উপসর্গ নেই কিন্তু তারা নীরবে সংক্রমণ ছড়াচ্ছেন

২ জুন ২০২০


উপসর্গ নেই কিন্তু তারা নীরবে সংক্রমণ ছড়াচ্ছেন



যত দিন যাচ্ছে বিজ্ঞানীরা করোনাভাইরাসের অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে নতুন নতুন সব তথ্য জানতে পারছেন। এর কিছু কিছু চিন্তায় ফেলে দিয়েছে তাদের। সবাই এতদিনে জেনে গেছেন যে, কোভিড-১৯ সংক্রমণ হলে মানবদেহে জ্বর, কাশি, স্বাদ-গন্ধের অনুভূতি চলে যাওয়া এসব উপসর্গ দেখা দেয়। কিন্তু এমন কিছু লোক আছেন যাদের দেহে কোন উপসর্গই দেখা দেয় না। তারা জানতেও পারেন না যে, তারা করোনাভাইরাস বহন করছেন এবং সবচেয়ে ভয়ের কথা, তারা নীরবে অন্যদের সংক্রমিত করে চলেছেন।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ঠিক কত মানুষের মধ্যে এরকম ‘উপসর্গ-বিহীন’ সংক্রমণ ঘটেছে এবং এই ‘নীরব বিস্তারকারীরাই’ এই ভাইরাস এত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার জন্য দায়ী কিনা, তা জানা এখন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। এটা এমন এক তথ্য যা জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরামর্শের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর আগে বলা হচ্ছিল করোনাভাইরাস ঠেকাতে হলে নিজের বা অন্যদের কোন উপসর্গ দেখা যাচ্ছে কিনা তার দিকে নজর রাখতে হবে। কিন্তু এখন জানা গেল, কোন উপসর্গ না থাকলেও নীরবে এবং অদৃশ্যভাবে এ ভাইরাস ছড়াতে পারে।

তাহলে এই ভাইরাসকে ঠেকানো যাবে কীভাবে?

উপসর্গ দেখা দেবার আগেই রোগ বিস্তার ঘটে যাচ্ছে। একে বলে প্রি-সিম্পটম্যাটিক ট্রান্সমিশন। যখন কারো দেহে কোভিড-১৯ সংক্রমণের লক্ষণ যেমন জ্বর, কাশি –

এগুলো দেখা দেবার আগেই অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়াতে শুরু করে। এক জরিপে দেখা যায়, করোনাভাইরাস কারো শরীরে ঢোকার পর ২৪ থেকে ৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত সময়টায় কোন লক্ষণ দেখা না দিলেও আক্রান্ত ব্যক্তি ‌অত্যন্ত সংক্রামক‌ বা হয়তো সবচাইতে বেশি সংক্রামক হতে পারেন ।

এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাহলে আপনার দেহে উপসর্গ দেখা দেবার সাথে সাথে আপনার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের আপনি সতর্ক করে দিতে পারেন যে, তাদের এখন ঘরে আইসোলেশনে থাকতে হবে। কিন্তু ঠিক কীভাবে একজন থেকে আরেকজনে ভাইরাস ছড়ায়, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি দেবার সময় নাক-মুখ দিয়ে যে ড্রপলেটস্ বা অতি ক্ষুদ্র পানির কণা বেরিয়ে আসে তার মধ্যেই থাকে ভাইরাস। কিন্তু যার কাশির উপসর্গ দেখা দেয়নি, সে কীভাবে ভাইরাস ছড়াবে?

কোন কোন বিশেষজ্ঞ বলছেন, কথা বলার সময় বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমেও ড্রপলেটস্ বেরিয়ে আসতে পারে। কারণ এ সময়টায় শ্বাসনালীর ওপরের অংশেই

ভাইরাসগুলো অবস্থান করে এবং প্রতিবার নি:শ্বাস ফেলার সময়ই এগুলো বেরিয়ে আসতে পারে। কাজেই কাছাকাছি কেউ থাকলে, বিশেষত ঘরের ভেতরে খুব সহজেই সংক্রমিত করতে পারে।

সংক্রমণের আরেকটা বড় উপায় হলো স্পর্শ। কারো হাতে ভাইরাস লেগে থাকলে তিনি যদি আরেকজনের হাত ধরেন, বা দরজার হাতল, টেবিল-চেয়ার বা অন্য কিছু স্পর্শ করেন, তার মাধ্যমেও এটা ছড়াতে পারে। কিছু লোকের দেহে ভাইরাস সংক্রমণ ঘটেছে, কিন্তু তার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এই রহস্যময় ব্যাপারটা কীভাবে ঘটে তার কোন সুনির্দিষ্ট উত্তর বিজ্ঞানীরা দিতে

পারছেন না।এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ব্রিটেনের কেম্ব্রিজের এ্যাডেনব্রুক হাসপাতালের একজন নার্স এ্যামেলিয়া পাওয়েল। যিনি এ্যাসিম্পটম্যাটিক, অর্থাৎ তার দেহে ভাইরাস উপস্থিত থাকলেও এর কোন লক্ষণ ছিল না।

তিনি বলছিলেন, ‍‘আমি হাসপাতালের রোগীদের দেখে চিন্তিত হতাম যে, কোন দিন আমারও এটা হতে পারে কিনা। কিন্তু আমি নিজে কোন কিছুই অনুভব করিনি, আমি স্বাভাকিভাবেই খাওয়াদাওয়া, ঘুম, ব্যায়াম করছিলাম।’

একেবারেই ঘটনাচক্রে হাসপাতালের স্টাফদের এক জরিপে অংশ নেবার কারণে তার করোনাভাইরাস টেস্ট করাতে হয়। পরীক্ষায় করোনাভাইরাস পজিটিভ ধরা পড়ার পর তাকে কাজ ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে আইসোলেশনে থাকতে হয়। জরিপে ধরা পড়ে যে, প্রতি এক হাজার লোকের মধ্যে প্রায় ৩ শতাংশ লোকের দেহে করোনাভাইরাস থাকলেও তার কোন উপসর্গ দেখা যায় না।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ সংক্রান্ত ২১টি গবেষণা প্রকল্পের উপাত্ত পরীক্ষা করে দেখেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কার্ল হেনেগ্যান। তিনি বলছেন, উপসর্গবিহীন কোভিড-১৯ ভাইরাস বহনকারীর অনুপাত ৫ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এর সংখ্যা নির্ণয় করার মতো নির্ভরযোগ্য জরিপ একটিও নেই।

এরকম লোকেরা কত বড় ঝুঁকি?

এ্যামেলিয়ার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, তিনি হয়তো না জেনেই তার সহকর্মী বা তার পরিচর্যা পাওয়া রোগীদের কোভিড-১৯ ভাইরাসে সংক্রমিত করেছেন। তিনি কতদিন ধরে কোভিড পজিটিভ তাও তিনি জানেন না। তবে তার কথা, ‘আমরা এটাও জানিনা যে উপসর্গবিহীন লোকেরা আসলেই সংক্রামক কি না, এটা সত্যি বড়ই অদ্ভুত।’

চীনের একটি জরিপে দেখা গেছে, উপসর্গবিহীনদের সংখ্যা আসলে উপসর্গ দেখা গেছে এমন কোভিড রোগীদের চেয়ে বেশি এবং এটা সংক্রমণ রোধ বা নিয়ন্ত্রণের কর্তৃপক্ষের মনোযোগ দাবি করে।

ব্রিটেনের আর্লহ্যাম ইনস্টিটিউট নামের একটি গবেষণা সংস্থার প্রধান অধ্যাপক নিল হলের মতে, উপসর্গবিহীন কোভিড১৯ বহনকারীরা হচ্ছেন এই মহামারির ‘ডার্ক ম্যাটার।’ হয়তো তারাই এ মহামারি জিইয়ে রেখেছে, বলছেন তিনি।

ক্যালিফোর্নিয়ার একদল বিজ্ঞানী বলছেন, মহামারির ব্যবস্থাপনার ওপর এ ধরনের উপসর্গবিহীন সংক্রমণের ঝুঁকি গভীর প্রভাব ফেলছে। এখন, যখন বিভিন্ন দেশে একে একে লকডাউনজনিত বিধিনিষেধ শিথিল করা হচ্ছে, তখন এই অদৃশ্য ঝুঁকির মোকাবিলা করা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এজন্য সম্ভব সকল ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা এবং তা না পারলেও মাস্ক ব্যবহার করা– এগুলোই হতে পারে সর্বোত্তম প্রতিরক্ষা। হয়তো এগুলোতে ভাইরাস বিস্তার পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব হবে না। কিন্তু আমরা এ সম্পর্কে এখনো এত কম জানি যে, এই পন্থাগুলো চেষ্টা করে দেখলে ক্ষতি কী? সূত্র : বিবিসি