শুক্রবার | ২৩ এপ্রিল ২০২১ | টরন্টো | কানাডা |

Breaking News:

  • নতুন ভ্যারিয়েন্ট কানাডাকে আবৃত করে ফেলতে যাচ্ছে : ট্রুডো
  • ভ্যাকসিনেশনের গতি বাড়াতে প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ : ডগ ফোর্ড
ডঃ নূরুন নবী রচিত ‘জাপানিদের চোখে বাঙালি বীর’

: ২ এপ্রিল ২০২১ | অধ্যাপক বিশ্বজিৎ পাণ্ডা, কোলকাতা |

ডঃ নূরুন নবীর তিনটি বই

বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমানের জন্ম শতবর্ষ এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মের ১২৫ বছর পূর্তির আবহে; আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সময়পর্বে প্রকাশিত হল ‘জাপানিদের চোখে বাঙালি বীর’। ডঃ নূরুন নবীর এই বইটি সমস্ত দিক থেকেই স্বতন্ত্রচিহ্নিত। বাঙালি বীরদের নিয়ে বাংলা ভাষায় কম লেখা হয়নি। কিন্তু এটি সেরকম বীরদের নিয়ে লেখা কোনও বই নয়। জাপানিরা যে সমস্ত বাঙালিদের বীর হিসেবে সম্মান জানিয়েছেন, তাঁদের নিয়েই বিন্যস্ত এই গ্রন্থ। সেই বীরদের তালিকায় আছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, রাসবিহারী বসু, বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। হ্যাঁ, জাপানিদের চোখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বীর ছিলেন। উল্লেখ্য রবীন্দ্রনাথ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে জাপানি সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন। 

লেখক দীর্ঘদিন জাপানে বসবাস করেছেন এবং জাপানিদের সঙ্গে গভীরভাবে মেলামেশা করেছেন। পাঁচজন বীরের সৌজন্যে বাঙালি হিসেবে জাপানিদের কাছে কিছুটা মর্যাদাও পেয়েছেন। সেই জাপান-বাসের অভিজ্ঞতার সূত্রে গ্রন্থটি রচিত। বস্তুত নূরুন নবি ছাড়া আর কারও পক্ষে এরকম একটি গ্রন্থ রচনা সম্ভব ছিল না। কারণ এই যাপন-অভিজ্ঞতা অন্য কোনও গবেষক-সাহিত্যিক-মুক্তি যোদ্ধার নেই। 

প্রথমেই লেখককে অভিবাদন জানাতে হয় পাঁচ বীরের মধ্যে রাধাবিনোদ পালকে বেছে নিয়েছেন বলে। বাকি চারজনকে নিয়ে কমবেশি ধারণা থাকলেও এই ব্যক্তি সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষ কিছুই জানেন না। অথচ এই বাঙালি বীর জাপানিদের কাছে একজন পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। জাপানিদের প্রতি তাঁর সহানুভূতিকে স্মরণ করার জন্য কিওতোর ইয়াসুকুনি মন্দিরের মাঠে রাধাবিনোদ পালের একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছে। ১৯৬৬ সালে জাপানের সম্রাট বিচারপতি পালকে পবিত্র ট্রেজার অর্ডার প্রথম শ্রেণিতে ভূষিত করেছেন। তাঁর জীবনী অবশ্য পাঠ্য জাপানের স্কুল-কলেজে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানিরা পরাজিত হয়েছিল। যুদ্ধকালীন জাপানিদের যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য অ্যামেরিকা আন্তর্জাতিক বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিল। সেই ট্রাইব্যুনালের একমাত্র ভারতীয় বিচারপতি ছিলেন এই বাঙালি রাধাবিনোদ পাল। একমাত্র তিনি বলেছিলেন জাপানিরা অপরাধী হলে অ্যামেরিকাও সমান অপরাধী। বিচারপতি পালের এই ঐতিহাসিক মত জাপানিদের স্বস্তি দিয়েছিল। 

বীর যোদ্ধাদের একই সূত্রে বেঁধেছেন লেখক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৬ সালে জাপান সফরে গিয়েছিলেন। রাসবিহারী বসুও জাপান গিয়েছিলেন তারই সূত্রে। প্রাণরক্ষার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মীয়ের ছন্দবেশে জাপানে নির্বাসনে গিয়েছিলেন তিনি। পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাসবহারীর দুর্দিনে ৬২১ রুপি পাঠিয়েছিলেন। রাসবিহারী বসু জাপানিদের সহায়তায় ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য গড়ে তোলেন ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগ এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি। আর সুভাষচন্দ্র বসু জাপানে গিয়ে রাসবিহারী বসুর কাছ থেকে ঐ লীগ এবং আর্মির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৪৩ সালের ৪ জুলাই ঐতিহাসিক দিনে রাসবিহারী বসু আই-আই-এল এবং আই-এন-এ-র সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং নেতাজিকে দায়িত্বভার অর্পন করেন। আবার বঙ্গবন্ধুকে জাপানিরা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর শেষ উত্তরসূরি মনে করত।   

নেতাজির মৃত্যু সংক্রান্ত বিভিন্ন তত্ত্ব ঐতিহাসিক তথ্যসহ তুলে ধরেছেন। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার একেবারে সাম্প্রতিকতম তথ্যও গ্রহণ করেছেন লেখক। ২০১৬ সালের ২৬ জুন উত্তরপ্রদেশ সরকার এলাহাবাদ হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিষ্ণু সহায়ের নেতৃত্বে সহায় কমিশন গঠন করেন। কমিশন জানান, অধিকাংশ সাক্ষী গুমনামি বাবাকে নেতাজি বলেছেন। একজন নিষ্ঠাবান গবেষক না-হলে এরকম আপডেটেড নথি ব্যবহার করা যায় না। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, লেখক নেতাজি-মৃত্যু বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হননি। নিরপেক্ষ গবেষকের মতো সমস্ত সম্ভাবনাগুলোকে তথ্যসহ তুলে ধরেছেন।

গ্রন্থটির একটি ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে। জাপানে রবীন্দ্রনাথের জঙ্গি জাতীয়তাবাদ বিরোধী বক্তৃতা সমালোচিত হয়েছিল। সেই কথাও এড়িয়ে যাননি লেখক। চিনে গিয়েও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এরকম সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। কিন্তু কবিগুরু জাপানে যথেষ্ট সম্মানও পেয়েছিলেন। জাপানের সঙ্গে চমৎকার সম্পর্ক ছিল তাঁর। ১৯৮১ সালে রবীন্দ্রনাথের ১২০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে একটি আবক্ষ স্মারক ভাস্কর্য স্থাপন করা হয় নাগানো-প্রিফেকচারের কারুইজাওয়া শহরের উপকণ্ঠে আসামা পর্বতের সবুজ পাদদেশে। এটাই জাপানে কবির প্রথম ভাস্কর্য। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বঙ্গবন্ধু মুজিব আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে জাপান গিয়েছিলেন। রাধাবিনোদ পাল গিয়েছিলেন কর্মসূত্রে। রাসবিহারী বসু এবং সুভাষচন্দ্র বসুকে জাপান আশ্রয় দিয়েছিল। জাপানে সুভাষচন্দ্র বসু এবং রাসবিহারী বসুর ইতিহাস কিংবদন্তীর মতো স্থান পেয়েছে। রাসবিহারী প্রকাশ্যেই জাপানিদের সহানুভূতি ও ভালোবাসার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। সর্বার্থেই রাসবিহারীর প্রাণরক্ষা করেছিল জাপানিরা। রাসবিহারীকে বাঁচানোর জন্য জাপানের সোমা পরিবারের মেয়ে তোসিকো বিয়ে করেছিলেন। জাপানিরা জাতীয়তাবাদী এবং রক্ষণশীল ছিল। রক্তের বিশুদ্ধতার জন্য তারা গর্ব অনুভব করে। বিদেশীদের পছন্দ করলেও তাদের মেয়েদের বিদেশিদের সঙ্গে বিয়ে দিতে চায় না। লেখক বলছেন, “এটি একটি জাতীয় ব্রত ছিল—জাতিগত বিদ্বেষ নয়।” এই একটি লাইন থেকে বোঝা যায় নূরুন নবী কতটা গভীরভাবে মিশতে পেরেছিলেন জাপানিদের সঙ্গে। আমরা সম্প্রীতির কথা বলি। সম্প্রীতির জন্য সবার আগে দরকার সম্পর্ক তৈরি করা। লেখক সেই সম্পর্ক তৈরি করতে পেরেছিলেন জাপানিদের সঙ্গে। তাই এই বিষয়টিকে জাতিগত বিদ্বেষ মনে হয়নি তাঁর। এখান থেকেই বোঝা যায় লেখকের জীবনবোধ ও জীবন-দর্শন। এরকম অজস্র বাক্য মণিমুক্তোর মতো ছড়িয়ে রয়েছে গ্রন্থটির পাতায় পাতায়। লেখকের জীবন-দর্শন প্রতিভাত হয়েছে বলে এটি শুধু একটি আলোচনা গ্রন্থ হয়ে থাকেনি। শেষ পর্যন্ত তা সাহিত্যে উন্নীত হয়েছে।     

এই পাঁচ বীরের শুধু জাপানে কাটানোর দিনগুলোর কথা বলেননি লেখক। তাঁরা যে ঐতিহাসিক সময় পর্বের ভিতর দিয়ে গিয়েছিলেন, এমনকি মুক্তিযোদ্ধা লেখক যে ঐতিহাসিক সময় পর্বের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন তার কথাও এসেছে। পাঁচ বীরের মহিমা স্বতন্ত্রভাবে প্রেক্ষিতসহ তুলে ধরেছেন। জাতির পিতার কথা বলতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কাজ করার ব্যক্তি অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা বলেই হয়তো এই বীরদের বীরত্বের আখ্যান তাঁর বীক্ষায় অন্যভাবে প্রতিভাত হয়েছে। প্রায় একশ বছরের বাংলা ও বাঙালির সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক ইতিহাসকে তুলে ধরেছেন ডঃ নবী।          

 জাপান আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে অ্যামেরিকার প্রভাবের বলয়ে থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করে এবং বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের যুদ্ধাপরাধের তীব্র নিন্দা করেছিল। বাংলাদেশের বাইরে একমাত্র জাপানেই প্রগতিশীল ছাত্র সমাজ শেখ মুজিবর রহমানের মুক্তির জন্য আন্দোলন করেছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জাপানি মিডিয়ায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। লেখক সকৃতজ্ঞ চিত্তে তা স্বীকার করেছেন।  

গ্রন্থের শেষে লেখকের স্বীকারোক্তি—“এই গ্রন্থটি উইকিপিডিয়া, ইউটিউব এবং ইন্টারনেট-এ পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রচিত”। নাহ্‌। এটি লেখকের অতি বিনয়ের পরিচয়। কিছু তথ্য হয়তো পেয়েছেন এইসব আন্তর্জালিক প্ল্যাটফর্ম থেকে। কিন্তু গ্রন্থটি লেখা হয়েছে মূলত লেখকের অভিজ্ঞতা এবং স্মৃতি যাপনের সূত্রে। এটাই গ্রন্থটির প্রকৃত পরিচয়। তাই তো শুধু তথ্য-নির্ভরতায় গ্রন্থটি শেষ হয়ে যায়নি। অন্য একটি মাত্রা পেয়েছে। তার মূলে রয়েছে লেখকের বীক্ষা অভিজ্ঞতা এবং অনুভবের ব্যপ্তি। কিছু রিপিটেশন আছে। হয়তো প্রতিটি অধ্যায় আলাদাভাবে কোথাও প্রকাশিত হয়েছিল বলেই এই পুনরুক্তি। কিন্তু সব মিলিয়ে একটি চমৎকার তথ্যনির্ভর সাহিত্য গ্রন্থ এটি। 

বইটা পড়তে পড়তে বাঙালি হিসেবে একটা গর্ব হয়। এই বইয়ের পাঠক্রিয়ায় মনে হয়—জাপানিদের কাছে আমাদের, বাঙালিদের, ভারতীয়দের কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ। জাপানিদের চোখে বাঙালি বীরদের কথা বলতে গিয়ে লেখক প্রকৃতপ্রস্তাবে বাঙালিদের পক্ষ থেকে জাপানিদের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন। আমরা, বাঙালিরাও তাই কৃতজ্ঞ হতে থাকলাম গ্রন্থকার ডঃ নূরুন নবীর কাছে।  

প্রকাশকঃ  অনন্যা, ঢাকা, বাংলাদেশ।ফেব্রুয়ারি, ২০২১। মূল্য  ৩৫০.০০ টাকা