
মা মৃত্যুক্ষণে যখন অতি কষ্টে শুধু বিড়বিড় করে উচ্চারণ করছিলেন আমার ও দ্বিতীয় পুত্র সৈয়দ আনোয়ারের নাম। তিনি চাইছিলেন শেষ মুহূর্তে ঘোলা চোখে পুত্রদ্বয়কে শেষবার দেখতে। আমরা দুইজন দেশের বাইরে ছিলাম। আমি যেতে পারতাম কিন্তু যাইনি। চোখের সামনে মায়ে মৃত্যুকষ্ট সহ্য করতে পারবোনা বলে।
আমার তৃতীয় ভাই সৈয়দ আকতার একা হাতে বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজন নিয়ে মায়ের শেষ যাত্রার সব সামলে নিলো। মাস খানেক পর দেশে ফিরে আমি গেলাম চট্টগ্রামের পুরোনো রেল স্টেশানের বিপরীতে বিশাল কবরস্থানে। আকাশ ছুইছুই বড় গাছের নিচে মায়ের কবর। হাঁটু মুড়ে বসে পড়লাম,চোখবুজে হাত বাড়িয়ে মায়ের পায়ের দিকে মাটি স্পর্শ করলাম। বন্ধু সৈয়দ রানা মুস্তাফীর দেয়া কালো পাঞ্জাবীতে বাতাসে বালি উড়ে এসে মাখামাখি। মনেমনে উচ্চারণ করলাম-মা,আপনিতো ভালো করে বোঝেন আমাকে।আপনি জানেন আমি কেন আসিনি।
পতেঙ্গার সাগর ছুইয়ে আসা বাতাসে কবরস্থানের গাছগাছালী কিছুটা অস্থির। সেই বাতাসের সাথে যেন মায়ের কন্ঠ ভেসে এলো – বাবা,তুমি আমার প্রথম সন্তান তোমাকে ভালো করে জানি! তুমি উড়নচন্ডি, নিজের মধ্যে নিজে ডুবে থাকা মানুষ। আজীবন তোমার ভালো চেয়েছি মৃত্যুর পরও তাই চাইবো। ভালো থেকো বাবা!
উঠে দাঁড়াতে যেন পাঞ্জাবীর কোণে টান পড়লো। মায়ে কথা শেষ হয়নি তিনি বলছেন- বাবা, তোমার স্ত্রী অস্থির তোমাদের একমাত্র কন্যা সন্তানের নামে তোমার শিল্পী হিসেবে সরকার থেকে পাওয়া রাজুকের প্লটটি হেবা করে সহসা দিয়ে দাও! আমি জানি এসবের জন্যে রাজুক অফিসে চক্করকাটা তোমার খুবই অপছন্দ। তোমারতো অনেক জানাশোনা দেখবে ভালো ভাবে হয়ে যাবে। দেরী করোনা, নিজর সংসারে প্রিয়জনদের শান্তিতে রাখতে হয়।
-এইতো ২০২৪ আগামী বছর করে ফেলবো কাজটি।এবার দেশে এসেছি নিজের পেইন্টিং নিয়ে আর্টবুকটির কাজ শেষ করতে। অনেক কষ্টে আকবর ভাইয়ের সুপারিশে বইয়ের ছয় লক্ষ বাজেটের চার লক্ষ স্পন্সার পাচ্ছি আই এফ আই সি ব্যাক থেকে। ব্যাকের এমডি সাওয়ার ভাই বলছেন অন্তত ছাপানো এক ফর্মা জমা দিয়ে টাকার চেকটি নিয়ে যেতে।
মায়ের ভেসে আসা কন্ঠস্বর থেমে গেলো। বুঝলাম, মা আমার ভালোর জন্যে যা চান সেটাই জানিয়েছেন। বই টই আগামী বছর ২০২৫শে আবার এসে করবো। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ফিরে মেয়ের নামে হেবা করতে ঝাপিয়ে পড়লাম রাজুক অফিসে। পৃথিবীতে কেউ নরকের নমুনা দেখতে চাইলে রাজুক অফিসে গেলেই দেখতে পাবে। তবে আমার জন্যে মোটামুটি সহজ হয় এই পুলসরতের সেতু পার হওয়া। জমিটির নামজারী মানে সরকার থেকে আমার নামে জমি হওয়ার বিড়ম্বনা অনেকটা সহজে ২০১১তে পার করে ছিলাম প্রয়াত শ্রদ্ধেয় সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের পদে পদে মিডিয়া শক্তি সহায়তায়। এবার তিনিতো নেই কি হবে তাহলে! গেলাম তাঁরই প্রিয় শিষ্য সম্পদক মুস্তাফিজ শফির কাছে। আবার পদেপদে মিডিয়া পাওয়ার ভালোই কাজ করলো। তবে ঘুষ ছাড়া হালাল হেবা করতে রাজুক মতিঝিল হেড অফিস আর উত্তরা সাব অফিসে আমার যাওয়া আসায় প্রায় চার মাস খরচ হয়ে গেলো। তবে রাজুকের দুই অফিসে বড় কর্তা মাঝারী কর্তা সবাই আদর যত্ন ও চা কফি লাঞ্চ এমনকি উত্তরা অফিসের এক কর্মকর্তা যার স্ত্রী পুলিশে বড়কর্তা তিনিতো প্রায় অফিসেই রাজকীয় লাঞ্চ খাওয়াতেন। একবার অফিস শেষে সাথে বেরুতে জোর করে নিয়ে গিয়ে উত্তরার দামী রেস্টুরেন্টে দারুণ স্টেক ও খাওয়ালেন।
শুধু দুর্ভাগ্য ২০২৪শে সব ওল্ট পালট হয়ে যাওয়ায় আই এফ আই সি ব্যাংকে ও সব বদলে গেলো। আমার বইয়ের স্পন্সারটি গেলো। ২০২৫শে দেশে যাইনি।২০২৬শে হয়তো চেষ্টে থাকবে যাওয়ার। তবে হেবা করে মেয়েকে উত্তরার ছোট্ট পল্টটি দিয়ে বড়ই নির্ভার লাগছে। স্ত্রী খুশি মেয়ে খুশি আমিও খুশি। মানুষের ছোট্ট একটি জীবনে খুশিটা খুবই দরকার।
টরন্টো, কানাডা

