শুক্রবার | ২৩ এপ্রিল ২০২১ | টরন্টো | কানাডা |

Breaking News:

  • নতুন ভ্যারিয়েন্ট কানাডাকে আবৃত করে ফেলতে যাচ্ছে : ট্রুডো
  • ভ্যাকসিনেশনের গতি বাড়াতে প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ : ডগ ফোর্ড
মেধাবী ও জনপ্রিয় কবি আর্ভিং লেইটন

: ২৯ মার্চ ২০২১ | সুব্রত কুমার দাস |

জনপ্রিয় কবি আর্ভিং লেইটন

২০১২ সালের ১২ মার্চ টরন্টোর হার্ভার ফ্রন্টে কবি আর্ভিং লেইটনের জন্মশতবার্ষিকী পালনে উপস্থিত ছিলেন লিওনার্দো  কোহেন এবং মার্গারেট অ্যাটউডসহ গণ্যমান্য লেখকবৃন্দ। এই উপলক্ষে সারা কানাডা জুড়ে অন্তত চব্বিশটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল তাঁকে স্মরণ করতে। বলা হয়ে থাকে যে কেপ ব্রেটন থেকে ভাঙ্কুভার পর্যন্ত সারা কানাডাজুড়ে এই উৎসব চলেছিল যেমনটি কানাডার ইতিহাস অতীতে কখনও পরিলক্ষিত হয়নি। 

চুরানব্বই বছরের জীবনে মোটামুটি সব মিলিয়ে আর্ভিঙেয়ের কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশ। শেষ দশ বছর আলঝেইমারে আক্রান্ত হয়ে নিষ্ক্রিয় ছিলেন দুর্দান্ত প্রতিভাসম্পন্ন এই কবি। তাঁর চিঠিপত্র প্রকাশিত হয়েছিল তিনটি খÐে। এছাড়া ষোলোটি ডিসকোগ্রাফি করেছেন বিংশ শতাব্দীর কানাডীয় সাহিত্যের শক্তিমান এই কবি। রুমানিয়ান বংশোদ্ভূত এই কবির নাম ১৯৮১ এবং ১৯৮৩ সালে নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য প্রস্তাবিত হয়েছিল বলে জানিয়েছে গার্ডিয়ান পত্রিকা (জানু ২৩, ২০০৬)। ১৯৫৯ সালে তিনি কবিতায় গভর্নর জেনারেল পুরস্কার পান। ১৯৭৬ সালে তাঁকে ‘অর্ডার অব কানাডা’য় অফিসার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁর নামে মন্ট্রিয়লে একটি রাস্তার নামও করা হয়েছে।

বিশাল কাব্যসম্ভারের মধ্যে আর্ভিং-এর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলো হলো : ‘দ্য বøাক হান্টসমেন’ (১৯৫১), ‘অ্যা রেড কার্পেট ফর দ্য সান’ (১৯৫৯), ‘দ্য পোল-ভল্টার’ (১৯৭৪), ‘দ্য সিলেক্টেড পোয়েমস্ অব আর্ভিং লেইটন’ (১৯৭৭), ‘ফাইনাল রেকনিং : পোয়েমস ১৯৮২-১৯৮৬’ (১৯৮৭), ‘অ্যা ওয়াইল্ড পিকুলিয়ার জয় : সিলেক্টেড পোয়েম ১৯৪৫-১৯৮২’ (১৯৮২) ইত্যাদি। আর্ভিং নিজে একটি আত্মজীবনী লিখেছিলেন ‘ওয়েটিং ফর দ্য মেসিয়াহ’ (১৯৮৫) শিরোনামে। ১৯৭৮ সালে আর্ভিং-এর সাহিত্যজীবনকে মূল্যায়ন করে প্রথম একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। শিরোনাম ছিল ‘আর্ভিং স্টোন : দ্য পোয়েট অ্যান্ড হিজ ক্রিটিকস’। আর্ভিং-এর জীবনী লিখেছেন ফ্রান্সিস ম্যান্সব্রিজ Ñ শিরোনাম ‘আর্ভিং লেইটন: গড’স রেকর্ডিং অ্যাঞ্জেল’। ১৯৮৫ সালে আভিংয়ের বর্ণিল জীবন নিয়ে খ্যাতিমান জীবনীকার এলসপেথ ক্যামেরন প্রকাশ করেন পাঁচ শতাধিক পৃষ্ঠার জীবনী ‘আর্ভিং লেইটন: অ্যা পোট্রেট’। ১৯৯০ সালে সমসাময়িক বহু সাহিত্যকর্মীর স্মৃতিকথা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল ‘রেইজিং লাইক অ্যা ফায়ার: অ্যা সেলিব্রেশন অব আর্ভিং লেইটন’। 

আর্ভিংয়ের প্রথম কবিতার বই ‘হেয়ার অ্যাÐ নাও’ প্রকাশিত হয় ১৯৪৫ সালে। এর আগে উনিশ বছর বয়সে তাঁর প্রথম কবিতা ‘ভিজিল’ প্রকাশিত হয়েছিল। ‘হেয়ার অ্যাÐ নাও’ ১৯৩১ সাল থেকে চৌদ্দ বছর ধরে লেখা কবিতাগুলোর সংকলন। ‘ভিজিল’ কবিতাটি লেখা হয়েছিল আর্ভিংয়ের প্রথম প্রেমিকা সুজান রোজেনবার্গের অনুপ্রেরণায়। বলে রাখা যেতে পারে যে সুজানের সাথে আর্ভিংয়ের প্রেম শুরুর হয় ১৯২৯ সালে। সতের বছরের এই তরুণের জীবনের অভিঘাতগুলোকে এই সুযোগে আলোকপাত করা যেতে পারে।

রুমানিয়ায় জন্ম নিলেও এক বছর বয়সে আর্ভিং বাবা-মার সাথে অভিবাসী হন কানাডায়। মন্ত্রিয়লের ইহুদি এলাকায় তাদের আবাস হয়। ফ্রান্সিস ম্যান্সব্রিজ জানিয়েছেন ১৯০০ সাল থেকে পরবর্তী চৌদ্দ বছরে রুমানিয়া থেকে সতরো হাজার ইহুদি পশ্চিমা দেশগুলোতে, বিশেষ করে আমেরিকা ও কানাডায় আশ্রয় নেয় (পৃ: ১৫-১৬)। নতুন অভিবাসী জীবনে আর্ভিংয়ের বাবা মারা যান আর্ভিংয়ের বয়স যখন নয় বছর। এর চার বছরের মধ্যে আর্ভিংয়ের মা আরেকজনকে বিয়ে করেন। এবং আমরা দেখতে পাই আর্ভিং সুজানার প্রেমে পড়লেন। বাবা ও মাকে নিয়ে আভিংয়ের আলাদা আলাদা কবিতা আছে। গভীর মমতায় তাঁদেরকে স্মরণ করেছেন আর্ভিং। 

আর্ভিং লেইটনের ‘হয়ে ওঠা’র সময়টা খুব গভীরভাবে উঠে এসেছে স্মৃতিকথা ‘ওয়েটিং ফর দ্য মেসিয়াহ’তে। জীবনের প্রথম ছত্রিশ বছরের কালকে আর্ভিং ধারণ করেছেন এই বইতে। মোটামুটি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের কিছুকাল পর অবধি। উনিশ শ পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে যে দুর্দান্ত প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায় আর্ভিংয়ের সাহিত্য রচনার সেগুলোর গভীর অনুসন্ধান ওই স্মৃতিকথায় লুকিয়ে আছে। ইহুদি হিসেবে তাঁদের বেদনার কথা, অভিবাসী হিসেবে বেদনার কথা, পারিবারিক পরিমÐলে বেদনার সব কথা যেন তৈরি করেছিল একটি আবর্ত। সেই আবর্তে বিশ^সাহিত্যের সেরাজনেরা এসে দাঁড়িয়েছেন আর্ভিংয়ের পাঠতালিকায়। ক্রমে ক্রমে হয়ে উঠেছেন একজন আর্ভিং লেইটন Ñ কানাডীয় আধুনিক কাব্যধারায় এক যুগপুরুষ।

‘ওয়েটিং’ গ্রন্থে আর্ভিং জানিয়েছেন তাঁর স্কুল জীবনে শিক্ষকের কন্ঠে টেনিসনের কবিতা পাঠের কথা। আর্ভিংয়ের বয়স তখন চৌদ্দ। একজন শিক্ষক এলেন তাঁদের ক্লাসে। অবাধ্য ছাত্রদের জন্যে আলাদা একটি সেকশান ছিল সেটা। সেই সেকশানটাকে  কব্জা করার দায়িত্ব বর্তেছিল স্যান্ডার্স নামের ওই শিক্ষকের ওপর। তিনি ক্লাসে টেনিসনের কবিতা পড়ে শোনান। অসাধারণ কাব্যভঙ্গীর সে কবিতা স্যান্ডার্সের কন্ঠে শোনার পর আর্ভিং অনুভব করতে শুরু করে ‘মেসিয়াহ আসছে’।

১৯৪২ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত আর্ভিং মোট বারোটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন। সে গ্রন্থগুলো থেকে পছন্দের কবিতা নিয়ে ১৯৫৮ সালে প্রকাশ করেন ‘অ্যা রেড কার্পেট ফর দ্য সান’। গ্রন্থটি তাঁকে গভর্নর জেনারেল সাহিত্য পুরস্কার এনে দেয়। গ্রন্থটির ভূমিকায় আর্ভিং লিখেছিলেন : ‘এই সংকলনের কবিতাগুলো হলো একটি গাছের পাতার মতো। একজন বিশেষ মানুষ ১৯৪২ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত সময়ে ওই কবিতাগুলো লিখেছে। ওই মানুষটি এখন মৃত। এমনকি সেই মানুষটির যদি এখন পুনরুজ্জীবনও ঘটে তাহলেও তাঁর পক্ষে ওই কবিতাগুলো আর লেখা সম্ভব হবে না।’

কানাডার সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার লাভের পর আর্ভিংয়ের কবিতার অনেকগুলো সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। সংকলিত, বা বাছাইকৃত সংকলনগুলো বাদ দিয়ে নতুন যে কাব্যগ্রন্থগুলো ষাটের দশক থেকে আমরা পাই সেগুলো হলো ‘দ্য সুইংগিং ফ্লেশ’ (১৯৬১), ‘দ্য লাফিং রুসটার’ (১৯৬৪), ‘পেরিওডস অব দ্য মুন (১৯৬৭), ‘দ্য শ্যাটার্ড প্লিনথস’ (১৯৬৮), ‘দ্য হোল বøাডি বার্ড’ (১৯৬৯), ‘নেইলপলিশ’ (১৯৭১), ‘লাভারস অ্যাÐ লেসার মেন’ (১৯৭৩), ‘দ্য পোল-ভলটার’ (১৯৭৪), ‘দ্য টাইটরোপ ডানসার’ (১৯৭৮), ‘ড্রিমিং ফ্রম হেভেন’ (১৯৭৯) ‘ফর মাই নেইবরস ইন হেল’ (১৯৮০) ইত্যাদি। সাম সোলেকির নির্বাচনে যে কাবসংকলনটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮২ সালে সেটির ২০০৪ সংস্করণে সামের লেখা একটি ভূমিকা আছে। ভূমিকায় কানাডার বর্তমান সময়ে অগ্রগণ্য সাহিত্য সমালোচক সাম লিখেছেন ১৯৫০-এর দশকের শুরু থেকে ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি অবধি কানাডায় আর্ভিং হচ্ছেন সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সবচেয়ে বিতর্কিত কবি। সামের দৃঢ় উচ্চারণ এমন যে, আল পার্দি, মার্গারেট এভিসন এবং মাইকেল ওনদাদজী ছাড়া অন্য কোনো কানাডীয় কবিই আর্ভিং লেইটনের সাথে তুলনীয় নন।

আধুনিক কানাডীয় কাব্যধারা যে ক’জন কবি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছেন আর্ভিং লেইটন তাদের মধ্যে সর্বাগ্র। দীর্ঘ জীবনে প্রচুর লিখেছেন প্রথাবিরোধী এই কবি। সামাজিক মূল্যবোধ, কবিতার প্রকরণ, চেতনার প্রকাশ সব ক্ষেত্রেই আর্ভিং ছিলেন বিপ্লবী এক মানুষ। যেমনভাবে তার বহু কবিতা পাঠক কর্তৃক নিন্দিত হয়েছে, তেমনি তার সামগ্রিক কাব্যসম্ভার বহু বিশিষ্ট সমালোচক কর্তৃক নন্দিতও হয়েছে ব্যাপকভাবে। তাঁর কাব্যসৃজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হলো অ্যালসপেথ ক্যামেরনের মতো খ্যাতিমান জীবনীকার আভিংয়ের জীবদ্দশাতেই লিখেছিলেন পাঁচ শতাধিক পৃষ্ঠার জীবনীটি।