বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার দ্বিতীয় সাক্ষাতের গল্পটা

১৫ জানুয়ারী ২০২০


বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার দ্বিতীয় সাক্ষাতের গল্পটা

১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গণভবনে কচি-কাঁচার মেলার ভাইবোনদের মার্চপাস্টের স্যালুট নিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর বাঁ পাশে কবি সুফিয়া কামাল এবং রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের মাঝখানে বালক লুৎফর রহমান রিটন।

পেছন ফিরে দেখা >

১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কচি-কাঁচার মেলার জাতীয় শিক্ষা শিবির বা ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়েছিলো গুলিস্তানের পাশে, বঙ্গভবনের উল্টোদিকে, শহিদ মতিউর শিশুপার্কে। সারাদেশ থেকে কচি-কাঁচার মেলার বিভিন্ন শাখার প্রায় হাজার খানেক কিশোর-কিশোরী সেই ক্যাম্পে অংশ নিয়েছিলো। আমিও অংশ নিয়েছিলাম সেই ক্যাম্পে কেন্দ্রীয় সদস্য হিশেবে। মতিউর শিশুপার্কে আমরা থাকতাম তাঁবু খাটিয়ে। এই শিবির বা ক্যাম্পে কঠোর অনুশাসনে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলতো আমাদের নানা রকম কর্মকাণ্ড। শরীরচর্চা, প্যারেড-পিটি, ব্রতচারী, বাঁশনৃত্য, লাঠিখেলা, উপস্থিত বক্তৃতা, গান, আবৃত্তি কতো কিছু! এই ক্যাম্পে ব্রতচারী শিক্ষক হিশেবে কুষ্টিয়ার বিখ্যাত ‘ওস্তাদ ভাই’কে পেয়েছিলাম আমরা। বয়েসে প্রবীন কিন্তু শারিরীকভাবে শক্তিমান নবীন ছিলেন তিনি। ধনুকের ছিলার মতো টানটান শরীরের ওস্তাদ ভাই শেখাতেন লাঠি খেলা। ডানে-বাঁয়ে-সামনে-পেছনে বিদ্যুৎ গতিতে লাঠি চালিয়ে শত্রুকে কুপপকাৎ করার কৌশল শিখেছিলাম তাঁর কাছ থেকে। কী বিস্ময়কর দ্রুততায়ই না লাঠি চালাতেন সেই বৃদ্ধ! একাই লড়তেন চার চারজন লাঠিধারীর সঙ্গে! ওস্তাদ ভাইয়ের কাছেই শিখেছিলাম ব্রতচারী নৃত্য এবং সেই ‘নৃত্যের সঙ্গে গীত’ অনবদ্য কিছু গান—ইয়া জসোবা-ইয়া জসোবা গুরুজী ইয়া জসোবা/অবাক করে গুরুজী তব মানব সেবা/রায়বেশে কাঠি সারি ঢালি ঝুমুর ঝারি/তাই গেয়ে প্রণাম জানাই যতো ব্রতচারী/...(‘ইয়া’ একটি রিদমসমৃদ্ধ ধ্বনি, এবং জসোবা হচ্ছে ‘জয় সোনার বাংলা’র সংক্ষিপ্ত রূপ।)। শিখেছিলাম—মায়ের জাতের মুক্তি দে রে/যাত্রাপথের বিজয় রথে চক্র তোদের ঠেলবে কে রে?/মায়ের জাতের মুক্ত প্রভাব/গড়বে তোদের বীরের স্বভাব/বিশ্ব সভার উচ্চাসনে চড়বে না কেউ তোদের ছেড়ে/...।

ক্যাম্পে, আমাদের প্রত্যেকের বুকে একটা ব্যাজ ও সংখ্যা লেখা একটা স্টিকার সাঁটানো থাকতো। আমার সংখ্যাটি ছিলো সম্ভবত ৩৮০। এই সংখ্যাটির মাধ্যমেই আমাদের আইডেন্টিফাই করা হতো। আমাদের সারাদিনের কর্মকাণ্ড আচরণ ইত্যাদি গোপনে লক্ষ্য রাখতেন সিনিয়ররা অর্থাৎ সাথীভাইরা। সাথীভাইরা আমাদের কীভাবে খেয়াল রাখতেন সেটা আমরা টেরও পেতাম না। প্রতিদিন আমাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড আচরণ ও সাফল্য ব্যার্থতা অনুযায়ী তাঁরা নম্বর দিতেন(তাঁদের নোট বইয়ে টুকে রাখতেন।)। সেই নম্বরগুলো যোগ করে মেলার সমাপ্তিতে তিনটি ক্যাটগরিতে আমাদের কয়েকজনকে খেতাবে ভূষিত করে পুরস্কৃত করা হয়েছিলো। সেই ক্যাম্পের সর্বোচ্চ খেতাব ‘দলমণি’ অর্জন করেছিলাম আমি। দাদাভাই বলেছিলেন, ক্যাম্পের সমাপ্তীপূর্ব কোনো একদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আসেবেন আমাদের ক্যাম্প পরিদর্শনে অথবা দাদাভাই আমাদের নিয়ে যাবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের কাছে। অধীর আগ্রহে আমরা অপেক্ষা করেছি—কবে আসবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ! কখন দেখবো তাঁকে সামনাসামনি!

তো, আমাদের ক্যাম্পের তাঁবুবাসের শেষদিকে, এক মনোরম বিকেলে অনেকগুলো বাস বোঝাই হয়ে আমরা গিয়েছিলাম গণভবনে, বঙ্গবন্ধুর কাছে। ১৯৭২-এর পর সেটা ছিলো আমার ছুঁয়ে দেয়া দূরত্ব থেকে দ্বিতীয় বঙ্গবন্ধু দর্শন।

সেদিনের সেই বিকেলটা খুবই মনোরম ছিলো। উজ্জ্বল সোনালি রোদের আভায় ভীষণ চকচকে ছিলো। আমাদের পেয়ে কী রকম উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু! সহসা বঙ্গবন্ধু দাদাভাইকে বললেন, আসেন দাদাভাই আপনার সঙ্গে একটু ব্রতচারী হয়ে যাক। তারপর ঝাউর গিজার গিজঘিনিতা/ঝাউর গিজার গিজঘিনিতা/এক ধামা চাল একটা পটল/এক ধামা চাল একটা পটল--বলতে বলতে বঙ্গবন্ধু নির্দিষ্ট একটা রিদমে ব্রতচারীর একটা মুদ্রা এমন চমৎকার নিখুঁত দেহভঙ্গিতে আমাদের দেখালেন যে হাততালিতে মুখর হয়ে উঠলাম আমরা। সে এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য! বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ব্রতচারী নৃত্যে অংশ নিয়েছিলেন দাদাভাইও। দাদাভাই আর বঙ্গবন্ধুর যৌথ ব্রতচারী নৃত্যের অবিস্মরণীয় সেই দৃশ্যটি নিশ্চয়ই ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন কোনো আলোকচিত্রি। যদিও সেই আলোকচিত্র আমার দেখা হয়নি।


সেই বিকেলে আমাদের নিজস্ব কিছু আনুষ্ঠানিকতাও ছিলো। আমার নেতৃত্বে মার্চপাস্ট হলো। মার্চপাস্টে ছেলেমেয়েদের স্যালুট গ্রহণ করলেন বঙ্গবন্ধু। মার্চপাস্টের শুরুতে ছোট্ট এইটুকুন আমি বিশাল দেহের বঙ্গবন্ধুর মাথায় পরিয়ে দিলাম কচি-কাঁচার মেলার ক্যাপ। খুব নিচু হয়ে মাথাটা আমার নাগালের কাছে নামিয়ে এনে বিরাট-বিশাল বঙ্গবন্ধু গ্রহণ করলেন আমার মতো একজন খুদে বন্ধুর স্মারক উপহার। বঙ্গবন্ধুর মাথা এবং মাথার চুল স্পর্শ করতে হলো আমাকে, ক্যাপটা তাঁকে পরাতে গিয়ে। তাঁর শক্ত এবং ঘন কালো চুলগুলো ভীষণ ঠান্ডা ছিলো। আমাদের কাছে আসবার আগ পর্যন্ত সারাটাদিন একটানা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে ছিলেন বলেই কি তাঁর সতেজ ঘন চুলগুলো এতো শীতল লাগছিলো আমার কাছে! কী জানি! ক্যাপটা পরানোর পর বঙ্গবন্ধু আমার গালে আলতো করে আঙুল ছুঁয়ে একটু আদর করে দিয়েছিলেন, মৃদু হেসে।

(সেটা ছিলো বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে আমার দ্বিতীয় আদর প্রাপ্তি। এর আগে ১৯৭২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পেয়েছিলাম জাতির জনকের ভালোবাসার প্রথম স্পর্শটি। আমরা একদল শিশুশিল্পী আমাদের আঁকা মুক্তিযুদ্ধের ছবিগুলো বঙ্গবন্ধুকে দেখাতে তাঁর কার্যালয়ে গিয়েছিলাম দাদাভাইয়ের সঙ্গে।)

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার দ্বিতীয় সাক্ষাতের ঘটনাটা বাংলাদেশ টেলিভিশনের খবর ছাড়াও সিনেমা হলগুলোতে দেখানো হয়েছিলো। সে আরেক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা ছিলো আমার জীবনে।

তখন, বাংলাদেশের সিনেমাহলগুলোতে সিনেমা শুরু হবার আগে ‘চিত্রে বাংলাদেশের খবর’ নামে একটা সেগম্যান্ট প্রচারিত হতো। বঙ্গবন্ধুর মাথায় আমি কচি-কাঁচার মেলার ক্যাপ পরিয়ে দিচ্ছি, তিনি নিচু হয়ে ঝুঁকে আমাকে সহায়তা করছেন, এই দৃশ্যটি ‘চিত্রে বাংলাদেশের খবরে’ বহুদিন দেখানো হয়েছিলো। গমগমে ভরাট হিরন্ময় কণ্ঠে এই খবর পাঠ করেছিলেন বিখ্যাত সংবাদ পাঠক সরকার কবির উদ্দিন। মধুমিতা সিনেমা হলের বিরাট পর্দায় সেই দৃশ্য আমাকে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন অগ্রজ এটিএম মিজানুর রহমান। আহা কী মধুর সেই দৃশ্য! কয়েক সেকেন্ডের সেই দৃশ্যটা দেখার জন্যে সিনেমার দু'টি টিকিট কিনতে হয়েছিলো আমার অগ্রজকে। বাড়তি পাওনা হিশেবে সেদিন কোন সিনেমাটা দেখেছিলাম সেটা আজ মনে নেই। তবে সিনেমার বড় পর্দায় শাদাকালো ঝকঝকে চলমান ছবিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে নিজেকে অবলোকনের সেই স্মৃতিটা আমার মস্তিষ্কে মুদ্রিত হয়ে থাকলো স্থায়ীভাবে।

[ঈষৎ সংক্ষেপিত]

সূত্র: ফেসবুক স্ট্যাটাস