
উত্তর আমেরিকার টেলিযোগাযোগ খাতে ধীরগতির প্রবৃদ্ধি এবং বাড়তে থাকা প্রতিযোগিতার চাপের মধ্যে বড় ধরনের ব্যয় সংকোচন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে কানাডার অন্যতম শীর্ষ টেলিকম প্রতিষ্ঠান রজার্স কমিউনিকেশন্স। প্রতিষ্ঠানটি তাদের মোট জনবলের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার কর্মীকে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার বা অবসর গ্রহণের বিশেষ প্যাকেজ প্রস্তাব করেছে। শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি মানবসম্পদ পুনর্গঠন নয়; বরং পুরো কানাডীয় টেলিকম খাতের পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন।
কোম্পানিটি জানিয়েছে, তাদের ব্যবসায়িক ইউনিট ও কর্পোরেট কার্যক্রমের নির্দিষ্ট কিছু টিম এই কর্মসূচির আওতায় থাকবে। কর্মীদের জন্য এমন একটি সুযোগ রাখা হয়েছে, যেখানে তারা চাইলে স্বেচ্ছায় অবসর প্যাকেজ গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় নিতে পারবেন অথবা কোম্পানিতে থেকে ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে যুক্ত থাকতে পারবেন।
রজার্সের এক মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোম্পানির ব্যয় কাঠামো পুনর্গঠন করা হচ্ছে। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই কিছু টিমকে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার বা অবসর গ্রহণের বিকল্প দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এই কর্মসূচি কর্মীদের জন্য “একটি নতুন অধ্যায় শুরু করার কিংবা কোম্পানিতে থেকে যাওয়ার” সুযোগ তৈরি করবে।
তবে এই উদ্যোগে সব কর্মী অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন না। কোম্পানি স্পষ্ট করেছে যে ইউনিয়নভুক্ত কর্মীরা এই কর্মসূচির বাইরে থাকবেন। একই সঙ্গে অন-এয়ার ট্যালেন্ট, স্পোর্টসনেট প্রোডাকশন ইউনিটের কিছু কর্মী, এবং ম্যাপল লিফ স্পোর্টস অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্ট ও টরন্টো ব্লু জেসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মীরাও এই স্বেচ্ছা অবসর পরিকল্পনার আওতায় পড়বেন না।
রজার্স ইতোমধ্যে তাদের মূলধনী ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলতি বছরে প্রতিষ্ঠানটি তাদের পরিকল্পিত মূলধনী ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ কমিয়েছে। এখন কোম্পানিটি ২৫০ কোটি থেকে ২৭০ কোটি ডলার ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যেখানে পূর্ববর্তী পূর্বাভাস ছিল প্রায় ৩৫০ কোটি ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় ব্যয় হ্রাসের অর্থ হলো প্রতিষ্ঠানটি নতুন অবকাঠামো উন্নয়ন, নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিগত বিনিয়োগে আরও সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। কোম্পানি জানিয়েছে, কিছু প্রকল্প স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু প্রকল্পের বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে নগদ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে কানাডার নিয়ন্ত্রক সংস্থা কানাডিয়ান রেডিও-টেলিভিশন অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন্স কমিশন (সিআরটিসি)-এর সাম্প্রতিক নীতিগত পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করা হচ্ছে। সিআরটিসি এমন একটি কাঠামো তৈরি করছে, যার মাধ্যমে ছোট টেলিকম অপারেটররা নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে বড় কোম্পানিগুলোর নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে পারবে। সরকারের যুক্তি হলো, এতে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং ভোক্তারা তুলনামূলক কম দামে সেবা পাবেন।
কিন্তু রজার্সসহ বড় টেলিকম কোম্পানিগুলোর দাবি, এই নীতি তাদের বিনিয়োগ সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, বহু বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে তৈরি করা নেটওয়ার্কে অন্য কোম্পানিগুলো সহজে প্রবেশাধিকার পেলে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা কমে যেতে পারে।
কানাডার টেলিকম শিল্প এখন এক ধরনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে চায়, অন্যদিকে বড় অপারেটররা দাবি করছে যে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ তাদের ভবিষ্যৎ অবকাঠামোগত বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। রজার্সের এই সিদ্ধান্ত কর্মীদের মধ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। যদিও এটি বাধ্যতামূলক ছাঁটাই নয়, তবুও প্রায় ১০ হাজার কর্মীকে স্বেচ্ছায় বিদায়ের প্রস্তাব দেওয়ার ঘটনা প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক চাপের ইঙ্গিত বহন করছে।
শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক বছরে উত্তর আমেরিকার টেলিকম খাতে আরও ব্যয় সংকোচন, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং কর্মী পুনর্গঠনের প্রবণতা দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে উচ্চ সুদের হার, অবকাঠামো বিনিয়োগের বাড়তি ব্যয় এবং তীব্র বাজার প্রতিযোগিতা বড় টেলিকম কোম্পানিগুলোকে নতুন করে ব্যবসায়িক কৌশল নির্ধারণে বাধ্য করছে।
রজার্সের এই পদক্ষেপ তাই শুধু একটি কর্পোরেট সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি পুরো টেলিযোগাযোগ শিল্পের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনারও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে।

