শনিবার | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ | টরন্টো | কানাডা |

Breaking News:

  • অন্টারিওতে একাধিকবার প্রতিবাদের মুখে পড়েছেন জাস্টিন ট্রুডো
  • প্রদেশের সব স্কুল ৩০ সেপ্টেম্বর খোলা থাকবে
তুষার দাশের সঙ্গে

: ১০ এপ্রিল ২০২১ | লুৎফর রহমান রিটন |

২০১৭ সালের এক সন্ধ্যায় ঢাকা ক্লাবের জম্পেশ পার্টিতে

তুষার দাশকে আমি খুব পছন্দ করি। তিনিও আমাকে। কবি তুষার দাশ। আহসান হাবীবের কবিতা নিয়ে বৃহৎ কলেবরের একটা বইও লিখেছিলেন।

আমাদের সম্পর্কটা খুনসুটিপূর্ণ। দেখা হলে পরে, আড্ডায় আনুষ্ঠানিকতায় আমরা পরস্পরের লেগপুলিং-এ ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু কেউ কাউকে অন্যায্য ভাবে আক্রমন করি না। অসম্মান করি না। 

গেলো বছর বইমেলার সময় বাংলাদেশে গিয়েও আনন্দময় সান্নিধ্য পেয়েছি তাঁর।

কদিন আগে, বাংলাদেশে যখন মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে, ফেসবুকে দেখলাম সবুজ বাত্তি জ্বালিয়ে রেখেছেন তুষার দাশ। দিলাম একটা কল দূর পাল্লার। তারপর শুরু হলো আমাদের ম্যারাথন কথোপকথন। আমাদের দীর্ঘ আড্ডায় পারস্পরিক খোঁচাখুঁচি-শিল্পসাহিত্য-অতীত স্মৃতির বিষ ও মধু এবং পরচর্চা--কোনো কিছুই বাদ গেলো না।

আমার সম্পর্কে বিপুল উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন তুষার দা। আড্ডায় অনুষ্ঠানে সামাজিক সমাবেশে তাবড় তাবড় পার্সোনালিটিকে হাসতে হাসতে ধুলিস্যাৎ এবং ধরাশায়ী করার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তুষার দা বললেন--কাজটা তুমি করতে এমনই দক্ষতায় যে তাঁরা তোমার ওপর ক্ষুব্ধও হতে পারতেন না। তোমাকে খুব মিস করি রিটন।

আমাদের জেনারেশনে তুষার দাশই ছিলেন একমাত্র টাই পরা কবি। হ্যাঁ। একমাত্র। ঢাকার মতিঝিলে একটি বহুতলা ভবনে ইউনিট্রেন্ড নামের একটি বিজ্ঞাপন সংস্থার তিনি ছিলেন একজন কর্মকর্তা। ইন করে শার্ট পরতেন। ধোপদুরস্ত পরিপাটি কলারে ভাঁজ না পড়া হালকা রঙের ঝকঝকে ফুলস্লিভ শার্টের সঙ্গে নেভি বা রয়েল ব্লু টাই পরে অফিসে আসতেন। বসতেন একটি উন্মুক্ত কক্ষে। তাঁর সামনে থাকা ছোট্ট টেবিলটার স্বচ্ছ কাচের নিচে কয়েকটা পেপারকাটিং থাকতো সাম্প্রতিক কালের নোবেল বিজয়ী লেখক-কবির ছবিসহ। সাহিত্যে এ বছর কে নোবেল পেতে যাচ্ছেন-কেনো তাঁর পাওয়া উচিৎ-লড়াইটা কার সঙ্গে কার হবার সম্ভাবনা--এসব আলাপ লেগে থাকতো তাঁর ঠোঁটের ডগায়।    

আমি নিয়মিত ইউনিট্রেন্ডে যেতাম আমার পত্রিকা 'ছোটদের কাগজ'-এর বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত কাজে। তুষার দার কল্যাণে রেকিট এন্ড কোলম্যানের ডেট, ডেটল সাবান, ডেটল ওয়াটার প্রুফ প্লাস্টার বা স্টেরিল বা ব্যান্ড এইডের একটা পুরোপাতা চার রঙা বিজ্ঞাপন আমি পেতাম নিয়মিত। ডেটলের চুক্তি শেষ হয়ে গেলে পেতাম মরটিন মশার কয়েলের বিজ্ঞাপন।  অন্যদিন-এর সম্পাদক মাজহারুল ইসলামও আসতেন তুষার দাশের কাছে সেই বিজ্ঞাপন বিষয়েই।

ইউনিট্রেন্ডের বড়কর্তারাও আমাকে খুব পছন্দ করতেন। আমি যতোক্ষণ তুষার দাশের টেবিলে থাকতাম হাসির একটা হুল্লোড় চলমান থাকতো অফিসজুড়ে। তুষার দাশের কাছাকাছি একটা টেবিলে বসতেন লোদী। 

একদিন তুষার দাশ আমাকে বের করে দিয়েছিলেন তাঁর অফিস কক্ষ থেকে। ঘটনাটা বলি--

তখন মোবাইল এসেছে হাতে হাতে,মধ্যবিত্তের নাগালে। মোটামুটি পনেরো হাজার টাকায় গরিবানা একটা সেট কেনা যায়। তো একদিন ইউনিট্রেন্ডে গিয়ে এই কথা সেই কথার ফাঁকে প্রসঙ্গটা তুললাম আমি। তার আগে কয়েক দফা হাস্যরসের হুল্লোড় বয়ে গেছে অফিসে। তুষার দাকে বললাম, একটা মোবাইল কিনবো কিনবো করছি।

তুষার দা বললেন--তো কিনে ফেলো।

বললাম, পনেরো হাজার টাকা লাগে কিনতে। টাকার যোগাড় হয়ে গেছে। সামান্য একটু কম পড়েছে।

তুষার দা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন--কতো কম পড়েছে? কতো লাগবে তোমার? বলো আমাকে। আমি দিচ্ছি টাকাটা।

আমি বললাম, পনেরো হাজার লাগে তো, কিন্তু আমার কাছে আছে দুই হাজার।

তুষার দাশ লাফিয়ে উঠলেন চেয়ার থেকে--মিয়া ফাইজলামি করো? যাও বাইর হও এইখান থেকে। তিনি আঙুল দিয়ে দরোজা দেখিয়ে দিচ্ছেন আমাকে এবং তেড়ে আসছেন আমার দিকে

আমিও ভয় পাওয়ার ভান করে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে নিরাপদ দূরত্বে সরে গেলাম। পাশের কাচঘেরা কক্ষ থেকে বড়কর্তা জুলফিকার সাহেব হাসতে হাসতে বেরিয়ে এসে বিস্মিত চোখে বললেন--সে কী তুষার রিটন সাহেবকে আপনি তাড়িয়ে দিচ্ছেন!

তুষার দা বললেন ওকে মাইর দেয়া উচিৎ...

আমি এক দৌড়ে লিফটের সামনে। হাহ হাহ হাহ।

০২

সময়কাল নব্বুইয়ের দশক। 

১৯৯৬-৯৭ সালের কথা।  

বাজারে লাল মরটিন কয়েল নামবে। লাল মরটিন কয়েলকে জনপ্রিয় করতে ইউনিট্রেন্ড দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে দেশবাসীর কাছে দুই লাইনের একটি শিরোনাম বা শ্লোগান আহবান করলো। গদ্যে বা পদ্যে। যার বাণী সিলেক্টেড হবে তিনি পাবেন এক লক্ষ টাকা। ব্যাপক সাড়া পড়ে গেলো। চিঠির স্তুপ জমে গেলো ইউনিট্রেন্ডে। 

তুষার দা আমাকে ডেকে বললেন, তোমার নেতৃত্বে তিনজন ছড়াকারের  একটা বিচারক প্যানেল বানাও। প্রত্যেক বিচারককে আমরা দশ হাজার টাকা সম্মানী দেবো। 

আমি যে দু'জন ছড়াকারকে নির্বাচন করলাম তার একজন সুকুমার বড়ুয়া। বললাম, দাদাকে নিই। দশ হাজার টাকা পেলে দাদার বড় উপকার হবে। তুষার দা খুশি হলেন। 

নির্ধারিত দিনে ইউনিট্রেন্ডের একটি বন্ধ কক্ষে আমরা তিনজন বসলাম। আমাদের জন্যে পর্যাপ্ত চা-বিস্কুটের সরবরাহ রাখা হলো। তুষার দা আমাদের সামনে হাজির করলেন দুই বস্তা চিঠি। সত্যি সত্যি আক্ষরিক অর্থেই দুই বস্তা।

আমরা দুইজন অতি দ্রুততায় অতি ক্ষিপ্রতায় খাম ছেঁড়া এবং বাণী পড়ার পর অধিকাংশই গার্বেজ বিনে ফেলে দিচ্ছি। কিন্তু সুকুমার বড়ুয়া খুবই মন্থর। খুবই ধিরে সুস্থে তিনি খাম খোলা এবং বিমুগ্ধ নয়নে পাঠকদের পাঠানো বাণী কিংবা দুই লাইনের ছড়াটি পাঠ করে স্লো মোশনে সেগুলো সাজিয়ে রাখছেন টেবিলে। দাদার গতিতে কাজ করলে এতো চিঠি খুলতে পড়তে আমাদের দুই সপ্তাহ লেগে যাবে। কিন্তু দাদা বলে কথা। তাঁকে তাড়া দিলাম না। আমি শুধু চাইছি সম্মানীর টাকাটা দাদার হাতে তুলে দিতে।

তুষার দা এসে ফাঁকে ফাঁকে আমাদের সঙ্গ দিয়ে যান। আমি ইশারা করি--যান মিয়া। শেষ করতে হইবো। তুষার দা বুঝলেন দাদার পারফরম্যান্স ভয়াবহ রকমের স্লো। তিনি চিন্তায় পড়ে গেলেন। আমি উঠে তুষার দা-কে পাশের কামরায় নিয়ে গিয়ে আশ্বস্ত করলাম--নো চিন্তা। কাজ আমরা করে দিচ্ছি। দাদাকে শুধু খামটা দিয়ে দেবেন। তাঁকে আমি জেনে বুঝেই এনেছি। টাকাটা পেলে দাদার খুব উপকার হবে। খুশি হয়ে তুষার দা আমার কাঁধ চাপড়ে দিলেন।

রেস্টুরেন্ট থেকে আমাদের জন্যে বিশেষ লাঞ্চ প্যাকেট আনিয়েছে ইউনিট্রেন্ড কর্তৃপক্ষ। সুস্বাদু চায়নিজ। ফ্রায়েড রাইস-ভেজিটেবল গ্রেভি-ফ্রায়েড চিকেন এন্ড শ্রিম্প। আমার ফেভারিট।

মন ভরে গেলাম। খেয়েই ঝাঁপিয়ে পড়লাম। এর মধ্যে এক ফাঁকে তুষার দা সুকুমার বড়ুয়াকে খানিক বিরতি দিতে আমাদের কক্ষ থেকে নিজের কাছে নিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর দাদা ফিরে এসে যোগ দিলেন চিঠি ছেঁড়া প্রকল্পে। 

আমাদের সম্মিলিত ছেঁড়াছেঁড়ির কাজটা শেষ হলে আমরা তিনজন তিনটি খাম হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলাম ইউনিট্রেন্ড অফিস থেকে। দাদা খুব খুশি।

তুষার দা আমাকে বললেন--তুমি কাল সকালে একবার এসো। অবশ্যই এসো। জরুরি কাজ আছে। শার্প এগারোটা। এগারোটা মানে এগারোটা।

তুষার দা তখন থেকেই কর্পোরেট জগতের অধিবাসী। একিউরেট টাইম-এলিগেন্ট পোশাক আর টাই। এই তিনের সমন্বয়ে গড়া মানুষ। ঢাকায় আমার দেখা প্রথম এবং শেষ--টাই পরা কবি!

পরদিন সকাল এগারোটায় তুষার দা-র দফতরে গিয়ে এক অভাবনীয় ঘটনার মুখোমুখি হলাম। তুষার দা আমাকে গোপন একটি কক্ষে নিয়ে গিয়ে অতি অনুচ্চ কণ্ঠে যা বললেন তাতে আমি মহা বিস্মিত। বললেন--তোমার হেল্প ছাড়া এটা সম্ভব না। আমি চাই তুমি আমাকে সহযোগিতা করো। 

ঘটনাটা এমন--গতকাল তিনি আমাদের কাছ থেকে সুকুমার বড়ুয়াকে আলাদা করে নিজের কাছে নিয়ে গিয়ে দু'টো দুই লাইনের ছড়া লিখিয়েছেন মরটিন বিষয়ে। তারপর সেটা তাঁর কন্যার নামে (চন্দনা বা রঞ্জনা) দুইটা কাগজে সুকুমার দা-র হাতে কপি করিয়ে রেখে দিয়েছেন নিজের কাছে। তুষার দা চান কন্যার নামে সুকুমার দা-র হাতে এক লক্ষ টাকা তুলে দিতে।

আমি বললাম--আমার বিচারক জীবনে এইরকম বেআইনি কাজ আমি করি নি।

তুষার দা বললেন--মিয়া তুমিই তো চেয়েছিলে দাদাকে দশ হাজার টাকার খামটা পাইয়ে দিতে। কাজ তো দাদা কিছুই করে নাই বলতে গেলে। দাদার প্রতি তোমার ভালোবাসাটা দেখেই তো আইডিয়াটা এলো।

তুষার দা খুবই উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন আমার দিকে। 

আমি গম্ভীর।

আমি স্বভাববিরুদ্ধ নিরব।

টেনশনে তুষার দা সিগারেট ধরালেন মনে হয়।

বর্তমান এবং নিকট ভবিষ্যতের কম্বাইন্ড সিকোয়েন্সটা ভেবে সহসা আমার মনটা প্রফুল্ল হয়ে উঠলো। এক পশলা বৃষ্টির পর সেই বৃষ্টির রেণুমাখা দখিনা বাতাসে হৃদয় আমার প্লাবিত হয়ে গেলো যেনো বা। 

টাই পরা কবি তুষার দাশের মানবিকতা, গ্রেটনেস আমাকে মুগ্ধ করলো। একটা আলিঙ্গনে বেঁধে ফেললাম তুষার দা-কে। তুষার দা আমার পিঠে হালকা চাপড় দিতে দিতে বললেন--আমি জানতাম তুমি আমাকে অসম্মান করবে না। 

কিছুক্ষণ পর তুষার দা বললেন, আরেকটা দায়িত্ব তোমাকে পালন করতে হবে। এটা একমাত্র তুমিই পারবে।

আমি বললাম কি সেটা?

--এই প্রতিযোগিতার রেজাল্ট পত্রিকায় জানিয়ে দেয়া হবে। বিজয়ীর অর্থ বা সম্মানির টাকাটা তুলে দিতে শেরাটন বা সোনারগাঁ-য় একটা অনুষ্ঠান করবো আমরা। ফলোওড বাই ডিনার। আমাদের সেই অনুষ্ঠানটা খুব ঝাঁকজমকের সঙ্গে হবে। সুকুমার বড়ুয়াকে বলতে হবে তিনি যেনো কিছুতেই কন্যার সঙ্গে অনুষ্ঠানে হাজির না হন। তাহলে সবাই বুঝে যাবে নেপথ্য কাহিনি। 

আমি বললাম, ঠিক আছে। দাদাকে আমি বুঝিয়ে বলবো।

সুকুদাকে পাকড়াও করে বিস্তারির বুঝিয়ে বললাম তাঁকে। বললাম--রিটন সাহেব, (তিনি আমাকে সুকুমার বাবু আর আমি তাঁকে রিটন সাহেব সম্বোধন করি, আজও!) সেদিন  সেখানে আপনার কিছুতেই হাজির হওয়া চলবে না। তাহলে আমরা সবাই বিপদে পড়ে যাবো। তুষার দা তাঁর কলিগদের কাছে ছোট হবেন। আর ইউনিট্রেন্ডের কাছে ছোট হয়ে যাবো আমিও।

সুকুমার বড়ুয়া সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে বললেন, ঠিক আছে। ঠিক আছে! আমরা হেসে উঠলাম।

তুষার দাকে ফোন করে জানিয়ে দিলাম বিস্তারিত। আমার কথায় আশ্বস্ত হলেন তিনি।  

০৩

নির্ধারিত দিনে বিকেলেই আমি সেই পাঁচতারকা হোটেলের হলরুমে হাজির হলাম। পুরো অনুষ্ঠানটা উপস্থাপনা করবো আমি। লাল মরটিন নিয়ে একটা ছোট্ট নাটিকাও লিখে দিয়েছি ছন্দে ছন্দে। বিখ্যাত অভিনেতা আবদুল আজিজসহ একদল অভিনয়শিল্পী তাতে পারফর্ম করবেন। অনুষ্ঠান শুরু হলো। নানান আনুষ্ঠানিকতা চলছে। এরইমধ্যে দেখা গেলো হলরুমে ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া তাঁর কন্যাটিকে নিয়ে প্রবেশ করলেন বিপুল উদ্যমে! এবং একটি টেবিলে আসনও গ্রহণ করলেন সহাস্যে।

তুষার দা আমাকে ফিঁসফিসিয়ে বললেন, তুমি সুকুমার বড়ুয়াকে নিষেধ করোনি রিটন!  

আমি কটমট করে বললাম--শালারে পিটামু আমি তুষার দা... 

হেসে ফেললেন তুষার দা--আরে নাহ্‌ রাগ করো না। চেপে যাও। 

০৪ 

সপ্তাহ খানেক পর এক সকালে, সকালে মানে খুব সকালে, সাতটা সাড়ে সাতটায়, শার্লি আমাকে ডেকে তুললো--তাড়াতাড়ি ওঠ। দাদা এসেছেন তোর কাছে। 

কোন দাদা? কে দাদা? কেনো দাদা? (মহা বিরক্ত আমি। কারণ, নয়টা দশটার আগে আমি উঠতে পারি না ঘুম থেকে।)

আমাদের এলিফ্যান্ড রোডের বাড়িতে এরকম মাঝে মধ্যেই সহসা হাজির হতেন সুকুদা। তিনি মর্নিং ওয়াক করতে করতে চলে আসতেন আমার বাসায়। তাঁকে পেলে খুব খুশি হতো শার্লি। আমাদের দু'জনকে ডায়নিং টেবিলে বসিয়ে সকালের ব্রেকফাস্ট সার্ভ করতো শার্লি মহা আনন্দে। প্রিয় ছড়াকার বলে কথা! 

ঘুম ঘুম চোখ কচলাতে কচলাতে ড্রয়িং রুমে এসে দেখি একটা কলাপাতা রঙ পাঞ্জাবি পরে সুকুদা বসে আছেন হাসি হাসি মুখে। আমাকে দেখেই উল্লসিত হয়ে উঠলেন তিনি--সুকুমার বাবু এই যে দেখেন আমার মেয়ের কান্ড। জানেন তো মরটিন কয়েলের ছড়া লিখে এক লাখ টাকা পেয়েছে রঞ্জনা। সেই টাকায় এই পাঞ্জাবিটা সে আমাকে কিনে দিলো। তাই ভাবলাম পাঞ্জাবিটা আপনাকে দেখিয়ে নিয়ে যাই...। 

আমি বললাম, বাহ্‌ কী সুন্দর পাঞ্জাবিটা! আপনি বসেন রিটন সাহেব। আমি একটু ফ্রেস হয়ে আসি। নাস্তা করবো একসঙ্গে। 

তারপর এক দৌড়ে আমি বেডরুমে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ি বিছানায়। হাসতে থাকি হেচকি তুলে। কিচেন থেকে ছুটে আসে শার্লি--কি হলো তোর?  হাসতে হাসতে তো মারা পড়বি দেখছি!

অনেক কষ্টে হাসি চেপে শার্লিকে বললাম ঘটনাটা--'......জানেন তো মরটিন কয়েলের ছড়া লিখে এক লাখ টাকা পেয়েছে রঞ্জনা'......হাহ হাহ হাহ মায়ের কাছে মাসীর গল্প আর কাকে বলে! সুকুদা মানুষটা এতো সরল কেনো......

০৫

এই ঘটনাটা তুষার দাকে বলা হয়নি। আমার এই স্মৃতিগদ্যটা চোখে পড়লে আজ হয়তো জানবেন তুষার দা। আমার প্রিয় তুষার দাশ। টাই পরা একমাত্র কবি। গুড সৌল। আপাদমস্তক একজন ভালো মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করা কবি তুষার দাশ। যে বিভাগের ছাত্র ছিলাম আমিও।

এখন, ঢাকা ক্লাবে প্রতিদিন অভিজাত বনেদী ব্রান্ডের মদ্যপান করাই যেনো তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত! তুষার দাশের লেখা কম। কথা বেশি। সদানন্দ তিনি। 

ধনাঢ্য বন্ধু বেশি থাকা ক্ষতিকর। এটা আমি বুঝেছি কিঞ্চিৎ অগ্রজ তুষার দাশকে দেখে। 

প্রিয় তুষার দা, ভালো থাইকেন মিয়া। আটলান্টিকের এপার থেকে অনেক অনেক শুভ কামনা আপনার জন্যে। আপনার মতো ভালো মানুষেরা সংখ্যায় কমে যাচ্ছে দিন দিন। 

অটোয়া ০৫ এপ্রিল ২০২১


[email protected] Weekly Bengali Times

-->