন্তু তারা আমাদের স্মৃতি, মূল্যবোধ, অভ্যাস, গল্প এবং হৃদয়ের গভীরে থেকে যান। এক অর্থে তারা আমাদের মধ্যেই বেঁচে থাকেন।
আজ বন্ধুর বাবার মৃত্যুসংবাদ আমাকে আবার মনে করিয়ে দিল—মৃত্যু জীবনের বিপরীত নয়; বরং জীবনেরই একটি অংশ। আমরা কেউই তাকে এড়াতে পারব না। তাই হয়তো মৃত্যুকে ভয় পাওয়ার চেয়ে তাকে বুঝতে শেখা বেশি জরুরি। আর শোককে অস্বীকার করার চেয়ে তাকে আলিঙ্গন করা বেশি মানবিক।
কারণ শেষ পর্যন্ত, মৃত্যুর অন্ধকার যত গভীরই হোক না কেন, মানুষের ভালোবাসা তারও অনেক দূর পর্যন্ত আলো ছড়িয়ে যেতে পারে।

