পাপীদের ক্ষমতার দরজা খুলে দিয়েছে কারা?

১৫ জুলাই ২০২০


পাপীদের ক্ষমতার দরজা খুলে দিয়েছে কারা?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে ক্যাসিনো বাণিজ্যের অপরাধে জেল খাটছেন তার দুর্দিনের রাজপথের কর্মী ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার একসময়ের দেহরক্ষী লোকমান। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়- শেখ হাসিনাকেই এটা করতে হয়। বাকিদের কোনো দায়িত্ব নেই। যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত মক্ষীরানী পাপিয়া পাঁচ তারকা হোটেলে অবাধ যৌন ও তদবির বাণিজ্যের হেরেম বসিয়েছিলেন। তাকে ধরা হয়। বিএনপির মির্জা আব্বাসের দু’আনি পথের কর্মী জি কে শামীম গণপূর্তের একচ্ছত্র ঠিকাদারি করে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বনেছেন। সশস্ত্র দেহরক্ষী নিয়ে সাইরেন বাজানো গাড়িতে ঘুরতেন। বিপুল অর্থ মদ অস্ত্রসহ ধরা খেয়ে জেলে। ক্যাসিনোর দুই ভাই বহিষ্কৃত আওয়ামী লীগ নেতা পুরান ঢাকার এনু ও রূপন জেলে। তাদের দুই বাসা থেকে পাওয়া গেছে ৩২ কোটি টাকা। টাকার খনি! দুই ভাইয়ের ব্যাংকে পাওয়া গেছে ১৯ কোটি ১১ লাখ টাকা। ঢাকায় ফ্ল্যাট পাওয়া গেছে ১২৮টি।

লক্ষ্মীপুরের কুয়েতি পাপুল কোনো দিন রাজনীতির পাঠ না নিয়ে আজ নিজেই নয়, বউয়ের জন্যও এমপি কিনে রাজনীতি ও সংসদকে অপবিত্র করেছেন। দুদক তলব করেছে। ২১ কোটি টাকার এমপি বাণিজ্যের ভাগ কারা পেলেন? কেনাবেচার হাটের দালাল, দূতিয়াল ও ভাগীদার ধরবে না? কুয়েতের জেনারেল পর্যন্ত বরখাস্ত তার মানব পাচার দুর্নীতিতে। দেশে তার বিচার শাস্তি হবে তো? অবৈধ পথে অর্জিত অর্থের দম্ভে মূর্খ পাপুল দম্পতিও সামাজিক মর্যাদা কিনেছেন। আইনপ্রণেতার পদ পেয়েছেন। তার মেয়ে এক এমপি কন্যার বিয়েতে রোলেক্স ঘড়ি উপহার দেয়। বক্তৃতায় বলে, ‘মেঘনার জল শেষ হয়ে যাবে, আমার বাপের টাকা শেষ হবে না’।

সমাজ কতটা নষ্ট হলে সামাজিক মর্যাদা টাকায় কেনাবেচা হয়! বঙ্গবন্ধু ও তাঁর কর্মীদের রক্তঝরা, শেখ হাসিনাসহ কত নেতানেত্রী, কর্মীর জীবনবাজি যুদ্ধে গড়া সংগ্রামের আওয়ামী লীগে আজ এত পাপী কোথা থেকে কারা আনল! কারা খুলে দিল বিষাক্ত পাপীদের ক্ষমতার দরজা, কারা দিল সিঁড়ি? কারা দিল পাহারা? গোটা সমাজ এখন সীমাহীন সর্বগ্রাসী লোভের বিষে বিষাক্ত। দেশজুড়ে চলছে রুচির দুর্ভিক্ষ! সুচিন্তা নেই, আছে কুচিন্তা! আমরা উত্তরের মঙ্গা নির্বাসনে দিলেও রুচির ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ থেকে মুক্তি নেই।

সমালোচনা নয়, বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেই চাওয়া বেশি। প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর দৃঢ় অবস্থানের কথা। বলেছেন, ‘আমরা দলীয়ভাবে কাউকে দেখছি না। দুর্নীতিবাজ অপরাধীদের ধরছি বলেই কথা হচ্ছে। দুঃখজনক, আমরা চোর ধরার পর আমাদের চোর বলা হয়।’ হ্যাঁ, মুজিবকন্যা ধরছেন। ধরলেই মানুষ খুশি হয়। কিন্তু ভয় আশঙ্কা অবিশ্বাস সন্দেহ যে, শেখ হাসিনাকে কেনা যায় না, তবে অনেককেই কেনা যায়! ১১ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা দলের ও প্রশাসনের যেসব ক্ষমতাবান এত পাপ ও পাপী তৈরি করেছেন তাদের না ধরলে আমরা পাপমুক্ত হব কি? আটক পাপীরা তো মডেল মাত্র। সমাজে সহস্র পাপী দাপটে চলছে। এদের যারা আশ্রয়-প্রশ্রয় শক্তি সাহায্য দিয়েছেন সেসব রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহালোভীর কোমর ভেঙে না দিলে লোভের লকলকে জিব টানা যাবে না। পাপুল, পাপিয়া, সাহেদ, সাবরিনা, আরিফ, নারী পাচারকারী আজম খানরা দেশের ইজ্জত পৃথিবীতেও শেষ করেছে। কতজন নিরাপদে প্রতারণা লুটপাট করছে। বাইরের দুনিয়ায় খবর হয়েছে বাংলাদেশে করোনার জাল সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। জাল রিপোর্ট হয়। পৃথিবীর পথ বন্ধ হওয়ার জোগাড়। ইমেজের বারোটা!

প্রতারক সাহেদ এখনো গ্রেফতার হয়নি কেন? করোনাকালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তার অবৈধ রিজেন্ট হাসপাতাল চুক্তি করে। ৬ হাজারের বেশি টেস্ট না করেই ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছে। প্রতারণা করে ৩ কোটি টাকা হাতিয়েছে। রোগী ও সরকার থেকে টাকা লুটেছে! বেরিয়েছে তার প্রতারণার পিলে চমকানো ইতিহাস। ওয়ান-ইলেভেনে হাওয়া ভবনের গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের সঙ্গে অবৈধ বাণিজ্যের অপরাধে দুই বছর জেল খাটার কাহিনি। এসএসসি পাস এমন চতুর বাটপার সম্পর্কে আগে জানিনি সংবাদকর্মী হয়ে এটা আমার ব্যর্থতা ও লজ্জা।

ওয়ান-ইলেভেন শেষে জেলমুক্ত হয়ে এমএলএম কোম্পানি বিডিএস ক্লিক ওয়ান খুলে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। তার বিরুদ্ধে ধানমন্ডি থানায় দুটি, বরিশালে একটি, বিডিএস কুরিয়ার সার্ভিসে চাকরির নামে টাকা নিয়ে প্রতারণার কারণে উত্তরা থানায় আটটিসহ ৩২ মামলা রয়েছে। সে মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংক বিমানবন্দর শাখা থেকে ৩ কোটি টাকা লোন নেয় নিজেকে কর্নেল (অব.) পরিচয়ে কাগজপত্র দাখিল করে। দুটি মামলা আদালতে চলমান।

সাহেদের কুকর্ম ফাঁস হলে এখন সবাই কার সঙ্গে তার ছবি তাই ট্রল করতেই ব্যস্ত। কিন্তু প্রশ্ন রাষ্ট্রীয়, সরকারি ও সামাজিক, পারিবারিক অনুষ্ঠানে অনেকের সঙ্গে অনেকে ছবি তোলেন। আমরাও যেখানে যাই অনেকে ছবি তোলেন। এটা নিয়ে বিতর্ক করে পাপীদের রক্ষা করব নাকি তাদের পাপের বিচার চাইব? সব অপরাধীর গডফাদার, সহযোগীদের মুখোশ খুলে আইনের আওতায় এনে বিচার চাইব কিনা তা ঠিক করতে হবে। আমরা না হয় কারও বাড়িতে দাওয়াতে গিয়ে কারও সঙ্গে ছবি আর নাই ওঠালাম। কিন্তু এক সাহেদে সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই তো বেকুব বনে গেল। কারা দাওয়াত করত তাকে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন ও গোয়েন্দা সংস্থা কি খবর রাখেনি! গণমাধ্যমের চোখেও কেন আসেনি! পুলিশ প্রটোকল কেন পেত সাহেদ! কারা দিত? আমাদের অনুসন্ধানী রিপোর্ট কত দুর্বল! প্রতারণার শিকারদের কেউ প্রেস কনফারেন্স করে জানায়নি কেন?

সে গেছে বঙ্গভবন থেকে গণভবন, সেনাকুঞ্জ হয়ে সব রাষ্ট্রীয়, সরকারি-বেসরকারি সামাজিক অনুষ্ঠানে। সবার সঙ্গেই ছবি তুলেছে। গিয়েছে আইজিপির অনুষ্ঠানেও। কোথায় নেই সাহেদ? কারা তাকে ক্ষমতার দরজায় প্রবেশাধিকার দিয়েছিল? প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কোন কর্মকর্তা তাকে সুযোগ দিয়েছেন? কীসের বিনিময়ে? টকশোর কোন কোন অসৎ অ্যাংকর কীসের লোভে তাকে আলোচক বানান? বহুবার টকশোয় বলেছি, সামরিক শাসকরা ওপর থেকে নেতা তৈরি করতেন, আওয়ামী লীগের ১১ বছরে দেখেছি বুদ্বিজীবী তৈরি করতে! তাই বলে অসৎ ভিখিরি অ্যাংকরের টেবিলে এত সস্তা প্রতারককে রাজনীতি বিশ্লেষক বানাল যারা তাদের মুখে আজ মানুষের ঘেন্না। এখনো কত কিসিমের বিজ্ঞ আনে। ইলেকট্রনিক মিডিয়া এ দায় এড়াতে পারে না। সবার সতর্কতা সংশোধন অনিবার্য।

রাষ্ট্রপতি তাকে চিনতেন না, প্রধানমন্ত্রী, সেনাপ্রধান, আইজিপি ও সমাজের বিশিষ্টজনরাও নন। তবু কীভাবে কারা তাকে সুযোগ করে দেন? সে তো ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী এল কে আদভানির সঙ্গেও দেখা করেছে। তার সঙ্গে ছবি নেই এমন মানুষ সমাজে নেই! অথচ কঠিন দুঃসময়ের কত নির্লোভ আদর্শিক মাঠকর্মীরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে পারে না! গণভবন বঙ্গভবনে ঢুকতে পারেন না। ক্ষমতাবানদের কাছে যেতে পারে না কত অসহায় মানুষ। সমাজের কত মর্যাদাবান খ্যাতিমানরা রাষ্ট্রীয় ও সরকারি দাওয়াত কার্ড পান না! ছবি সেল করা বাটপাড়দের দেওয়া হয় সুবর্ণ সুযোগ। এদের ধরতে হবে।

সাহেদ কার হাতে আওয়ামী লীগের মতো পোড় খাওয়া দলের আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপকমিটির ২৪ নম্বর সদস্য হলো? এ দলে কি আকাল পড়েছে যোগ্য লোকের? ছাত্রলীগ করে উঠে আসা কত মেধাবী সমাজে। তাদের খবর কেউ রাখে না! নাকি দলে আজ পুরনো আদর্শিক মার খাওয়া ত্যাগীরা বাতিল, নব্য বাটপাড়রা দুধকলায়? দলের নেতাদের জবাবদিহি কেন করতে হবে না? তদন্ত কেন হবে না? সবার আজ চোখ-কান খোলার সময়। সাহেদের স্ত্রী রিম্মি আরও বড় অভিনেত্রীর মতো কথা বলেছে। বিবেকহীনরা তার পক্ষে সাফাইও গাইছেন ফেসবুকে! রিম্মি নাকি নিজের জীবন নষ্ট করে ফেরাতে চেয়েছে! বিটিভির একসময়ের প্রযোজক, ’৭১-এ জামালপুরের পাক হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে গান গাওয়া শাহিদা আরাবীর কন্যা রিম্মি পাপের সম্পদ দেখে লোভে বিয়ে করে ভোগবিলাস করে। দেহরক্ষী নিয়ে সবার সঙ্গে ছবি তুলে এখন সতী! স্বামীর পাপের সম্পদ, নীতিহীন জীবনভোগে গর্ব, আনন্দ! নারী কেলেঙ্কারিতেই কেবল জ্বালা! সাহেদ এসএসসি পাস হলে, এত মামলা থাকলে কারা কোন আইনে দিলেন পত্রিকার ডিক্লারেশন?

সাবরিনা আরিফ চৌধুরীর পোশাক বিতর্ক হতো না, তিনি যদি ক্যাবারে ড্যান্সার, নায়িকা বা মডেল হতেন। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের কার্ডিয়াক সার্জনের যৌন আবেদনময়ী অর্ধনগ্ন যত ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রয়েছে, পেশার সঙ্গে যায় না। গ্রেফতার হওয়ার সময় ঠিকই সম্মানের সাদা অ্যাপ্রোন গায়ে ধরা দিয়েছেন। বেচতে হবে পেশা, শরীর বাজারে চলছে না। তার স্বামী প্রতারক আরিফ চৌধুরী দোসরদের সঙ্গে আগেই জেলবন্দী। দুজনেরই হালি হালি বিয়ে। এমন বহুবিয়েতে আসক্তদের খপ্পরে কত নর-নারী প্রতারিত হয়েছে। হয়তো তাদের গ্লানি লজ্জাও আছে। জেকেজির চেয়ারম্যান সাবরিনা রূপের ঝলকানিতে শরীরের দাপটে আধিপত্য বিস্তার করেন। বিভাগীয় প্রধান বেহুঁশ ছিলেন। প্রতারক জীবনসঙ্গী মাদকাসক্ত আরিফকে নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সঙ্গে চুক্তি করেন। জেকেজি ২৭ হাজার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা ছাড়াই ১৬ হাজার ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছে। হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ৮ কোটি টাকা। আরিফ ধরা খেয়ে সব বলেছে। অনেকে সাবরিনাকে বাঁচাতে চাইলেও পারেননি। সাময়িক বরখাস্ত নয়, প্রতারণার সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। চিকিৎসক সনদ বাতিল চাই।

স্বাস্থ্য খাতের একচ্ছত্র মাফিয়াডন মিঠুকে ধরা হয় না। তার গডফাদাররা সবখানে বহাল, তার দুর্নীতির চেইন সচল! কেউ ধরা পড়ে না। কি অবস্থা! সব অপরাধীকে ধরতে হবে। সাহেদের সঙ্গে চুক্তিকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, সচিব, মহাপরিচালকই নয়, স্বরাষ্ট্র সচিব, স্থানীয় সরকার সচিব কেন পেছনে দাঁড়িয়েছিলেন? সাহেদ তাদের বুকের ধন মানিক? লজ্জা করেনি? স্বাস্থ্য অধিদফতর ওপরের নির্দেশে চুক্তি বলে যে ব্যাখ্যা দিয়েছে তা তাদের দেউলিয়াত্বের প্রকাশ। মহাপরিচালককে শোকজ করলেই হবে না। অথর্ব মন্ত্রীকে বরখাস্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তাসহ বিভাগীয় পর্যায়ের সিন্ডিকেটের কর্মকর্তাদের ওএসডি করলেই হয়।

এদিকে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে দুবাইয়ে পাচার করে ‘যৌনকর্ম ও ক্যাবারে ড্যান্সে বাধ্য করার’ অভিযোগে আটক হলেন চট্টগ্রামের আজম খান। সেখানে চারটি হোটেলে আয়ের উৎস হলো ড্যান্সবার। গত আট বছরে সহস্রাধিক তরুণীকে আরব আমিরাতে পাচার করেছে। ছয়টি হত্যা মামলাসহ আজম খানের বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা রয়েছে।

আজ সমাজে বহুরূপী বাস করে বেশি। কে ডাক্তার, কে মক্ষীরানী না রাজনৈতিক নেত্রী, কে চোর বাটপাড় প্রতারক নাকি তদবিরবাজ, কমিশনভোগী দালাল, প্রতারক না দলের নেতা, কে সৎ কে লোভী অসৎ, কে আদর্শিক সত্যবাদী, কে চরম মিথ্যুক, কে সৃজনশীল নাগরিক কে বিকৃত, রুচিহীন, কে টিভির অ্যাংকর কে অসৎ সস্তা ভিখিরি, কে দুর্নীতিবাজ সাংবাদিক, কে সৎ কমিটেড, কে চিটার কে পেশাদার, কে সৎ পাবলিক সার্ভেন্ট, কে দুর্নীতিবাজ দাম্ভিক নব্য দলবাজ আমলা, কে রাজনৈতিক কর্মী, কে অনুপ্রবেশকারী বা বেশ্যার দালাল কে শিল্পী, কে রক্ষিতা, কে মডেল, অভিনেত্রী, কে দেহপসারিণী, কে দেশপ্রমিক ব্যবসায়ী, কে ব্যাংক ডাকাত অর্থ পাচারকারী, কে আইনজীবী, কে আদালতপাড়ার টাউট, কে প্রেমিক, কে নির্দয় চতুর প্রতারক বোঝা যায় না, চেনা যায় না! সমাজকে কতিপয় চরিত্রহীন চরম লোভী ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারী এমন করেছে যে চেনা বড় দায়! এ সমাজে বিচরণ করতে বড় ভয়! এ সমাজ মেনে নেওয়ার নয়! এ দায় বিভিন্ন পেশার ক্ষমতাবান বা দায়িত্বশীলরা এড়াতে পারেন না। মানুষেরও চরিত্র নষ্ট হচ্ছে। এই পাপীদের দায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শক্তিকে নিতে হবে। বের করতে হবে মোড়লদের। সমাজের মানুষেরও দায় নিতে হবে। জাগতে হবে। প্রতিবাদ করতে হবে। সমাজের ভারসাম্য রক্ষাকারী মধ্যবিত্তের একটা অংশও লোভে ভেসে যাচ্ছে। লোভের পথ রুখতে হবে।

চাণক্য ছিলেন ভারত উপমহাদেশের নামকরা অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি ও কূটনীতির গুরু, দার্শনিক। তিনি ছিলেন চন্দ্রগুপ্তের মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রধানমন্ত্রীই নন সফল চালিকাশক্তিও। প্রায় ২৩০০ বছর আগে তিনি তাঁর শিক্ষাদান ও কর্মকা- চালিয়েছেন। কৌটিল্য বা বিষ্ণুগুপ্ত নামেও তিনি পরিচিত।

ভারতের কূটনীতিকে এখনো চাণক্যনীতি ও দিল্লির মনোরম কূটনৈতিক পল্লীকে চাণক্যপাড়া বলা হয়। চাণক্য বলেছেন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সবকিছুই বিষ, যার একটি লোভ। লোভ আজ গোটা বাংলাদেশের রাজনীতি অর্থনীতি প্রশাসন সমাজ পরিবার সবকিছুকেই কলুষিত তছনছ করে দিয়েছে। লোভের বিষাক্ত সমাজকে বাঁচাতে হবে সবাই মিলে। ক্লাইভ জেমসের উক্তি, ‘বিখ্যাত না হয়ে জীবন কাটালেও সুন্দর জীবন কাটানো সম্ভব, কিন্তু জীবনের মতো জীবন না কাটিয়ে বিখ্যাত হওয়া কখনো সুন্দর জীবন হতে পারে না’Ñ এটা ভুলতে বসেছি। সবাই রাতারাতি যেনতেন টাকা চাই, ক্ষমতা বাহাদুরি চাই। পরিবার সমাজ সেই সহজ সরল সৎ নিরাভরণ জীবনের আদর্শিক মায়ামমতার বন্ধন ছিন্ন করে বেপরোয়া অশান্ত হিংসা বিদ্বেষ সীমাহীন লোভের রাহুগ্রাসে পতিত।

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি দার্শনিক এপিজে আবদুল কালাম চমৎকার বলেছেন, যদি একটি দেশকে দুর্নীতিমুক্ত এবং সুন্দর মনের মানুষের জাতি হতে হয়, তাহলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এ ক্ষেত্রে তিনজন সামাজিক সদস্য পার্থক্য এনে দিতে পারেন। তারা হলেনÑ বাবা, মা এবং শিক্ষক। আমাদের মায়েদের আদর্শলিপি কি এখন হৃদয় দিয়ে পাঠ হয়? অনেক বাবা ছেলের দলীয় পদবাণিজ্যে বিনিয়োগ করেন! শিক্ষকরা জ্ঞানের আলো নয়, গুরু নয়, দলকানা লোভ মোহে অন্ধ। তারা কি বদলাবেন?

যেখানে পদবাণিজ্য, কমিটিবাণিজ্য, মনোনয়নবাণিজ্য হয় সেখানে আদর্শ আর রাজনীতি থাকে কোথায়? যেখানে নিয়োগবাণিজ্য, কমিশনবাণিজ্য, ফাইল আটকে ঘুষবাণিজ্য রমরমা হয় সেখানে মানবসেবা, জনসেবা আইন সংবিধান থাকে কোথায়? যেখানে বঙ্গবন্ধুর নামে এমপি মন্ত্রী হয়ে, শেখ হাসিনার নামে দলের পদবি, রাজনৈতিক নিয়োগ নিয়ে অবৈধ অর্থবিত্ত অর্জন করে সেখানে রাজনীতি কতটা অন্তঃসারশূন্য? কতটা বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা ও দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা? বিশ্বাসঘাতক অসৎ লম্পট চরিত্রহীন লোভী প্রতারক দিয়ে দেশপ্রেম নয়, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বাংলাদেশ নয়, নষ্ট সমাজ তৈরি করা যায়। এ নষ্ট সমাজ আজ মানুষের বসবাস উপযোগী নয়, প্রতারক বাটপাড় অসৎদের বিচরণ ভূমিতে পরিণত। লাজলজ্জা মূল্যবোধ নীতি আদর্শ শালীনতা সততার মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়েছে। সমাজটাকে মেরুদন্ডহীন লোভী, লম্পট, দালাল, পেশাদার তদবিরবাজ, দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, ব্যাংক ডাকাত, বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের অভয়াশ্রমে পরিণত করেছে।

একটা সময় লোভহীন সমাজে সবাই যার যার আত্মমর্যাদা নিয়ে সামাজিক মর্যাদায় বাস করতেন। আদর্শিক মূল্যবোধের রক্ষণশীল মধ্যবিত্তের ভারসাম্য রক্ষা করা সমাজে সবাই সৎ ছিলেন। সমাজে অসৎ টাউট বাটপাড় দুর্নীতিগ্রস্ত চরিত্রহীন নর-নারীর কেবল মর্যাদা ছিল না। লোভের পাপ সব কেড়ে নিয়েছে।

’৭৫ সালে জাতির পিতাকে হারানোর জখম বুকে আমরা সয়েছি দীর্ঘ পথে খুনিদের দম্ভ। ঘৃণা খুনি ও তার পরিবারের জন্য। কি কঠিন অন্ধকার দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়েছে! এখন তো গোটা দেশ আওয়ামী লীগ। সেদিন আজকের অজস্র মোনাফেক যেন আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগ করেছিল! এখন চেনা যাবে না। তখন যাবে। যেমন দেখেছি আমরা সেই সময়, এখন দেখছে বিএনপি! তাদের হৃষ্টপুষ্ট বিড়াল এখন আওয়ামী লীগ সরকারের দুধের হাঁড়িতে। ক্ষমতা গেলে মুখ মুছে ধীর পায়ে হেঁটে যাবে নিরাপদে। এখন ক্ষমতার লোভে যারা বাহাদুর তখন হবেন ইঁদুর।

পুনশ্চ : দৈনিক যুগান্তর ও যমুনা টিভির প্রতিষ্ঠাতা, যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান, শিল্পপতি নুরুল ইসলাম বাবুলও করোনার থাবায় চলে গেলেন! আমরা জানি না আরও কতজনের মৃত্যু কত শূন্যতার সৃষ্টি করবে। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতে ঠাঁই দিন। লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন