‘আবার আসিব ফিরে এই বাংলায়’

১৭ মার্চ ২০২০


‘আবার আসিব ফিরে এই বাংলায়’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি নাম নয়, একটি ইতিহাস। আজ হতে শতবর্ষ পূর্বে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করে, মাতৃক্রোড়ে যে শিশু প্রথম চোখ মেলেছিল, পরবর্তীকালে সে শিশুর পরিচিতি দেশের গণ্ডিরেখা অতিক্রম করে পরিব্যাপ্ত হয়েছে বিশ্বব্যাপী। মা-বাবার আদরের ‘খোকা’, রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের সুপ্রিয় ‘মুজিব ভাই’, সমসাময়িকদের প্রিয় ‘শেখ সাহেব’ থেকে মুক্তিকামী বাঙালির ভালোবাসায় অভিষিক্ত হয়ে অর্জন করেন ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি এবং শেষত কায়েমি স্বার্থবাদীদের প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে হয়ে ওঠেন জাতির অবিসংবাদিত নেতা—জাতির পিতা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। যেজন্য সতেরোই মার্চ আমাদের জাতীয় জীবনে এক ঐতিহাসিক দিবস।

বঙ্গবন্ধু জীবনব্যাপী একটিই সাধনা করেছেন, বাঙালির মুক্তির জন্য নিজকে উত্সর্গ করা। ভাষাভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ধাপে ধাপে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ’৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৬৬-এর ছয় দফা তথা স্বাধিকার আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় অর্জন এবং পরিশেষে ’৭১-এ স্বাধীনতার ডাক দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ঐতিহাসিক এই পর্বগুলো সংঘটনে তাকে জীবনের প্রায় তেরোটি বছর কারান্তরালে কাটাতে হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার মুক্তিকামী মানুষের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার একটি উক্তি এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, ‘এটা বলা হয়ে থাকে যে, সত্যিকার অর্থে কেউ একটি জাতিকে জানতে পারে না, যতক্ষণ না কেউ একজন এর কারাগারে বন্দি থাকে।’ ২০১২-তে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য সরকারি সফরে দক্ষিণ আফ্রিকা যাই এবং রোবেন আইল্যান্ডে নেলসন ম্যান্ডেলার কারাকক্ষ পরিদর্শন করি। সেখানেই বন্দিশালাতে নেলসন ম্যান্ডেলা তার দীর্ঘ সাতাশ বছর কারাজীবনের আঠারো বছর বন্দি ছিলেন। স্বচক্ষে দেখেছি বন্দিশালার নির্জন সেলটি। ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থটি পড়ে জেনেছি কারারুদ্ধ অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর সম্বল ছিল একটি থালা, বাটি, গ্লাস আর কম্বল। প্রকৃতপক্ষে ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থটির শিরোনাম তিনি দিয়েছিলেন ‘জেলখানার সম্বল থালা বাটি কম্বল’। এখানে গিয়েই বারবার আমাদের কেন্দ্রীয় কারাগার এবং পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগারের কথা ভেবেছি—যে কারাগারে দীর্ঘকাল বঙ্গবন্ধু বন্দিজীবন অতিবাহিত করেছেন। বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী হিসেবে ইসলামিক সম্মেলনে লাহোরে গিয়ে মিয়ানওয়ালি কারাগারের জেল সুপার হাবিব আলির কাছ থেকে বর্ণনা শুনেছি। জেলের সামনে কবর খুঁড়ে তাকে প্রধানমন্ত্রী অথবা কবর বেছে নেওয়ার কথা বলেছিল। বঙ্গবন্ধু কবরকেই বেছে নিয়ে বলেছিলেন, ‘যে বাংলার আলো-বাতাসে আমি বর্ধিত হয়েছি, মৃত্যুর পর এই কবরে না, আমার লাশ প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়ো।’ জাতির পিতা সাড়ে নয় মাস পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগারের নির্জন সেলে বন্দি ছিলেন। মিয়ানওয়ালি কারাগার ভিনদেশে হওয়ায় আমরা তা সংরক্ষণ করতে পারিনি। তবে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের যে কক্ষে তিনি বন্দি ছিলেন সেসব সংরক্ষণ করা হয়েছে। আর আগরতলা মামলায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের যেখানে তিনি বন্দি ছিলেন সেটিও জাদুঘর করা হয়েছে। মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে আত্মোত্সর্গকারী নেতৃত্বের রয়েছে ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত আদর্শিক মিল। যেমন, ’৭১-এর চৌঠা মার্চ বাঙালির সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে জাতির জনক বলেছিলেন, ‘চরম ত্যাগ স্বীকার করা ছাড়া কোনোদিন কোনো জাতির মুক্তি আসে নাই।’ তদ্রুপ দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, ‘Real leaders must be ready to sacrifice all for the freedom of their people.’’ বঙ্গবন্ধু সব সময় বলতেন, ‘মানুষকে ভালোবাসলে মানুষও ভালোবাসে। যদি সামান্য ত্যাগ স্বীকার করেন, তবে জনসাধারণ আপনার জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত।’ ‘আমার সবচেয়ে বড়ো শক্তি আমার দেশের মানুষকে ভালোবাসি, সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা আমি তাদেরকে খুব বেশি ভালোবাসি।’

বঙ্গবন্ধু সব সময় ছোটোকে বড়ো করে তুলতেন। যেসব জায়গায় সফর করতেন, বক্তৃতায় সেখানকার নেতাকর্মীদের বড়ো করে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতেন। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতাকে থানার, থানা আওয়ামী লীগের নেতাকে জেলার এবং জেলা আওয়ামী লীগের নেতাকে জাতীয় নেতায় রূপান্তরিত করে তিনি জাতির পিতা হয়েছেন। ফলত, সারা বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজও বঙ্গবন্ধুর চেতনা ধারণ করে টিকে আছে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিশাল হূদয়ের মহান নেতা। সবাইকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। মুহূর্তেই পরকে আপন করে নিতেন। কারো দুঃখ সহ্য করতে পারতেন না। যারা বিরোধী ছিলেন তাদেরকেও কাছে টেনে নিতেন। যখন বলতেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না’, মানুষ তাই বিশ্বাস করত। ক্ষমতার জন্য, ক্ষমতায় থাকার জন্য, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য তিনি রাজনীতি করেননি। প্রিয় মাতৃভূমিকে পাকিস্তানের শোষণ-বঞ্চনার হাত থেকে রক্ষা করে বাঙালিরা যাতে বাংলাদেশের ভাগ্যনিয়ন্তা হতে পারে সেজন্য নিজের জীবন উত্সর্গ করতেই তিনি রাজনীতি করেছেন। ’৬৭-এর সতেরোই মার্চ নিজের জন্মদিনে কারাগারের রোজনামচায় লিখেছেন, “আজ আমার ৪৭তম জন্মবার্ষিকী। এই দিনে ১৯২০ সালে পূর্ব বাংলার এক ছোট্ট পল্লীতে জন্মগ্রহণ করি। আমার জন্মবার্ষিকী আমি কোনোদিন নিজে পালন করি নাই—বেশি হলে আমার স্ত্রী এই দিনটাতে আমাকে ছোট্ট একটি উপহার দিয়ে থাকত। এই দিনটিতে আমি চেষ্টা করতাম বাড়িতে থাকতে। খবরের কাগজে দেখলাম ঢাকা সিটি আওয়ামী লীগ আমার জন্মবার্ষিকী পালন করছে। বোধ হয়, আমি জেলে বন্দি আছি বলেই। ‘আমি একজন মানুষ, আর আমার আবার জন্মদিবস’।” পৃষ্ঠা-২০৯। এই উক্তিটির সূত্রে মনে পড়ছে, ’৭১-এর রক্তঝরা মার্চের সতেরো তারিখের কথা। সেদিন ছিল বঙ্গবন্ধুর ৫২তম জন্মদিন। দেশ জুড়ে অসহযোগ আন্দোলন চলছে। ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা শেষে তখনকার প্রেসিডেন্ট ভবন অর্থাত্ পুরাতন গণভবন সুগন্ধা থেকে দুপুরে যখন তিনি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবনে ফিরে এলেন তখন বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘরোয়া আলোচনাকালে একজন সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেন, ‘৫২তম জন্মদিনে আপনার সবচাইতে বড়ো ও পবিত্র কামনা কী?’ উত্তরে স্বভাবসুলভ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘জনগণের সার্বিক মুক্তি।’ এরপর সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জ্ঞাপনকালে বেদনার্ত স্বরে বলেছিলেন, ‘আমি জন্মদিন পালন করি না, আমার জন্মদিনে মোমের বাতি জ্বালি না, কেকও কাটি না। এদেশে মানুষের নিরাপত্তা নাই। আপনারা আমাদের জনগণের অবস্থা জানেন। অন্যের খেয়ালে যে কোনো মুহূর্তে তাদের মৃত্যু হতে পারে। আমি জনগণেরই একজন, আমার জন্মদিনই কি, আর মৃত্যুদিনই কি? আমার জনগণের জন্য আমার জীবন ও মৃত্যু। আমি তো আমার জীবন জনগণের জন্য উত্সর্গ করেছি।’ জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতে আসা জনসাধারণকে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা থেকে আবৃত্তি করে বলতেন, ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক।’ বিশাল হূদয়ের মহত্ মনের সহজ মানুষ ছিলেন তিনি। নিজের সবকিছুই জনগণের জন্য উত্সর্গ করেছিলেন। অতি সাধারণ জীবন ছিল তার। রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়েও সরকারি বাসভবনে থাকতেন না। নিরাভরণ, ছিমছাম ৩২ নম্বরের বাড়িটিতেই আমৃত্যু থেকেছেন।

স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে ’৭২-এর দশই জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে সর্বকালের সর্ববৃহত্ ঐতিহাসিক গণমহাসমুদ্রে হূদয়ের সবটুকু অর্ঘ্য ঢেলে আবেগমথিত ভাষায় বলেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাবার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।’ স্থিরপ্রতিজ্ঞ থেকে বলেন, ‘ভাইয়েরা, তোমাদেরকে একদিন বলেছিলাম, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। আজকে আমি বলি, আজকে আমাদের উন্নয়নের জন্য আমাদের ঘরে ঘরে কাজ করে যেতে হবে।’ বক্তৃতায় আরো বলেন, ‘আমি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে চাই যে, বাংলাদেশ একটি আদর্শ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হবে। আর তার ভিত্তি বিশেষ কোনো ধর্মীয় ভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে—গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র।’ বঙ্গবন্ধু জীবনের প্রতিটি ধাপেই বাঙালির সার্বিক মুক্তির জয়গান গেয়েছেন। যে বাংলার স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, যে বাংলার জন্য যৌবনের অধিকাংশ সময় কারাগারে কাটিয়েছেন, ফাঁসির মঞ্চে গেয়েছেন বাঙালির জয়গান, সেই বাংলা ও বাঙালির জন্য তার ভালোবাসা ছিল অপরিসীম। সমুদ্র বা মহাসমুদ্রের গভীরতা পরিমাপ করা সম্ভব; কিন্তু বাংলা ও বাঙালির জন্য বঙ্গবন্ধুর হূদয়ের যে দরদ, যে ভালোবাসা তার গভীরতা অপরিমেয়।

আজ বিশেষভাবে একাত্তরের পঁচিশে মার্চের থমথমে দিনটির কথা মনে পড়ছে। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে বিদায় নেওয়ার সময় সকলেই বঙ্গবন্ধুকে বলেছেন, ‘আজ তো মনে হয় তারা অবশ্যই আপনাকে গ্রেপ্তার করবে।’ দৃঢ়প্রত্যয়ী বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘করুক না। তাতে কী? ওরা আমাকে আগেও গ্রেপ্তার করেছে এবং তাতে ওদের কোনো লাভ হয় নাই। ওরা ফের আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে। কিন্তু এ থেকে ওরা কী সুবিধা পাবে আমি জানি না। ওরা যদি আমাকে মেরেও ফেলে তাতেও ওদের কোনো লাভ হবে না। আমার মৃত্যুর বদলা নিতে বাংলার মাটিতে হাজারো শেখ মুজিবের জন্ম হবে। ওদের দিন শেষ, এটা ওরাও জানে। দীর্ঘদিনের সংগ্রামের পর আজ এই সত্যই আমার হূদয়টাকে অনাবিল আনন্দে ভরে দিচ্ছে। সর্বত্র উড়ছে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা, একটি সফল অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সমগ্র জাতি আজ ঐক্যবদ্ধ। ইতিহাসে এই প্রথম বাঙালিরা নিজেদের ভাগ্যনিয়ন্তা হয়ে সবকিছু নিজেরা নিয়ন্ত্রণ করছে। ওরা যদি আমাকে মেরে ফেলে এবং তোমরা যদি আমার লাশ দেখার সুযোগ পাও তখন দেখবে, আমি কেমন সুখে হাসছি।’ গণহত্যা শুরুর প্রাক্কালে সাংবাদিক সাক্ষাত্কারে রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতা থেকে বিষাদাচ্ছন্ন স্বরে বলেছিলেন, ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে এই বাংলায়...।’

লেখক :আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।