শনিবার | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ | টরন্টো | কানাডা |

Breaking News:

  • অন্টারিওতে একাধিকবার প্রতিবাদের মুখে পড়েছেন জাস্টিন ট্রুডো
  • প্রদেশের সব স্কুল ৩০ সেপ্টেম্বর খোলা থাকবে
বড়দিনের চিঠি

: ২৫ ডিসেম্বর ২০২০ | পি.আর. প্ল্যাসিড |

বড়দিনের চিঠি

সমরদের পরিবার দীর্ঘদিন দেশের বাইরে। সমর নিজেও যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে ভারতে চলে যায় ট্রেনিং নিতে। এদিকে দেশের ভিতর যুদ্ধ চলছে পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে। সমরের বাবা মাও নিরুপায় হয়ে নিজেদের ঘর বাড়ি ছেড়ে চলে যান নিরাপদ আশ্রয়ে। যেখানে দেশের রাজাকার বাহিনীর সাথে পাকিস্তানি সৈন্যরা আর তাদের খোঁজ পাবে না। নিজেরা নিরাপদে গেলেও সারাক্ষণই ছেলের জন্য দুশ্চিন্তায় সময় কাটান।

  একদিন দুপুরের পর পড়ন্ত বিকেলে বাড়ির ছেলে সৈলেন এসে বাড়ির সবার সাথে দেখা করে বলে যায় তারা ভারতে ট্রেনিং নিয়ে দেশে প্রবেশ করেছে। বেশি দিন আর লাগবে না পাকিস্তানিদের পরাজিত করতে। ভারতীয় সৈন্যদের নিয়ে চারদিক থেকে তারা পাকিস্তানি সৈন্যদের ঘিরে ফেলেছে। ওরা পালানোর আর কোনো পথ পাবে না। বাধ্য হয়েই আত্মসমর্পণ করবে। আত্মসমর্পণ করলেই দেশ স্বাধীন হবে। আর কোন ভয় থাকবে না তাদের দেশে ফিরতে। তখন সকলের সাথেই দেখা হবে।

  সৈলেন খবর পেয়ে সমরের সাথে পরামর্শ করে তারা কয়েক বন্ধু মিলে এসেছিলো দেখা করে খবরাখবর নিতে। ফিরে যাবার পর বাড়ির সকলে চিন্তা মুক্ত হয়। সামনে বড়দিন। বছরের এই একটা দিন সকলে এক সাথে কাটায়। এবছর যুদ্ধ চলায় বড়দিন উদ্ যাপন নিয়ে এতটা ভাবনা কারো ছিলো না। যখনই জানতে পারলো তাদের আর বেশি দিন স্মরণার্থী হয়ে অন্যের বাড়িতে থাকতে হবে না তখনই নিজের বাড়ি ফিরে গিয়ে বড়দিন উদ্ যাপন করার কথা ভাবে।

  বিজয় হবার কিছুদিন আগেই তাদের ঘর বাড়ি সব গান পাউডার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। বিজয় হবার শেষ দিকে এসে পাকিস্তানি সৈন্যরা যে তাদের বাড়ি পুড়িয়ে দেয় সে খবর কারো জানা ছিলো না। ভেবেছিলো যেমন বাড়ি রেখে এসেছে তেমনই রয়েছে হয়তো। সুতরাং কিভাবে বাড়ি সাজাবে সেই নিয়ে সমরের ছোট ভাইবোন যারা আছে তারা সারাক্ষণই কথা বলে।  

  পনেরো তারিখ গভীর রাতে শীতের মাঝে এলাকার লোকজন সমরের বাবা মা ভাই বোন যে বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে সে বাড়ির বারান্দায় বসে কাঁথা মুড়ি দিয়ে রেডিওতে সারা দেশের সংবাদ শোনার জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে। হঠাৎ বেজে উঠে আনন্দ সংগীত। সংবাদ শুরু হবার সময় থেকে একটার পর একটা দেশাত্ববোধক গান আর যুদ্ধে মনোবল পাবার মতো নজরুলের গান বেজে উঠে। যে সময় সংবাদ পাঠ করার কথা সেই সময় কোনো সংবাদ না পাঠ করে চলছে অন্য অনুষ্ঠান। সবার মনে তখন উত্তেজনা বিরাজ করে।

  তবে দেশের ভিতর কিছু একটা যে হয়েছে সেটি সবাই অনুমান করলেও কি হয়েছে বাস্তবে তা বোঝার কোনো উপায় নেই। তাই এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে সবাই বলাবলি করছে যে, রেডিও অফিসে নিশ্চয় এমন কোনো ঘটনা ঘটেছে যে কারণে কেউ সাহস করে পারছে না সংবাদ পাঠ করতে। আবার এমনও হতে পারে যে দেশের ভিতর পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছে যে কারণে কোন কিছু গুছিয়ে উঠতে পারছে না। যে কারণে কোনো ঘোষণাও নেই। বলতে বলতে এক পুরুষ কন্ঠ ভেসে আসে। বলা হয় পাকিস্তানি আর্মিরা আত্মসমর্পণ করেছে। আগামীকাল ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। আমাদের এখানে সব আনন্দে ভেসে যাওয়ায় আমরা সঠিক সময়ে সংবাদ পরিবেশন করতে পারছি না বলে দুঃখিত। তবে খুব শীঘ্রই সংবাদ পাঠ করা হবে। বিস্তারিত জানার জন্য অপেক্ষা করুন।

  এমন ঘোষণা শুনে বাড়িতে ছেলে বুড়ো সবার মাঝে আনন্দের স্রোত বইতে শুরু করে। ছেলে মেয়েরা কোন কিছু না বুঝলেও বড়দের দেখে তারাও আনন্দ করতে শুরু করে। উঠানে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে জয়-বাংলা বলে চিৎকার দিতে থাকে ছেলে মেয়েরা। সারা রাত কেউ আর ঘুমায় না। কখন তারা নিজেদের বাড়ি ফিরবে সেই আলোচনাতেই ব্যস্ত। আনন্দ আর আলোচনা করতে করতেই রাত কাটে। একই এলাকায় গ্রামের যারা বিচ্ছিন্ন ভাবে বিভিন্ন বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে সবাই ডাকাডাকি করে পরেরদিন সকালে এক সাথে নিজেদের গ্রামে ফিরে যাবার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়।

  সকালে বাড়ির বাইরে চারদিকে বিল। বিলের ওপারে কিছুই দেখা যায় না। পুরোটা কুয়াশার চাদরে ঘেরা। বাড়ি থেকে বিল খুব বেশি দুরে নয়। মাঝখানে টিলার মতো উঁচু ভিটা। ভিটায় বাইট গাছে ছেয়ে ছিলো। এ কয়দিনে সব কেটে পরিষ্কার করে ফেলেছে। সেদিকটায় গিয়ে সমরের বাবা উচু গলায় আশেপাশে আশ্রয় নেওয়াদের ডাকেন। ডেকে জড়ো করেন। সবাই এসে উপস্থিত হলে একসাথে বাড়ির দিকে রওনা দেয়।

  পথে তাদের সাথে পরিচিত অপরিচিত অনেকের দেখা হয়। এলাকার অনেকেই তখনো দেশ স্বাধীন হবার সংবাদ পায় নি। যে কারণে শরণার্থী হবার মতো করে নিজেদের এলাকায় ফিরে যাবার দৃশ্য দেখে মাঝ পথে অনেকেই অবাক হয়ে পথের ধারে এসে দাঁড়িয়ে জানতে চায় দেশ কি স্বাধীন হয়েয়ে কি না? এ সুযোগে কেউবা আবার নিরীহদের কাছ থেকে মূল্যবান জিনিস ভয় দেখিয়ে নিয়ে নেয়। সমরের বাবার এলাকা ছাড়িয়ে পরিচিতি থাকায় তাকে দেখে অনেকেই সালাম দিয়ে আলোচনা করে, বাড়ির অবস্থা। পরিবারের সকলে ভালো আছে কিনা জানার চেষ্টা করে। সমরের রাজনীতিতে জড়ানোর বিষয়টি এলাকায় অনেক আগেই রটনা হয়ে যাওয়ায় তাকে মানুষ সমীহ করে। যে কারণে বাড়ি ফেরার মানুষদের দলে সমরের বাবাকে দেখে কেউ কোনো ঝামেলা করার সাহস পায় না।

  এভাবেই একসময় বাড়ির খুব কাছাকাছি চলে আসেন তারা। বাড়ি পৌছাতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায়।

  বাড়ির সামনে ভিটার কাছাকাছি যেতেই দেখে বাড়ির ভিটায় কোনো ঘর অবশিষ্ট নেই। ঘরের বদলে ছাইয়ের স্তুপ হয়ে আছে সব। ভিটের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে নিস্পলক তাকিয়ে দেখে পুরো বাড়ি ফাঁকা। যেন অচেনা কোন এলাকায় এসেছে তারা। এখানে কখনো যেন আসেনি তারা। বুকের উপর ভারি পাথর চাঁপা দেয়ার মতো কষ্ট তাদের মনে জমাট বাঁধে। কষ্ট কোনো ভাবে প্রকাশ করতে পারছিলো না। ভিতরে তাদের চাপা কান্না ক্রমেই ভারি হতে থাকে।

  আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে সামনে এগিয়ে যান সমরের বাবা। এমন সময় বাড়ির ভিটে থেকে কে একজন ভারি গলায় ডাক দেয় ”কাকীমা” বলে। আবার প্রশ্ন করে, কাকীমা কাকা কই? বলেই একজন জওয়ান সমরের মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, তোমরা ফিরে এসেছো? বেঁচে আছো তোমরা? আমরা তো মনে করেছি তোমরা বেঁচে নেই।

  সমরের বাবা এগিয়ে এসে তাদের একজনকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। সবার হাতে অস্ত্র। মুখে চাপ দাঁড়ি। কাউকেই আলাদা করে চেনা যায় না। তাদের একজন এগিয়ে গিয়ে সমরের বাবাকে জড়িয়ে ধরে সান্তনা দিয়ে বলেন, কাকা আমরা সবাই বেঁচে আছি। দেশ ছেড়ে যাবার সময় আপনার আশীর্বাদ নিয়ে বলেছিলাম দেশ স্বাধীন করে তবেই ফিরবো দেশে। আমরা ফিরে এসেছি। এখন আমরা স্বাধীন।

  সমরের বাবা প্রশ্ন করেন, আমার সমর কই, সমর? তোমরা আমার সমরকে কোথায় রেখে এসেছো?

  কাকা সমর দা ভালো আছে। সে আমাদের আগে বাড়িতে পাঠিয়েছে। তার কিছু কাজ এখনও বাকি আছে। সে ইচ্ছা করলেই আসতে পারবে না, তাই আসে নি। যুদ্ধের নয় মাস সে ছিলো আমাদের কমান্ডার। তার অধীনেই আমরা যুদ্ধ করেছি। সে তার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে তারপর আসবে।

  কিন্তু -

  কোন কিন্ত নয় কাকা। বাড়ি গেছে তাও ভালো। আপনারা আমরা সবাই বেঁচে আছি। এটার চেয়ে বেশি আর কি চান। অনেকের আত্মীয় পরিজন সব গেছে। তাদের বাড়ি থেকেও নেই। আমরা চাইলেই আবার নতুন করে বাড়ি তৈরী করতে পারবো। এ নিয়ে কোন চিন্তা করবেন না। বাড়ির ভিটায় উঠেন আগে। আমরা সবাই মিলে এখনই আপনাদের থাকার ব্যবস্থা করে দেবো। আজ রাত কোনো ভাবে কাটান তারপর আস্তে আস্তে সব হবে।

  সমরের মা সামনে এসে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হাসি উপহার দিয়ে বলে, আমি জানি আমার সমর মরে নি। তোমাদের মধ্যেই আমি সমরকে দেখতে পাচ্ছি। বলেই আবার বলে, সত্যি করে বল তো আমার সমরকে কোথায় রেখে এসেছো? সে জীবিত থাকলে কেন সাথে নিয়ে আসোনি?

  একজন এগিয়ে এসে বলল, কাকীমা, দাদাই আমাদের আগে পাঠিয়েছেন। বলতে বলেছেন, দুইদিন পর বড়দিন, দাদা আপনাদের সাথে এবার বড়দিন করবে।

  সমরের ছোট ভাই বোন সবাই দূরে গিয়ে ভিটে বাড়ির ছাই হাতে নিয়ে কাঁদছিল। সবাইকে শান্ত হয়ে কথা বলতে দেখে তারাও সামনে আসে। এসে বলে আমরা আজকে ঘুমাবো কোথায়? আমাদের যে থাকার জায়গা নেই।

  বাড়ির ভিটেয় দাঁড়িয়ে দেখা যায় দূরে গ্রামের কিছু বাড়ি আগের মতো যেমন ছিল তেমনই দাঁড়িয়ে আছে, কোনো ক্ষতি হয়নি। বাড়ির লোকজন তাদের নিজেদের বাড়ি ফিরে যে যার মতো কাজে লেগে যায়। কেউ কেউ ক্ষতিগ্রস্তদের রাতের খাবার জন্য খাবার রান্না করতে শুরু করে দেয়। সমরদের পাশের বাড়ির কয়েকজন এসে সমরের বাবার উদ্দেশ্যে বলে, রাতটুকু যেনো তাদের বাড়িতে তাদের সাথে কষ্ট হলেও শেয়ার করে ঘুমায়। পরেরদিন এলাকার লোকজন সবাই মিলে তাদের জন্য আপাতত রাত থাকার মতো ঘর তুলে দিবে। সেখানে থাকতে পারবে। সমরের বাবা তাতে রাজি না হয়ে বলে আমরা আজ রাতের মধ্যেই ভিটার ছাই সরিয়ে পোড়া টিন দিয়ে ছাপড়া ঘর বেঁধে নিতে পারবো। এতে রাত কাটানো কোন সমস্যা হবে না।

  পাশের বাড়ির লোকটি বলছে, আমরা এক কাজ করতে পারি, এখনই গ্রামে ঘুরে যাদের বাড়ি ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে তাদের জন্য লেপ কম্বল সহ শীতবস্ত্র যা পাই সংগ্রহ করে নিয়ে আসি।

  ডিসেম্বর মাসে শীত বেশি। তার মধ্যে ফাঁকা ভিটায় ছাপড়া ঘরে রাত কাটানো কিছুটা কষ্ট হবে মনে করে সামনে যে ক’জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলো তারা বলাবলি করছে, আপনারা একটা কাজ করতে পারেন, কাকাদের রাতের খাবারের ব্যবস্হা করেন, আমরা না হয় এলাকায় ঘুরে শীত নিবারনের জন্য কাঁথা কম্বল যা পারি সংগ্রহ করে নিয়ে আসি।

  এতক্ষণে সবার মধ্যে শান্ত পরিবেশ ফিরে আসে। আগামী দিন গুলো কিভাবে কাটাবে, এজন্য কিভাবে কি করবে তা নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করে। সবাইকে শান্ত হতে দেখে সৈলেন পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে সমরের বাবার দিকে বারিয়ে দিয়ে বলে, কাকা দাদা একটা চিঠি দিয়েছে।

  সমরের বাবা হাত বারিয়ে চিঠি নেয়ার সময় সমরের ভাই বোন মা সবাই আগ বাড়িয়ে চিঠির দিকে তাকায়। সবার মধ্যে আবার নতুন করে কিছু পাবার আনন্দ উঁকি দেয়। চিঠি হাতে নিয়ে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়ান সমরের বাবা। ভিতরে তার অন্য চিন্তা। কোন দুঃসংবাদ নেই তো এতে? ভয়ে ভয়ে চিঠি খুলতে গিয়ে বাড়িয়ে দেয় আবার সৈলেনের দিকে। বলেন, তুমি পড়ো। পড়ে শোনাও সবাইকে।

  সমরের মার প্রশ্ন, কোন খারাপ সংবাদ না তো আবার?

  সৈলেনের মুখে কোন উত্তর নেই। দু’হাতে চিঠির ভাঁজ খুলে সামনে ধরে। সবাই তাকে গোল হয়ে জড়ো হয়ে ঘিরে ধরে। সহযোদ্ধারা পিছনে দাঁড়ানো। চিঠি পড়ার আগেই সমরের মা আবার আঁচল দিয়ে মুখ চেপে ধরে কাঁদতে শুরু করলেন।

  সৈলেন পড়তে শুরু করে,

  পূজনীয় বাবা ও মা। এটুকু পড়ে সৈলেন সবার দিকে তাকিয়ে দম নেয়। সে নিজেও জানে না কি লেখা রয়েছে চিঠিতে। ভয়ে ভয়ে শুরু করে পড়া।

   আমার নমষ্কার নিও। আশা করছি তোমরা ভালো আছো।

   তোমরা যখন আমার চিঠি পাবে ততক্ষণ আমি অবশ্যই সুস্থ থাকবো। বড় ধরনের একটা বিপদ আমার হয়েছিলো। ভেবেছিলাম আর হয়তো বাঁচবো না। তোমাদের প্রার্থণা আর ঈশ্বরের ইচ্ছাতে এখন ভালো আছি। আমার সব খবর সৈলেনদের মুখে জেনে নিও। যদি এর মধ্যে কোন দুর্ঘটনা না ঘটে তাহলে সামনে বড়দিন তোমাদের সাথে এক সঙ্গে বড়দিন উদ্ যাপন করবো আশা করছি।

  এটুকু পড়ে সৈলেন আবার সবার দিকে তাকায়। সমরের মা প্রশ্ন করলেন, তোমরা আমার কাছে কিছু গোপন করতেছ মনে হয়। সত্যি করে বলো আমার সমরের কি হয়েছিলো।

  সৈলেন বলল, কাকীমা বলছি। সবই বলবো। আগে চিঠিটা পড়ে শেষ করি তারপর বলি। বলেই আবার পড়তে শুরু করে।

  দেশ স্বাধীন করতে আমরা শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করেছি। যুদ্ধ মানেই জয় পরাজয়। আহত নিহত। আমরা বিজয়ের ঠিক কয়েক ঘন্টা আগে ঢাকার কাছাকাছি এক এলাকায় পাকিদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে জড়িয়ে যাই। আমরা ওদের পরাস্ত করতে পারলেও আমি ওদের হাতে ধরা পরেছিলাম। সাথের বন্ধুরা সবাই তাদের জীবন বাজি রেখে আমাকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে।

 আমাকে জীবিত উদ্ধার করলেও ততক্ষণে আমি ওদের নির্যাতনে অনেকটাই মৃত প্রায় হয়ে যাই। কিছুক্ষণের মধ্যে যখন সংবাদ পেলাম আমরা বিজয় ছিনিয়ে আনতে পেরেছি তখন সব দুঃখ কষ্ট ভুলে গেছি।

  ওরা আমাকে মৃত মনে করে ফেলে রেখে চলে যাবার পর জানতে পারি সাথের মুক্তিযোদ্ধারা ধরে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তখন আমার জ্ঞান ছিলো না। হাসপাতালে জ্ঞান ফিরলে আমি নিজেকে হাসপাতালে দেখতে পাই। মাঝখানে কিভাবে কি ঘটেছে কিছুই জানা ছিলো না, পরে শুনেছি।

  তোমাদের কারো খবরই আমার জানা নেই। তোমরা কেমন আছো জানি না। বিশ্বাস সবাই বেঁচে আছো এবং ভাল আছো। তাই তোমাদের উদ্দেশ্যে চিঠি লেখা।

  এখানে হাসপাতালে আমাদের এলাকার কয়েকজন সেবিকার দেখা পেয়েছি। ওরা আমার বেশ সেবা করছে। ওরা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের নিয়ন্ত্রণে ছিলো। ওদের কাছেই দেশের বাড়ি ঘরের অনেক সংবাদ জেনেছি। ওরা তোমাদের সঠিক কোন সংবাদ দিতে পারে নি। তবে বিশ্বাস সবাই বেঁচে আছো।

  সেবিকাদের যিনি প্রধান উনি আমাদের পাশের গ্রামের মেয়ে। নাম ওর পারুল। আমাকে বলল, দ্রুত আমাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। এখান থেকে ছাড়া পেয়ে আমার কিছু কাজ রয়েছে সব সেরে বাড়ি আসবো।

  কথা দিচ্ছি, পঁচিশ তারিখ রাতেই আমি যেভাবে পারি বাড়ি এসে পৌছবো। এবং তোমাদের সাথে বড়দিন করবো।

  বড়দিনের আগাম শুভেচ্ছা জানাই।

  ইতি

 তোমাদের সমর।

  চিঠি পড়া শেষ হলে সমরের মা বাবা সমানেই সৈলেনকে প্রশ্ন করেন, সমরের কি হয়েছিলো?

  আজ না হয় থাক। পরে বলবো। এখন তো জানলে যে দাদা ভালো আছে। ভিটা বাড়ি পরিষ্কার করার কাজে হাত দেন। আমরা এলাকা ঘুরে দেখে এবং কোন কিছুর ব্যবস্থা করে নিয়ে আসি। বলে সৈলেন তার সহ যোদ্ধাদের নিয়ে বিদায় নেয়। সমরের মা সমরের লেখা চিঠিটি ভাঁজ করে বুকে মধ্যে গুজে নিয়ে ঘরের ভিটায় যান ছাই সারানোর জন্য।


[email protected] Weekly Bengali Times

-->