শয়তানকে অপমান করতেই বারবার সত্য বলি

৬ মে ২০২০


শয়তানকে অপমান করতেই বারবার সত্য বলি

অভিশপ্ত করোনার মহাপ্রলয়ের ধ্বংসলীলার মধ্যেই নিস্তব্ধ পৃথিবীর বিষাদগ্রস্ত মানুষের জীবন চলছে কঠিন অসহায়ত্বের মাঝে। পৃথিবীজুড়ে করোনার কালো থাবা কেবল মর্মান্তিক মৃত্যুর বিভীষিকাময় অন্ধকার সময়েরই মুখোমুখি করেনি, অর্থনীতিকেও লন্ডভন্ড করে মহাবিপর্যয় এনে দিয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অতিরিক্ত মিথ্যা অহংকারকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে দেউলিয়াত্ব উন্মোচন করেছে। সোজা ঔদ্ধত্যের সঙ্গে প্রতাপশালীদের দেখিয়ে দিয়েছে যে যত বড় যুদ্ধবাজই হোন না কেন, যে যত ধনিক রাষ্ট্রই হোক না কেন এক ছোট্ট জীবাণুর কাছে সবাই পরাস্ত হয়ে এক মোহনায় মিলিত হয়ে নিজেদের দম্ভ বিচূর্ণ হতেই দেখছেন না, বেঁচে থাকার করুণ আকুতি নিয়ে লড়াই করছেন। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্রও প্রমাণ করেছে সামরিক খাত থেকে ভোগের রাজ্য যতই সবল স্বাস্থ্যসেবা ততই দুর্বল।

উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোও জনগণের সঙ্গে চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। করোনার প্রলয় থেকে জনগণের জীবনের নিরাপত্তা দিতে পারেনি। বিশেষ করে চীনের উহানে এই করোনার ভয়াবহতা দেখেও যারা সজাগ সতর্ক প্রস্তুত হয়নি তাদের প্রাণহানি সর্বোচ্চ ঘটেছে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পর ইউরোপ শীর্ষে। অথচ যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে উঠে আসা ভিয়েতনাম দেখিয়েছে জনগণের দারুণ সুরক্ষা। দেখিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। এমনকি ভারতের কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলা কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। সংবিধান হলো রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কের চুক্তিনামা। সংবিধান ও আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা নিশ্চিত হয়। রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের কর্তব্য ও নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিশ্চিত করে। সংবিধানে জনগণকেই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করে তার মৌলিক চাহিদার অন্যতম চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করেছে। সেখানে পৃথিবীতে করোনার যুদ্ধে একটা ভ্যাকসিন বা ওষুধ নেই। পিপিই, মাস্ক, আইসিইউ, ভেনটিলেশন, ডাক্তার, নার্স, হাসপাতালের বেড, লাশের প্যাকেট, দাফনের জায়গার সংকট দৃশ্যমান হয়েছে। ভ্যাকসিন কে কবে আবিষ্কার করবেন লকডাউনের মৃত্যুপুরী পৃথিবীজুড়ে তার বিতর্ক চলছে। আশাই কেবল, নিশ্চিত খবর নেই।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা হতাশা ছাড়া টানেলের শেষ প্রান্তে আলোর রেখা দেখাতে পারেনি। তবে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষের চেয়ে শক্তিশালী কিছু নয়। সাংবাদিকতা থেকে সাহিত্যে গিয়ে নোবেলজয়ী আমেরিকান লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে যথার্থই বলেছেন, ‘মানুষ পরাজয়ের জন্য সৃষ্টি হয়নি। তাকে হয়তো ধ্বংস করা যায়, কিন্তু হারানো যায় না।’ করোনা মহামারীকে পরাজিত করে মানুষই শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে। তবে তার আগে বিশালসংখ্যক মানুষকে হারাতে হবে। ১০০ কোটি নাকি আক্রান্ত হবে। সেটিই বেদনার সঙ্গে মেনে নেওয়ার বিষয়।

এখন আগে জীবন না অর্থনীতি- এ প্রশ্নে লকডাউন তুলে এর সঙ্গে মানিয়ে জীবনযুদ্ধের কথা চলছে। যেন নিয়তির হাতে সঁপে দিয়ে জীবনের জন্য স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি বাঁচাতে এগিয়ে যাও। অনির্দিষ্টকাল উৎপাদনহীন, কর্মহীন, ঘরে বসে খাবার সুযোগ নেই। পশ্চিম থেকে পুবের দরজা গুঁড়িয়ে দিয়ে আমাদের মতো দেশের জন্য বড় বেশি যন্ত্রণার ক্ষত সৃষ্টি করেছে করোনা। বিশ্ব অর্থনীতির মহাবিপর্যয় আসন্ন। অনেক রাষ্ট্র দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছে। আমাদেরও তার দায় বহন করতে হবে। আমরা কঠোর লকডাউনে যেতে পারিনি। ইতালি ফেরতে শুরু, গার্মেন্টে বিস্ফোরণ, এখন ঈদ- কারও জীবনে আনন্দ আসবে না। তবু শপিং মল, দোকানপাট খুলবে! পরিণতি? স্বাস্থ্যমন্ত্রী নয়, আল্লাহই জানেন। আমাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। পরামর্শ দেয় কারা? বাণিজ্যমন্ত্রী?

রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা যথার্থই বলেছেন, লক্ষ্য অর্জনে দেশকে এগিয়ে নিতেই আঘাত। উন্নয়নে শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে বিস্ময় সৃষ্টি করেছিল। করোনায় বড় হোঁচট খেল। ২০০৯ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দায় ইউরোপ-আমেরিকার বেহাল বিপর্যয় দেখলেও আমাদের অর্থনীতিকে তিনি রক্ষা করেছিলেন। এবারও ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা, ব্যাংক সুদ মওকুফসহ দারুণ প্রশংসিত সব পদক্ষেপ নিয়েছেন। কর্মহীন দরিদ্রদের ঘরে ঘরে খাদ্যপণ্য ত্রাণ, ১০ টাকা কেজি চাল, নগদ অর্থ সরবরাহের পদক্ষেপ নিয়েছেন। কেউ না খেয়ে থাকবে না বা মরবে না বলছে সরকার। সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছেন শেখ হাসিনা। বলেছেন, রেকর্ড পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন হয়েছে। ইকোনমিস্ট বলেছে, এ মহামারীতেও বাংলাদেশের অর্থনীতি ভারত ও চীনের চেয়েও নিরাপদ থাকবে। ৬৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান নবম। এমনকি পেশাক রপ্তানিতে আমাদের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামও বাংলাদেশের পেছনে রয়েছে। এটা তারা অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও চাহিদার ভিত্তিতে করেছে।

শেখ হাসিনার শাসনামলে নির্বাচন, গণতন্ত্র, সুশাসনের বিতর্ক যতই থাক, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে দেশকে এত দুর্নীতির মধ্যেও অর্থনৈতিক উন্নয়নে কিস্তিমাত করে নিজের নেতৃত্বকে শক্তিশালী চেহারায় বিশ্ব রাজনীতিতে আবির্ভূত করেছিলেন। এ বয়সেও তিনি ১৮ ঘণ্টা পরিশ্রমী ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ক্ষিপ্র। কিন্তু তার দলে বা মন্ত্রিসভায় সেই গতির সঙ্গে চলা আর কেউ নেই। করোনা যুদ্বের শুরুতেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রীসহ অনেকের চরম ব্যর্থতা উন্মোচিত হয়েছে। তিন মন্ত্রী ও তাদের কর্মকর্তাদের হাত ধরে দুর্নীতিগ্রস্ত স্বাস্থ্য খাত কতটা দেউলিয়া- সেটিই উন্মোচিত হয়নি, নির্লজ্জ অথর্ব দুর্নীতিবাজদের বেহায়া চেহারাও সামনে এসেছে। এদের কথা বারবার আসে আর আমাদের শাস্তি ভোগ করতে হয় তাদের ব্যর্থতা ও অপরাধে। প্রাচীন ইংলিশ প্রবাদে আছে, ‘সত্য কথা বলে শয়তানকে অপমান কর’। আমি তাই শয়তানকে অপমান করতে সত্য বলি। মানুষকেও আজ সত্য বলে শয়তানকে অপমান করার সময়। এরা শপথ সংবিধান আইন লঙ্ঘন করে।

শেখ হাসিনা যত শক্তিশালী উজ্জ্বল তার মন্ত্রিসভা ততই ধূসর দুর্বল হয়ে সামনে এসেছে। আগের মন্ত্রিসভাও এমন ছিল না। দলে আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, মতিয়া চৌধুরীর মতো অভিজ্ঞ দাপুটে নেতা ও দক্ষ মন্ত্রীরা ছিলেন। কেন আজ তারা বাইরে জানি না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে তোফায়েলের দক্ষতা-সফলতা বর্তমান গার্মেন্ট মালিক-ব্যবসায়ী বাণিজ্যমন্ত্রীর ব্যর্থতা সামনে এনেছে। সরকার মহাজোটগতভাবে হলেও এ মন্ত্রিসভার চেয়ে উত্তম হতো। মতিয়া চৌধুরীর সততা ও নির্লোভ চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন নেই। মেজাজ ও নিজে ছাড়া কেউ সৎ নয় এমন ভাবনা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। স্বাস্থ্য তাকে দিলে দুর্নীতির রাহুমুক্তি হতো। করোনা যুদ্ধে জনগণ শেখ হাসিনাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে।

করোনার যুদ্ধে কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক দরদি সেবকের মতো দেশের হাওরে, কৃষকের জমিনে ছুটেছেন। ধান কাটার লোক দিয়েছেন। সারা দেশের প্রতি জেলায় ধান কাটার জার্মান মেশিন দিয়েছেন ৭০ শতাংশ সরকারি ভর্তুকিতে। তালিকা অনুযায়ী সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ৮ লাখ মেট্রিক টন ধান কেনার কথা বলেছেন, যা আগের চেয়ে বেশি। সুনামগঞ্জের হাওরেও গিয়েছিলেন। সদরের এমপি সে জেলা থেকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন ধান কেনার প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি ফিরে এসে মিটিংয়ে সেটি বাড়ানোর কথাও বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৃষকবান্ধব দীর্ঘ পরিকল্পনা, পদক্ষেপ সহায়তায় এবারও বাম্পার ফলন হয়েছে। হাওরের প্রতি তার মমত্ববোধ বরাবরের। হাওরের সন্তান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদও বরাবরের মতো নজর রেখেছেন। প্রকৃতিও এবার সহায় ছিল। যদিও হাওর রক্ষাবাঁধে বিপুল বরাদ্দ দিয়ে কাজের দায়িত্ব প্রশাসনের হাতে দিলেও দুর্নীতি-অনিয়ম কমেনি।

করোনার মহাবিপর্যয়কালে খুন-ধর্ষণ এমনকি রিলিফ চুরির ঘটনা যেমন ঘটেছে, তেমনি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মানবিকতার চেহারার বিপরীতে রাজনীতির নির্বোধ একদল নেতানেত্রী সরকারি কর্মকর্তার ধান কাটা নাটকের ফটোসেশনের কুৎসিত ছবিও এসেছে। ড. রাজ্জাক যখন সুনামগঞ্জে গেলেন তখন জেলা আওয়ামী লীগের এক মাকাল ফল নাকি সামনের নির্বাচনে মনোনয়ন চেয়ে তার কান ঝালাপালা করে বিরক্ত করছিল। যেন মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াই নয়, দেশে ভোটযুদ্ধ এসেছে। অনভিজ্ঞ অর্বাচীনদের হাতে দলের পদবি গেলে এমনই হয়! সরকারি ত্রাণের বাইরে মন্ত্রী এমপি নেতা সমাজসেবী ব্যবসায়ী সব মহলই মানুষের দুয়ারে খাদ্যপণ্য, অর্থ সাহায্য পৌঁছে দিয়ে যেমন মানবিক হৃদয়ের প্রমাণ দিয়েছেন; তেমনি প্রধানমন্ত্রীর উপহার বা সরকারি ত্রাণও অনেকে নিজের নামে বিলি করে বিতর্কিত হয়েছেন। সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জের ফেনারবাক ইউনিয়নের আশ্রয়ণ প্রকল্পের গম সিলেটের মিলে ঠাঁই পেয়ে খবর হয়েছে!

মানুষের মনোজগতেও বিশাল প্রভাব ফেলেছে করোনা। অর্থবিত্ত ক্ষমতা ভোগবিলাসের লোভ ও হিংসা-বিদ্বেষের কবলে পতিত নষ্টদের হাতে যাওয়া সমাজের নাগরিক মন কোয়ারেন্টাইনে স্তব্ধ হয়ে চিন্তার সুযোগ পেয়েছে। দেখেছে কত মর্মান্তিক মৃত্যুর যন্ত্রণা। জীবন কত তুচ্ছ। পরিবর্তনের নাড়া দিয়েছে মানুষের চিন্তার জগৎকে। পৃথিবীকে মানবিকভাবে গড়ার তাগিদ দিয়েছে প্রবলভাবে। সামরিক শক্তির চেয়ে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বৃদ্ধিই নয়, মানুষের জীবনযাত্রায় পরিমিতিবোধের নিরাভরণ সাদামাটা দিনযাপনেরও তাগিদ দিয়েছে।

শেখ হাসিনার সুসময়-দুঃসময়ে পাশে থাকা এককালের সরকারি কর্মকর্তা ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে আসা দলের নেতা আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম কদিন আগে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন জি কে শামীমদের উপমা করে। প্রশ্ন করেছিলেন উপরের দায়িত্বশীলরা আশ্রয়-প্রশ্রয় না দিলে তারা সৃষ্টি হয় কীভাবে? একদম একমত। স্বাস্থ্য খাতে বছরের পর বছর রাজ্জাকের জেএমআই, মিঠু সিন্ডিকেট কারা প্রশ্রয়-আশ্রয়ে পুষেছে? ঠিকাদার তো সব সময় ছিল। এটা পেশা। তারা নিয়ম-নীতি মেনে কাজ পাবে টেন পারসেন্ট ফিফটিন পারসেন্ট লাভ করে চলে যাবে। কিন্তু রাজদুর্নীতি সবখানে সিন্ডিকেট তৈরি করে যখন দায়িত্বশীলরা ঠিকাদারকে বলবেন তাদের ফোরটি পারসেন্ট দিতে হবে, এবং একাংশ আগে, তখন দুর্নীতির মহোৎসবে লুট চলে সবখানে সমানে। কর্মচারী আবজাল ১৫০০ কোটি টাকার মালিক হয়ে বিদেশ পালায়। উন্নয়ন বরাদ্দ গিলে খায় রূপপুরের বালিশ আর ৩৭ লাখ টাকার পর্দা।

আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম এমপি-মন্ত্রী নন। দলেও পদবি নেই। আদর্শিক দায়বদ্ধতা আছে। গণমুখী চরিত্র আছে। তাই চিকিৎসক স্ত্রী জাহানারা আরজু যান করোনা যুদ্ধে। তিনি ঘরে ঘরে চাল পাঠান। এলাকায় মা-বাবার নামে গড়ে তোলা ডায়াবেটিক হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য আইসিইউর ব্যবস্থা করেন। ভোলার চরফ্যাশন-মনপুরা প্রকৃতির নৈসর্গিক লীলাভূমি। সেখানকার এমপি আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের সঙ্গে পরিচয় আছে, সখ্য নেই। করোনাকালে ‘মানুষ মানুষের জন্য’ কর্মসূচি নিয়ে ২০ হাজার মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে খাদ্যসহায়তা দিয়ে যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন গত কদিন গণমাধ্যমজুড়ে তার খবর। ভবঘুরে পাগল ছিন্নমূল মানুষই নয়, এলাকার কুকুরের জন্যও নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। আনসার-ভিডিপি, চৌকিদার, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে মুগ্ধ করেছেন। সামাজিক দূরত্ব রেখে এমন ত্রাণ বণ্টনের ছবি বিরল। জামালপুরের নুর মোহাম্মদের ভাগ্যে মনোনয়ন জোটে না, জায়গা-জমি বিক্রি করে মানুষকে সাহায্য করে নিজে নিঃস্ব। গাড়ি বিক্রি করে দেয় সাহায্য থামে না।

রাজনীতিবিদরা দেশটা স্বাধীন করেছেন, গণতন্ত্রকে মুক্ত করেছেন। অথচ রাজনীতি তাদের হাতে নেই। নিজেরা একজন আরেকজনকে সাইজ করতে গিয়ে, একজন আরেকজনের অনুসারীর মনোনয়ন ঠেকিয়ে নিজের লোক বসাতে গিয়ে হাইব্রিড আমদানি করেছেন। কর্মীরা মূল্য পায়নি। বাকিটা নানামুখী ষড়যন্ত্রের ইতিহাস। আদর্শিক রাজনীতি নেই, আছে রাজদুর্নীতি। ব্যবসায়ীরা এসে মন্ত্রী-এমপি। এমপি-নেতারা অনেকে হয়েছেন রাতারাতি ব্যবসায়ী। অনেক এমপি এলাকায় অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে কমিশন বাণিজ্যের অধিপতি। ১১ বছরে অনেক নেতা-কর্মী অঢেল সম্পদ-অর্থের মালিক। আদর্শিক নেতা-কর্মী আজ রাজনীতিতে এতিম। তবু রাজনীতির ময়দানে থাকা এমপি-নেতাদের হাতে টাকা থাকলে মানুষের কপালে জোটে। সরকারি কর্মকর্তাদের হাতে গেলে মুঠো থেকে একফোঁটা পানিও পড়ে না মানুষের জন্য। কতজন প্রকৌশলী থেকে সরকারি কর্মকর্তা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন ব্যক্তিগতভাবে? পরিবহন শ্রমিকরা এখন না খেয়ে আছে, তাদের মালিকরা কোথায়? শ্রমিকদের কল্যাণে বিপুল অঙ্কের টাকা তোলা নেতারা কোথায়?

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস ৩ মে সকালে খবর এলো নিখোঁজ সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলকে পাওয়া গেছে। স্বদেশের সন্তান হয়ে গেল অনুপ্রবেশকারী। দুর্ধর্ষ অপরাধীর মতো তাকে পিঠমোড়া হ্যান্ডকাফ পরিয়ে পুলিশ হাজত থেকে আদালতে নিল। কেন করল পুলিশ? ভোররাতে তো তিনি তার স্ত্রীকে ফোন করেই বলেছিলেন বেঁচে আছেন। তাদের বেনাপোল যেতে বলেছিলেন। ছেলে তো বাবার ডাকে ছুটেছিল! পরিবারের বুক থেকে তো ভারী পাথর সরেছিল! মানুষের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কেটেছিল! কাজল তো কোনো দুর্ধর্ষ খুনি নন! জঙ্গি-সন্ত্রাসী নন। ধর্ষক, ব্যাংক লুটেরা নন! বিদেশে অর্থ পাচারকারী নন। তাহলে কেন এমন করোনাকালে এভাবে তাকে নিতে হবে? পৃথিবীকে দেখাতে হবে করোনাকালে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে সাংবাদিক কাজলদের এভাবে পিঠমোড়া হ্যান্ডকাফ পরানো হয় বাংলাদেশে শেখ হাসিনার শাসনামলে? অতি উৎসাহী পুলিশ কার হুকুমে এমনটা করেছে? আর করতে পেরেছে সে দুর্বল মানুষ বলে? কই ডিআইজি মিজানের মতো পাপাচারে ডুবন্ত দুর্নীতিবাজ ফৌজদারি অপরাধীর হাতে তো হ্যান্ডকাফ পরানো হয়নি! কাজল গরিব? ক্ষমতাশালী নন তাই? কাজল মার্চের ১০ তারিখ নিখোঁজ হয়েছিলেন। আহারে! স্ত্রী-সন্তান কতই না খুঁজেছেন তাকে। পাগল হয়ে খুঁজেছেন। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কেটেছে দুঃসহ দিন-রাত। আমরা গণমাধ্যম তার সন্ধান চেয়েছি বারবার। পথে মানববন্ধন করেছেন সহকর্মী-স্বজন। ৯০ ছাত্রআন্দোলনের নেতা শফি আহমেদই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার নিখোঁজ হওয়া নিয়ে লড়াইটা করেছেন। মানববন্ধনে গেছেন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কাজল ছাত্রমিছিলের সামনের দিকে ছিলেন। গণতন্ত্রের কর্মী ফটোসাংবাদিকের গণতন্ত্রের জমানায় এ কেমন শাস্তিভোগ?

কাজলের মুখভর্তি দাড়ি, কাঁচার চেয়ে পাকা অংশ বেশি। ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়েছিলেন সাংবাদিকদের দিকে। চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ। কথা বলার চেষ্টা করলে পুলিশ নাকি বাধা দেয়। খবরে এসেছে, অপহরণকারীরা তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ব্যাপক নির্যাতন করেছে। তাকে তিন বেলা খেতে দিলেও সব সময় তার চোখ, হাত, পা, মুখ বেঁধে রাখত। খাওয়ার সময় শুধু হাত ও মুখের বাঁধন খুলে দিত।

কাজল ১০ মার্চ সন্ধ্যায় ‘পক্ষকাল’-এর অফিস থেকে বের হওয়ার পর তার কোনো সন্ধান না পেয়ে পরদিন ১১ মার্চ চকবাজার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন তার স্ত্রী জুলিয়া ফেরদৌসী। পরে ১৮ মার্চ রাতে কাজলকে অপহরণ করা হয়েছে অভিযোগ এনে চকবাজার থানায় মামলা করেন তার ছেলে মনোরম পলক। অনুপ্রবেশ মামলায় আদালত কাজলের জামিন আবেদন মঞ্জুর করে। কিন্তু কাজলের বিরুদ্ধে রাজধানীর তিনটি থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তিন মামলা রয়েছে। এর সঙ্গে পুলিশের পক্ষ থেকে ৫৪ ধারায় একটি মামলা দেওয়া হয়। আদালত ৫৪ ধারার মামলায় কাজলকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।

রাষ্ট্রদার্শনিক বা রাষ্ট্রচিন্তার জনক অ্যারিস্টটল বলেছেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সার্বভৌম ক্ষমতা সমগ্র জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকে।’ আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে ’৭২ সালের সংবিধানে শহীদের রক্তে লেখা সেই আদর্শের সংবিধান দিয়েছিলেন। পিতৃহত্যার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র খুনি অবৈধ শাসনকেই প্রশ্রয় দেয়নি জন্মের আদর্শকেও রক্ষা করতে পারেনি। সাম্প্রদায়িকতাকেও লালন করেছে। শোষণমুক্তি দিতে পারেনি। কাটাছেঁড়ার সংবিধানে জনগণ এখনো ক্ষমতার মালিক হলেও তার অধিকার নিশ্চিত করেনি। সংবিধান মানুষের চিন্তা, কথা বলা ও মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করলেও এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক আইন প্রণয়ন রুখতে পারেনি। তবু কাজল অপরাধী হলে আইনি খড়্গ নামুক। সাজা হোক। জেল খাটুক। নিখোঁজ কেন? আগেও যারা নিখোঁজ হয়েছেন ফিরে এসে কেউ বলেননি কোথায় ছিলেন। কেমন ছিলেন। কী হয়েছিল! অনেকে ফিরেও আসেননি। কেউ এপারে কেউ ওপারে নিখোঁজের দীর্ঘদিন পর অনুপ্রবেশকারী হন! কাজল বলেছেন, ৫৪ দিন মনে নেই। রাষ্ট্র এসব নিখোঁজ রহস্যের সমাধান দিতে পারে না! যেখানে মানুষ নিরাপদ নয়, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে তার মতপ্রকাশ করতে পারে না সে সমাজ বসবাস-উপযোগী নয়। রাষ্ট্র ঘুমিয়ে থাকতে পারে না। যে সেবক শপথ ভঙ্গ করে, যে কর্মচারী সংবিধান-আইন লঙ্ঘন করে, যারা দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করে, অবাধে ব্যাংক লুট করে, শেয়ারবাজার লুট করে, অবৈধ ঘুষ-দুর্নীতির অর্থবিত্ত গড়ে দম্ভের সঙ্গে সংবিধান-আইন লঙ্ঘন করে সমাজে বিচরণ করে, তারাই মাফিয়া। রাষ্ট্র মাফিয়াদের প্রশ্রয় দিতে পারে না। জনগণের জানমাল মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে। গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ নিশ্চিত করা দায়িত্ব।

করোনাযুদ্ধে প্রথম অকাল মৃত্যুবরণ করা হুমায়ুন কবিরের শোক কাটেনি। তার স্ত্রীও আইসিইউতে। রিজেন্টের মালিক শাহেদ অনেক করছেন। নরসিংদীতে ডিজিটাল আইনে তিন সাংবাদিক গ্রেফতার। মানে কী হচ্ছে? কুড়িগ্রামের ডিসি সুলতানা পারভীনও ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে সাংবাদিককে গভীর রাতে তুলে এনে নির্যাতন করে দেখালেন, কর্মচারীই মালিককে নির্যাতন করবে। শরীর জখম করবে। অপরাধে তাকে জেলে যেতে হয় না! প্রত্যাহার করে! কেন? আইনের ঊর্ধ্বে রাষ্ট্র তো কাউকে যেতে দিতে পারে না। দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছেন, ‘অনুমান বা ধারণা থেকেই সত্যের উৎপত্তি।’ তাহলে জনগণের মনে সব মিলিয়ে যে সত্য সেটাই ঠিক? জামালপুরের ডিসি নারী কেলেঙ্কারিতে চরিত্রহীন হয়ে বরখাস্ত! সাধারণ নাগরিক হলে অসামাজিক কার্যকলাপে গ্রেফতার? নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যায় লাশ পাওয়া গেলে জানা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভাড়া খাটা খুনি! আইনের খড়্গ নেমেছে। রাষ্ট্রের মাফিয়াদের প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই। সংবিধান ও আইনের ঊর্ধ্বে কাউকে যেতে দিতে পারে না। সব রহস্যের সমাধান দেওয়া জরুরি। মহাত্মা গান্ধী বলেছেন, ‘তুমি আমাকে শিকলে বেঁধে রাখতে পার, তুমি আমাকে কষ্ট দিতে পার, তুমি আমার এই শরীর নষ্ট করতে পার কিন্তু তুমি আমার মনকে কোনো দিনই বন্দী করে রাখতে পারবে না।’

করোনা অন্ধ পৃথিবীকে জানিয়েছে অন্ধ হলেও প্রলয় বন্ধ থাকে না। প্রকৃতির শাস্তি নেমে আসে। আমাদের রাষ্ট্র সংবিধান ও আইন কার্যকর করে দুর্নীতির লাগাম না টানলে, এভাবে অপরাধ অন্যায়কে প্রশ্রয় দিলে তারুণ্য বিপ্লবে নামবেই। জর্জ ওয়াশিংটন বলেছেন, ‘খারাপ মানুষের সঙ্গের চেয়ে একা থাকাও অনেক ভালো।’ দেশে নষ্ট সমাজে এখন অনেকেই একা হয়ে যাচ্ছেন। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।