ধনীদের কাছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বন্ধ করতে হবে

২৭ জুলাই ২০১৯


ধনীদের কাছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বন্ধ করতে হবে

১৮ বছরের বেশি বয়সি বাংলাদেশি নাগরিকেরা সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন৷ তবে সঞ্চয়পত্র চালুর উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে নারী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধীদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা দেয়ার কথা বলা হয়েছে৷ জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে এই উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে৷ কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সঞ্চয়পত্রের ক্রেতাদের একটি বড় অংশ হচ্ছেন ধনী ব্যক্তিরা৷ এমনকি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও সঞ্চয়পত্র কিনছে৷

গতবছর জুলাই মাসে বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন বলছে, প্রায় ৯০ শতাংশ সঞ্চয়পত্র কিনছেন বড় পদের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনীতিবিদ ও ধনাঢ্য ব্যক্তিরা৷ গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বাংলা ট্রিবিউনকে এই তথ্য দিয়েছেন৷ গত নির্বাচনের সময় প্রার্থীদের হলফনামা থেকেও এমন তথ্য জানা গেছে৷

২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল৷ নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত ব্যয় বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ১৮ শতাংশ বেশি৷ ‘সমৃদ্ধ আগামী’ শিরোনামের বক্তৃতায় এটাকে রাজস্ব আয় বাড়ানোর ‘লক্ষ্যমাত্রা পূরণের’ বাজেট হিসাবে অভিহিত করেছেন অর্থমন্ত্রী৷ আহসান এইচ মনসুর আরও জানিয়েছেন, প্রায় ৮৫ শতাংশ সঞ্চয়পত্র বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১২ শতাংশ লোকের কাছে৷

একবছর আগের এই তথ্যে খুব বেশি পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না৷

একটি তথ্য আরেকবার খেয়াল করুন - ৮৫ শতাংশ সঞ্চয়পত্র বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১২ শতাংশ মানুষের কাছে!

এবার এই তথ্যের ব্যাখ্যা বুঝতে আরেকটি তথ্য দিচ্ছি৷ জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের সূত্র উল্লেখ করে বাংলা ট্রিবিউন জানিয়েছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৮০ হাজার কোটি টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে৷

তার মানে প্রায় ৬৮ হাজার কোটি টাকার (৮৫ শতাংশ হিসেব করলে) সঞ্চয়পত্র কিনেছেন মাত্র ১২ শতাংশ মানুষ৷ তাঁরা যে ধনী ব্যক্তিই হবেন, তা অন্তত পরিমাণ দেখে অনুমান করা যায়৷

কিন্তু সেটাতো হওয়ার কথা ছিল না৷ স্বল্প আয়ের মানুষদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই সরকার একটি ভালো উদ্যোগ নিয়েছিলেন৷ তা আর হচ্ছে কই!

সঞ্চয়পত্র চালুর ক্ষেত্রে সরকারের আরেকটি উদ্দেশ্যও ছিল৷ সঞ্চয়পত্র বিক্রির অর্থ দিয়ে বাজেট ঘাটতি পূরণ করা৷ এই তথ্য জেনে মনে হতে পারে যে, সঞ্চয়পত্র যত বেশি বিক্রি হবে সরকারের জন্য ততই ভালো৷ কিন্তু মনে রাখতে হবে, বিক্রি হওয়া প্রতিটি সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে সরকারকে প্রতিবছর সুদ দিতে হবে৷

এই বিষয়টি যে সরকারের ওপর একধরনের চাপ, তা বোঝা যায় সাম্প্রতিক এক সিদ্ধান্তে৷ সঞ্চয়পত্রের সুদের ওপর আগে পাঁচ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখা হতো৷ এখন সেটা বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে৷ নতুনের পাশাপাশি পুরনো সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য হচ্ছে৷ অর্থাৎ আগে সঞ্চয়পত্র কিনে কেউ যদি মাসে ১০০ টাকা পেতেন, এখন তা আরও কমে যাচ্ছে৷

সীমিত আয়ের মানুষদের জন্য বিষয়টি চিন্তার৷ কারণ একজন মানুষ যখন সঞ্চয়পত্র কেনেন তখন তিনি হিসেব করে নেন যে, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত প্রতিমাসে তিনি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পাবেন৷ কিন্তু হঠাৎ একটি সিদ্ধান্তের কারণে যদি আয় কমে যায়, তাহলে সমস্যাতো হবেই৷

এমন অবস্থার কথা বিবেচনা করে সঞ্চয়পত্র সংক্রান্ত নতুন কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নতুন গ্রাহকদের থেকেই শুরু করতে হবে৷

উৎসে কর বাড়ানো ছাড়াও সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে দেয়া সুদের হার কয়েক দফায় কমানো হয়েছে৷

বছরের পর বছর সুদের অর্থ দিতে গিয়ে চাপ বেড়ে যাওয়ায় সরকার একের পর এক এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷

তবে কথা হচ্ছে, সঞ্চয়পত্র দিয়ে যদি দেশের বেশিরভাগ সীমিত আয়ের মানুষের লাভ হতো তাহলে সরকার সেই চাপ নিলে বিষয়টি যুক্তিসঙ্গত হতো৷ কিন্তু দেখা যাচ্ছে লাভ হচ্ছে মুষ্টিমেয় ধনী ব্যক্তিদের৷ এত প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হচ্ছে৷

তাই সঞ্চয়পত্র বিক্রির শর্ত হিসেবে ভবিষ্যতে এমন কিছু যোগ করতে হবে যেন ধনী ব্যক্তি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো তা কিনতে না পারে৷