
কানাডার টরন্টো শহরে একটি বহুতল ভবন কেনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে সিটি প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক জবাবদিহিতা নিয়ে। প্রায় এক কোটি ৬০ লাখ ডলারে কেনা পাঁচতলা একটি ভবনের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা হস্তান্তরের পরিকল্পনা ঘিরে এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে সিটি হল, একটি অলাভজনক সংস্থা এবং শীর্ষ পর্যায়ের এক আমলার নাম।
৭২০ ব্যাথার্স্ট স্ট্রিটে অবস্থিত পাঁচতলা ইটের তৈরি ভবনটি গত বছর কিনেছিল সিটি অফ টরন্টো। তবে ভবনটি কেনার কয়েক মাসের মধ্যেই সিটি কর্তৃপক্ষ ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা ভবনটির দাবি বা নিয়ন্ত্রণ একটি কমিউনিটি গ্রুপের কাছে হস্তান্তর করতে পারে। এই গ্রুপটি ভবনটিতে আদিবাসী পুরুষদের জন্য একটি আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করবে। ভবনটি বর্তমানে “না-মে-রেস” নামে পরিচিত নেটিভ মেন’স রেসিডেন্স হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনায় রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে গৃহহীন ও ঝুঁকিতে থাকা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সহায়তায় কাজ করছে।
ভবনটি কেনা হয়েছে সেন্টার ফর সোশ্যাল ইনোভেশন বা সিএসআই নামের একটি সংস্থার কাছ থেকে। বিতর্কের মূল সূত্র এখানেই। সংস্থাটির সহ-প্রতিষ্ঠাতাদের একজন প্যাট টোবিন বর্তমানে টরন্টো সিটির অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে একজন উচ্চপদস্থ আমলার প্রতিষ্ঠিত সংস্থার কাছ থেকে সিটির এ ধরনের বড় অঙ্কের সম্পদ কেনা স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে কি না।
সিটি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, পুরো প্রক্রিয়ায় স্বার্থের দ্বন্দ্ব এড়াতে প্রয়োজনীয় সব নীতিমালা ও প্রটোকল অনুসরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে প্যাট টোবিন সরাসরি মন্তব্য না করে সিটি প্রশাসনের বিবৃতির দিকেই ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, বহু বছর ধরেই সিএসআইয়ের সঙ্গে তার আনুষ্ঠানিক কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
তবে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে অ্যাবোরিজিনাল লেবার ফোর্স ডেভেলপমেন্ট সার্কেল (এএলএফডিসি)-এর সম্পৃক্ততায়। অ্যাবোরিজিনাল লেবার ফোর্স ডেভেলপমেন্ট হচ্ছে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, যা সিটির আবাসন তহবিল পরিচালনা করে। অভিযোগ রয়েছে, ৭২০ ব্যাথার্স্ট স্ট্রিটের ভবন চুক্তির সঙ্গে এএলএফডিসির একটি অনুল্লেখিত জমি বা অর্থ লেনদেন জড়িত থাকতে পারে।
২০২০ সাল থেকে টরন্টো সিটি হল এএলএফডিসিকে বিভিন্ন আবাসন ও গৃহহীনতা সহায়তা প্রকল্পে বিতরণের জন্য প্রায় ৩ কোটি ৯৪ লাখ ডলার দিয়েছে। শুধু তাই নয়, সিটি কাউন্সিল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে টরন্টোর আবাসন ও গৃহহীনদের জন্য বরাদ্দ অনুদানের ২০ শতাংশ অর্থ এএলএফডিসি পরিচালিত একটি বিশেষ ফান্ডিং স্ট্রিমে যাবে। সমালোচকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এমন এক সময় যখন সংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলোর লবিস্টরা সিটি প্রশাসনের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ চালাচ্ছিল। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
যদিও বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে অর্থ ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, তবে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো বলছে এই প্রকল্পের মানবিক গুরুত্ব অনেক বড়। এই ভবনটি পাওয়া গেলে টরন্টোর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। তার ভাষায়, “আমরা তৃণমূল পর্যায়ের মানুষদের সহায়তা করার চেষ্টা করছি। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে গৃহহীনতার হার অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং ভয়াবহ বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কানাডায় আদিবাসী জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য, দারিদ্র্য, মানসিক স্বাস্থ্য সংকট এবং আবাসন অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। টরন্টোর মতো বড় শহরেও তাদের একটি বড় অংশ আশ্রয় সংকটে ভুগছে। ফলে এ ধরনের আশ্রয়কেন্দ্র সামাজিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
পুরো ইস্যুতে টরন্টোর ডেপুটি মেয়র আনা বাইলাও চাউ-এর কার্যালয়ে একাধিকবার মন্তব্য চাওয়া হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। একইভাবে নেটিভ উইমেন’স রিসোর্স সেন্টারও কোনো মন্তব্য করেনি। প্রতিষ্ঠানটিও সিটি প্রশাসনের কাছ থেকে জমি পাওয়ার তালিকায় রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট সব জমি হস্তান্তরের বিষয় এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এগুলো কার্যকর হতে হলে সিটি কাউন্সিলের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
এই পুরো ঘটনাকে ঘিরে এখন দুই ধরনের ব্যাখ্যা সামনে আসছে। একদিকে সিটি প্রশাসন ও সামাজিক সংগঠনগুলো বলছে, এটি আদিবাসী গৃহহীনতা মোকাবিলায় একটি মানবিক ও জরুরি পদক্ষেপ। অন্যদিকে সমালোচকদের প্রশ্ন কেন একটি উচ্চপদস্থ আমলার প্রতিষ্ঠিত সংস্থার সঙ্গে এত বড় আর্থিক লেনদেন হলো, এবং পুরো প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল?
সরকারি অর্থ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় কেবল নিয়ম মেনে চলাই যথেষ্ট নয়; জনগণের আস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সিদ্ধান্তে স্বার্থের দ্বন্দ্বের সামান্য সম্ভাবনাও থাকলে সেটি প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। এখন সবার নজর টরন্টো সিটি কাউন্সিলের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে। কারণ এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি ভবনের মালিকানা নির্ধারণ করবে না, বরং সরকারি স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নেও নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।
সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

