চলে গেলেন মিস শেফালি

৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০


চলে গেলেন মিস শেফালি

প্রথম বাঙালি ক্যাবারে নর্তকী মিস শেফালি প্রয়াত হলেন ৭৭ বছর বয়সে৷ তাঁর সঙ্গেই শেষ হল কলকাতার এক অভিনব এবং অনন্য সাংস্কৃতিক অধ্যায়ের৷ পরিচালক সত্যজিৎ রায় যখন তাঁর ‘‌সীমাবদ্ধ’ ছবিতে, সত্তরের দশকের নকশাল আন্দোলনের আগুনে সময়ের চূড়ান্ত বৈপরিত্যে ক্লাব কালচার, ঘোড়দৌড় আর নৈশ বিনোদনের সংস্কৃতিতে আকণ্ঠ মজে থাকা অভিজাত, বিত্তবান এক অন্য বাঙালি সমাজকে ধরতে চেয়েছিলেন, একজনকেই বিশেষভাবে বেছে নিয়েছিলেন৷ মিস শেফালি এবং তাঁর ক্যাবারে নাচ৷ কলকাতা শহরের এক ক্ষয়িষ্ণু ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির প্রতিনিধি হিসেবে যার কোনও বিকল্প ছিল না৷ এতটাই ‘‌আইকনিক’ ছিলেন মিস শেফালি৷

সাবেক পূর্ববঙ্গের নারায়ণগঞ্জ থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে পশ্চিমে চলে আসা, হতদরিদ্র শরণার্থী পরিবারের মেয়ে আরতি দাশ–এর মিস শেফালি হয়ে ওঠার পুরো যাত্রাটাই যেন কোনও রূপকথার মতোই রোমাঞ্চকর৷ সংসারের অভাব ঘোচাতে কিশোরী আরতি গৃহ পরিচারিকার কাজ নিয়েছিল কলকাতার চাঁদনি চকের এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পরিবারে৷ সেই বাড়িতে পার্টি-পরব লেগেই থাকত৷ বিদেশি গান, নাচের আসর বসতো প্রায়ই৷ দরজার বাইরে, পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে সেই নাচ-গান দেখত আরতি, আর নিজের অজান্তেই তার হাত-পা নেচে উঠত৷ কারণ নাচ ছিল তার রক্তে৷

পার্ক স্ট্রিট এলাকার অভিজাত রেস্তোরাঁ মোক্যাম্বোতে ইংরিজি পপ গান গাইত ভিভিয়ান হ্যানসন৷ ওই বাড়িতে যাতায়াত ছিল তার৷ একদিন আরতির নাচ চোখে পড়ে গেল ভিভিয়ানের৷ সে প্রস্তাব দিল, তুমি হোটেলে নাচবে?‌ অনেক টাকা রোজগার করতে পারবে৷

ভিভিয়ানের হাত ধরেই একদিন কলকাতার অন্যতম অভিজাত রেস্তোরাঁ ফিরপোজে গেল আরতি৷ ফিরপোজে তখন যাঁরা নৈশ বিনোদনের দায়িত্বে, তাঁদের জহুরির চোখ চিনে নিতে ভুল করেনি আরতির সহজাত প্রতিভা৷ চাকরি হল, শুরু হল নাচের তালিম এবং বিলিতি আদবকায়দা রপ্ত করানোর পালা৷ আরতির নতুন নামকরণ হল ‘‌শেফালি'৷ যে ফুল রাতে ফোটে৷ বাকিটা ইতিহাস৷ প্রথমে কিছু বছর ফিরপোজ এবং দেশের আরও কিছু অভিজাত নিশিবাসরে৷ শেফালির সৌরভ ছড়াল সর্বত্র৷ একদিন দেশের সেরা হোটেল ওবেরয় গ্র্যান্ড আদর করে ডেকে নিল তাঁকে৷ মিস শেফালি ক্রমশ হয়ে উঠলেন কলকাতার রাতের রানি৷ শহরের অভিজাত সমাজের নৈশ বিনোদনের কেন্দ্রীয় আকর্ষণ৷

এমনই জনপ্রিয় হয়েছিলেন মিস শেফালি, যে একদিন তাঁর ডাক এলো বাংলা পেশাদার রঙ্গমঞ্চ থেকে৷ প্রথম নাটক ‘‌চৌরঙ্গি’৷ এক হাজার রাতেরও বেশি অভিনীত হয়েছিল সেই নাটক৷ বাংলা বাণিজ্যিক থিয়েটারের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল মঞ্চে ক্যাবারেতে নাট্য সংযোজনের সেই ঘটনা৷ কিন্তু কিছু বছরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার, যারা মনে করত ক্যাবারে নাচ অশ্লীল, অপসংস্কৃতি৷ ফলে বিরোধিতা শুরু হল নানাভাবে৷ পাশাপাশি হোটেল, রেস্তোরাঁয় নাচের সুযোগ কমতে শুরু করল নানাবিধ সরকারি বিধিনিষেধের কারণে৷ যে অবিশ্বাস্য উচ্চতায় উঠেছিলেন মিস শেফালি, ক্রমশ সেখান থেকে পতন শুরু হল৷ কিন্তু মিস শেফালি হয়ে রইলেন সেই বহুশ্রুত উপমার মতো, যাঁকে ভালবাসা যায় অথবা ঘৃণা করা যায়, কিন্তু কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না৷

সঞ্চয়ী ছিলেন না কোনওদিনই, বরং লোকের বিপদে আপদে সাহায্য করতেন উদার হাতে৷ ফলে একসময় বহু টাকা রোজগার করলেও মিস শেফালিকে শেষ জীবন কাটাতে হয়েছে অর্থকষ্টে, শারীরিক অসুস্থতায়৷ মারা যাওয়ার পর এখন সবাই একবাক্যে বলছেন, একটা যুগের অবসান হল৷ শেষ হল এক ছিন্নমূল মেয়ের একক লড়াইয়েরও৷