বুধবার | ২৫ নভেম্বর ২০২০ | টরন্টো | কানাডা |

Breaking News:

  • ১০০ বছর আগে চুরি যাওয়া মূর্তি ভারতকে ফিরিয়ে দিচ্ছে কানাডা
  • কানাডার টরন্টো ও পিল অঞ্চলে লকডাউন ঘোষণা
কয়লা ধুইলে ময়লা যায় ?

: ২১ নভেম্বর ২০২০ | জাভেদ ইকবাল |

টরন্টোর জীবন আবার স্বাভাবিক হবে

বাসায় একটা কম্পিউটার দিয়ে আর হচ্ছিলো না। ভাবলাম বাচ্চাদের নতুন একটা কিনে দিয়ে পুরানটা আমি নিবো। আমার লেখালেখিতে খুব সমস্যা হচ্ছে। তারা ঘুমিয়ে গেলে তবে ঘন্টা দুয়েকের জন্য হাতে পাই। কিনতে যাবার আগে তাদের ডেকে বললাম- বাচ্চারা, যদি তোদের একটা নতুন কম্পিউটার কিনে দেই, তোরা কি আগেরটায় আর হাত দিবি?

- না! [দুজন একসাথে বলে উঠে]

- নতুনটায় আরো ভালো গেমস খেলা যাবে। কিন্তু প্রমিজ করতে হবে গেমস খেলাও কমায় দিবি। রাজি?

- রাজি! [একসাথে বলে উঠে]

বিকালবেলা তাদের জন্য ব্র্যান্ড নিউ সিপিইউ, মনিটর, স্পিকার কিনে দিলাম স্টেপলস থেকে। তারা খুব ইম্প্রেসড। নতুন গেমস, স্পিড নিয়ে তারা আবেগ-আপ্লুত। হাজারবার আমাকে আই লাভ ইউ বলে চুমু খেয়ে যেতে লাগলো।

ঘটনা ঘটলো পরের দিন থেকে। কাজ থেকে ফিরে মেয়েটাকে বললাম, আম্মু কম্পিউটার থেকে উঠো; আমার কাজ আছে

- পরে

- পরে মানে?

- দেখছো না আমি বিজি?

- তোরা না কথা দিছিলি এটা আমাকে দিবি?

- কম্পিউটার কার ঘরে রাখছো?

- তোর ঘরে!

- এই টেবিলটা কার?

- তোর

- এজন্য কম্পিউটারটাও আমার। দিস ইজ মাই প্লেস, মাই প্রপার্টিজ!- বলে খেলায় মনোযোগ দিলো।

আমার আম-ছালা দুটোই গেছে।

বাচ্চাদের লাভ হয়েছে অনেক। তারা আগে একজন কম্পিটার, আরেকজন ট্যাব হাতে একসাথে খেলতো। এখন দুইজন দুই কম্পিউটার পেয়ে আকাশের চাঁদ হাতে পেলো। দুজন দুই ঘর থেকে গেম্স্ খেলে আর চিল্লায়। ফুর্তি বেড়ে হয়েছে দ্বিগুন!

নিউজ দেখছিলাম। আমার এখন ঐ একটাই কাজ। আমার নরওয়েজিয়ান বন্ধুর ফোন-

কাহা কী করো?

- খবর দেখি

- তোমাগো ডোনাল্ড ট্রাম্প গদি না ছাড়ার পায়তারা করে ক্যা?

- ঐ লোক আমাদের হবে কেন? গদি না ছাইড়ে কনে যাবে?

- কানাডা-আমেরিকার মানুষগুলা হইলো সব "..."। ইউরোপ হইলে ব্যাটারে পাবলিক গলা ধাক্কা দিয়ে নামায়ে দিতো!

- তার মেয়াদ তো এখনো দুই মাস আছে

- থাকুক মেয়াদ। উল্টাপাল্টা কতা কবি ক্যা! মাইন্ড খাইয়ো না কাহা, উত্তর আমেরিকার লোকজন গাঞ্জার কল্কি পাইলে আর হুঁশ থাহে না। তোমাগো কোভিড অবস্থাও দেখি কেরোসিন!

- হয় রে দোস্ত, যে হারে করোনা বাড়তেসে..

- নামাজ-কালাম আইটি ধরো কাহা। শুধু জুম্মার দিনে মাথায় টুপি দিয়ে কুনো লাভ নাই। বেহেস্তে যাইতে মামা-চাচা কুনো কামে দিবে না। রাখি কাহা। পরে কতা হবি; কাম আছে। সোনো পইড়ি সব গাইবি গিসে... সাফ করি....

আমি বাজার সদাই করে এনে রান্নাঘরে গিয়ে দেখি গিন্নি দই বসানোর প্রিপারেশন নিচ্ছে। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কিছু বলবা?

- বাজারে গেছিলাম তোমার গিফট কার্ডটা খরচ করতে

- তো?

- না মানে... বিল দেওয়ার সময় দেখি ঐটা দুইশ ডলারের কার্ড না

- তুমি না বললা দুইশ ডলারের?

- আসলে উপরে লেখা পঁচিশ থেকে দুইশ ডলার। খেয়াল করি নি

- কত টাকা আছে?

- পঁচিশ ডলার।

সে আবার কাজ নিয়ে খুব বিজি হয়ে গেলো। ঘটনা হলো, সে একটা গিফট কার্ড পেয়েছিল তার ম্যানেজারের কাছ থেকে গত বৎসর। সেটার এক্সপায়ারি ডেট আর তিন মাস আছে দেখে বললাম, আমি তোমাকে দুইশ ডলার দিচ্ছি, কার্ডটা আমাকে দাও। তা না হলে শুধু শুধু এতগুলো টাকা নষ্ট হবে। শুনে সে হাসি মুখে কার্ডটা দিয়ে দুশো ডলার ক্যাশ নিলো। বাজার করে বিল দিতে গিয়ে দেখি ওটা পঁচিশ ডলারের।

আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল, দাঁড়ায়ে আছো কেন?

- না, মানে... আমার বাকি একশো পঁচাত্তর ডলার...

- তুমি খেয়াল করো নাই, সেটা তোমার ভুল। আমি কী করবো!

- আমার টাকা?

- দেখছো না আমি বিজি? তুমি কাজের সময় হাতের কাছে ঘুরঘুর করো কেন বলো তো? এক কাজ করো; মিলাদ দিয়ে দাও। জিলাপি-সিঙ্গারা-নিমকি ঠোঙায় ভরে বিল্ডিঙের কয়েকটা ফ্যামিলিকে দিয়ে আসো। আমি টাকা দিয়ে দিচ্ছি। আমি বড়জোর তোমার জন্য দুটা সমুচা/সিঙ্গারা ভেজে চা দিতে পারি। এর চাইতে বেশি কিচ্ছু করার নাই।

. আমি খবর দেখতে বসি। এই সময় চিশতির ফোন। খুব খোশ মেজাজে মনে হচ্ছে। বলল, কী করিস?

- খবর দেখি

- তুই কথা আস্তে, না জোরে বলতেছিস?

- আস্তে

- এবার জোরে বল তো দেখি?

- এইতো জোরে বলতেছি...

- গুড। এবার একদম আস্তে আস্তে বল তো? বল, "তেরা বিন মারনা নেহি"

- তেরা বিন মারনা নেহি [আমি ফিসফিসিয়ে বলি]

- এক্সসেলেন্ট!

- কেন দোস্ত?

- আমার মোবাইলে হ্যান্ড স্যানিটাইজার মাখাইতে মাখাইতে ফুটা-মুটা সব বন্ধ হয়ে গেছিলো। কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। এখন এলকোহল দিয়ে মুছলাম। তাই তোকে দিয়ে টেস্ট করলাম। রাখলাম।

.

গিন্নি এসে আমার সামনে দুইটা সমুচা, দুইটা সিঙ্গারা রেখে বলল, চান্দু খাও। এবারকার মরিচের সসটা খুব ভালো কিনছো। আর শোনো...

- বলো

- দশ ঘন্টার আগে দইয়ের ওভেন খুলবা না

- আমি আর খুলি না...

- কয়লা ধুইলে ময়লা যায়? দই না জমলে তোমার দোষ। কথা ফাইনাল। কোনো ভেজাল আছে?

আমি হিসাব করতে থাকি; চা আর চারটা সমুচা শিঙাড়ার পাঁচ আইটেমকে একশো পঁচাত্তর দিয়ে ভাগ করলে একটা শিঙাড়ার দাম পরে প্রায় আটত্রিশ ডলার। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুনিয়ার সবচাইতে এক্সপেন্সিভ চা-সিঙ্গারা খেতে থাকি।

তারপর বুক শেলফের ভেতর থেকে খুঁজে সেই ছয় বছর আগের ল্যাপটপটা বের করে ধুলা মুছে প্লাগে দিয়ে দেখি ব্যাটারি গেছে। আমাজন থেকে ব্যাটারির অর্ডার দিলাম। আসতে এখনো তিনদিন...

রাতে লাইট বন্ধ করে সিলিঙের দিকে উদাস ভঙ্গিতে তাকিয়ে ভাবতে থাকি, দই কী জমলো? কয় ঘন্টা হলো?

একটু চেক করা দরকার...

নভেম্বর ২০, ২০২০