টরন্টো টু দৌলতদিয়া

টরন্টো টু দৌলতদিয়া - the Bengali Times
দৌলতদিয়া পাটুরিয়া পয়েন্টে দেশের দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর দাবিতে স্থানীয়ভাবে মানববন্ধন ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে নতুন করে সরব হওয়ার খবর দেখা যাচ্ছে

দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া পয়েন্টে দেশের দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর দাবিতে স্থানীয়ভাবে মানববন্ধন ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে নতুন করে সরব হওয়ার খবর দেখা যাচ্ছে। পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় অনুমোদনের পর অনেকের মধ্যেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, একই সময়ে সরকার পক্ষে এত বড় দুটি ব্যয়বহুল প্রকল্প বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে, যদি প্রথমে পদ্মা ব্যারেজের কাজ শুরু হয়, তাহলে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর প্রকল্প বহু বছরের জন্য পিছিয়ে যেতে পারে বলেও অনেকে মনে করছেন।

এ প্রসঙ্গে প্রায় ২৩ বছর আগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কথা স্মরণ করা যেতে পারে। ২০০৩ সালের ২৭ মে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল “দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া পদ্মা ব্রিজ বাস্তবায়ন কমিটি” আয়োজিত এক সেমিনার। এতে সভাপতিত্ব করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এম এম রেজাউল করিম। উপস্থিত ছিলেন সাউথ ইস্ট ইউনিভার্সিটির তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক সমশের আলী, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আবুল বারকাতসহ ফরিদপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, মানিকগঞ্জ এবং বৃহত্তর খুলনা-যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চলের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। দৌলতদিয়া পয়েন্টে পদ্মা সেতুর গুরুত্ব নিয়ে কী-নোট উপস্থাপন করেন জনাব নুরুল আলম।

- Advertisement -

সভায় রাষ্ট্রদূত রেজাউল করিম অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মাওয়া পয়েন্টে পদ্মা সেতুর প্রাথমিক জরিপ পরিচালনা করেছিল। তবে সে সময় বিএনপি সরকারের আমলে পরিচালিত জাপানি জরিপে নিরপেক্ষ মূল্যায়নের মাধ্যমে দৌলতদিয়া পয়েন্টই অধিক উপযোগী হিসেবে বিবেচিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অধ্যাপক সমশের আলী বলেন, দৌলতদিয়ায় পদ্মা সেতু নির্মাণ করলে মাওয়া পয়েন্টের তুলনায় প্রায় অর্ধেক খরচে কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন অধ্যাপক আবুল বারকাত। তিনি বলেন, মাওয়ায় পদ্মা সেতু নির্মাণ করলে এর দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৮ কিলোমিটার, অথচ দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া পয়েন্টে তা হবে মাত্র সাড়ে ৩ কিলোমিটার। তার হিসাব অনুযায়ী, দৌলতদিয়ায় সেতু নির্মাণে ব্যয় হতো প্রায় ৫,০১৫ কোটি টাকা, যা মাত্র ১০ বছরেই উঠে আসতে পারত। অন্যদিকে মাওয়া-জাজিরা পয়েন্টে নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১০,৬৭৬ কোটি টাকা।

পরবর্তীতে সরকার পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ সরকার মাওয়া পয়েন্টেই দেশের প্রথম পদ্মা সেতু নির্মাণ করে, যার ব্যয় শেষ পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে পৌঁছায়।

উল্লেখ্য, ২০০১-২০০৫ মেয়াদে বিএনপি সরকারের সময় রাজবাড়ী-১ আসনের এমপি ছিলেন আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম। তিনি তখন থেকেই দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হিসেবে সক্রিয় ছিলেন।

আজ ২০২৬ সালে, যখন তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য এবং তার দল রাষ্ট্রক্ষমতায়, তখন তার উচিত হবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দৌলতদিয়া পয়েন্টে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। পদ্মা ব্যারেজ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প, তবে এটি অনেকাংশে একটি রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষী প্রকল্পও। ব্যারেজের আগে যদি দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর কাজ শুরু না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই সেতু প্রকল্প অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। সেই সঙ্গে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করার দায়ও তৈরি হতে পারে, যা খৈয়াম সাহেবের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য নেতিবাচক হতে পারে।

সবশেষে, শুরুতে যে প্রসঙ্গ দিয়ে লেখাটি শুরু করেছি সেখানে ফিরে আসি। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া পদ্মা সেতুর দাবিতে যারা মানববন্ধন বা আন্দোলনের কথা ভাবছেন, তাদের মনে রাখা প্রয়োজন—এটি শুধু গোয়ালন্দ বা রাজবাড়ীর স্থানীয় ইস্যু নয়। এই সেতু বাস্তবায়িত হলে উপকৃত হবে মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুরসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠী। তাই আন্দোলনকে শুধু স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে এসব জেলার মানুষকে সম্পৃক্ত করে একটি সমন্বিত ও বৃহত্তর জনমত গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে কার্যকরভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করতে হবে, যাতে সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই দাবির গুরুত্ব পৌঁছে যায়।

শুধু স্থানীয় মানববন্ধন নয়, বরং সমন্বিত আঞ্চলিক জনদাবিই পারে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের পথকে আরও শক্তিশালী করতে।

স্কারবোরো, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles