আমরা কি আবার ‘সরি স্যার’ বলবো!

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০


আমরা কি আবার ‘সরি স্যার’ বলবো!

প্রভাবশালী কোনো দল বা ব্যক্তি নয়, এবার শিক্ষার্থীর হাতে অপমানিত হয়েছেন বরিশালের এক শিক্ষক৷ মারধর করে কান ধরে ওঠবস করিয়ে সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে৷ শ্যামল কান্তি ভক্তকে মনে আছে আপনাদের? চার বছর আগের ঘটনা৷ অনেকে হয়ত ভুলেই গেছেন৷ কারণ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আসার পর এগুলো তো ট্রেন্ড৷ একটা করে নতুন ঘটনা ঘটে আর পুরানো ঘটনা ভুলে যায় সবাই, নতুন ট্রেন্ড নিয়ে শুরু হয় মাতামাতি৷

নারায়াণগঞ্জের বন্দর উপজেলার পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে ২০১৬ সালে মারধর ও কান ধরে ওঠবস করানো হয়েছিল৷ জাতীয় পার্টির সাংসদ এ কে এম সেলিম ওসমান ও আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে ঘটা ওই ঘটনায় সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষই নিন্দা জানিয়েছিলেন৷ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভরে উঠেছিল কান ধরা ছবিতে৷ শ্যামল কান্তি বরখাস্ত হয়েছিলেন৷ ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলায় এক বছর পর জেল খাটতে হয় তাকে৷ আমরাও ভুলে গেছি তাঁর কথা৷ খবর রাখিনি শ্যামল কান্তির৷

এবার বরিশালে ঘটেছে শিক্ষক অবমাননার ঘটনা৷ বরিশাল নার্সিং ইনস্টিটিউটের এক শিক্ষককে মারধরের পর কান ধরে ওঠ-বস করিয়ে ভিডিও করা হয়েছে এবং সম্প্রতি তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার পর ভাইরাল হয়েছে৷ ভিডিওতে শিক্ষককে বলতে শোনা গেছে ‘‘ছাত্রীকে বেশি নম্বর পাইয়ে দেয়ার প্রলোভনে অনৈতিক প্রস্তাব দেবো না৷’’ এ কথা বলছেন আর কান ধরে ওঠ-বস করছেন৷ ভিডিওটি গত ২৫ আগস্ট ধারণ করে ৯ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে পোস্ট করা হয়েছে৷

এখন কথা হচ্ছে, ওই শিক্ষক কি এমন কোনো প্রলোভন কি আদৌ দেখিয়েছিলেন? যদি দেখিয়ে থাকেন, তাহলে তাকে প্রচলিত ব্যবস্থায় বিচারের মুখোমুখি করা হলো না কেন? আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হলো না কেন? কারা ভিডিওটি পোস্ট করেছে সেটাও জানা যায়নি বলে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে৷ ফলে সন্দেহ থেকেই যায় আসলে কী কারণে ওই শিক্ষককে এমন অপমান করা হলো? এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য কাজ করেনি তো?

জানা গেছে, ওই শিক্ষক ২০১৮ সালে ওই প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন৷ কিন্তু করোনার কারণে দুই মাস আগে অনলাইনে খণ্ডকালীন পাঠদানের জন্য তাকে নিয়োগ দেয়া হয়৷ এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন ওই শিক্ষক৷ তাঁর দাবি, ওই প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে মতানৈক্যের কারণে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে৷

লেখাপড়ায় অমনোযোগী এক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাইয়ে দিতে তার উপর চাপ সৃষ্টি করেছিল৷ সেই শিক্ষার্থী তার দলবলসহ তাকে একটি দোকানে নিয়ে গিয়ে গায়ে হাত তোলে এবং নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে মারধর করে কান ধরে ওঠ-বস করিয়ে ভিডিও করে বলেও অভিযোগ তাঁর৷ তিনি রাজি না হলে বিবস্ত্র করার ভয় দেখায় ইমন নামের ওই শিক্ষার্থী৷ অন্যদিকে ইমনের দাবি ওই শিক্ষকের কারণে নাকি তার স্ত্রী পাস করতে পারেনি এবং তিনি মেয়েদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করতেন৷ অথচ নার্সিং কলেজটির পরিচালক সাজ্জাদুল হক জানিয়েছেন, ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে এ ধরনের কোন অভিযোগ কখনো কেউ করেনি৷

এ কথা সত্যি যে, ছোটবেলায় শিক্ষক বা গুরু বলতে আমাদের চোখের সামনে যে ‘রোল মডেল’ উপস্থাপন করা হতো, বর্তমান শিক্ষকদের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে সেইসব গুণের অভাব দেখা যায়৷ কোচিং ব্যবসা, আর নম্বর ব্যবসার কারণে শিক্ষক আর শিক্ষার্থীর সম্পর্কেও পরিবর্তন এসেছে৷

তবে বরিশালের এই ঘটনা প্রমাণ করে আজকালকার শিক্ষার্থীরা শিক্ষককে কেবল ‘নম্বর প্রদানের মাধ্যম’ বলেই মনে করছে৷ আশঙ্কার কথা, এভাবে শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষকরা অপমানিত হতে থাকলে আমাদের শিক্ষকরা জিম্মি হওয়ার ভয়ে হয়ত পাঠদানের বদলে নম্বর দানে উৎসাহী হয়ে উঠবেন৷ আর মুঠোফোন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষকে অপমান করার কী ভয়ানক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে তা ভাবলে তো আজকাল শিউরে উঠতে হয়! সূত্র : ডয়েচেভেলে