অস্ট্রেলিয়ার মরু অঞ্চলে উটের পপুলেশন নিয়ন্ত্রণ

৯ জানুয়ারী ২০২০


অস্ট্রেলিয়ার মরু অঞ্চলে উটের পপুলেশন নিয়ন্ত্রণ

অস্ট্রেলিয়ার মরু অঞ্চলে উটের পপুলেশন নিয়ন্ত্রণ

রফিক হক (অস্ট্রেলিয়ান পরিবেশবিদ)

অস্ট্রেলিয়ার মরু অঞ্চলে উট এর পপুলেশন নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টি নতুন নয়, তবে এই খবরটি মাঝে মাঝে অসম্পূর্ণ এবং বিকৃত ভাবে বাংলাদেশের কিছু সংবাদ মাধ্যমে উপস্থাপন হতে দেখেছি। অস্ট্রেলিয়ায় ইকোলজিক্যাল রেস্টরেশন (Ecological Restoration) কাজের সাথে কয়েক দশক ধরে আমি জড়িত, সুতরাং মাঝে মাঝেই এই প্রসঙ্গে অনেকের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। আমার মনে হয় এই প্রসঙ্গে সঠিক ব্যাখ্যা সকলের জানা দরকার। এতে করে সবাই সঠিক তথ্যে সচেতন হবেন এবং অন্যদেরকেও বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে পারবেন।

আমরা জানি প্রকৃতিতে অসংখ্য ইকোসিস্টেম (Ecosystem) এবং প্রতিটি ইকোসিস্টেম অসংখ্য প্রাকৃতিক-সাইকেল বা প্রাকৃতিক-চক্র (Ecological cycles) দ্বারা ভারসাম্য রক্ষা করে। যেমন অক্সিজেন সাইকেল, ফুড সাইকেল, ওয়াটার সাইকেল, ইত্যাদি, ইত্যাদি। একটা ইকোসিস্টেম-এ অন্য ইকোসিস্টেম এর প্রাণী বা উদ্ভিদ প্রবেশ করে যখন দ্রুত বংশ বিস্তার শুরু করে, তখন সেই ইকোসিস্টেম এর প্রাকৃতিক-চক্র সমূহের উপর নেতিবাচক প্রভাব পরে। ফলে ইকোসিস্টেম এর ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং সেই ইকোসিস্টেম এর আদিবাসী প্রাণী বা উদ্ভিদের সাথে বহিরাগত প্রাণী বা উদ্ভিদের অহেতুক কম্পিটিশন শুরু হয়। যদি বহিরাগত প্রাণী বা উদ্ভিদ বেশী শক্তিশালী হয় তখন ওই ইকোসিস্টেম এর আদিবাসী প্রাণী বা উদ্ভিদ দিনে দিনে কমে যেতে থাকে এবং এক পর্যায়ে বিলীন হয়ে যাবার সম্ভাবনা দেখা দেয়। সাথে সাথে ইকোসিস্টেম-টি তার নিজের স্বকীয়তা হারায়, এক কথায় সেই ইকোসিস্টেম-টি নিজেই বিলীন হয়ে যায়।

মনে করুন, আমাদের সুন্দরবন ইকোসিস্টেম-এ টুরিস্ট-আকর্ষণ বাড়াতে বেশ কিছু ইউক্যালিপটাস গাছ লাগানো হোল এবং কিছু বুনো ঘোড়া আর কিছু সিংহ ছেড়ে দেওয়া হলো। কিছুদিন পরে দেখা যাবে সুন্দরবনে সুন্দরী গাছ দিনে দিনে কমে যাচ্ছে আর তার জায়গায় ইউক্যালিপটাস গাছ জায়গা করে নিচ্ছে। অন্যদিকে দেখা যাবে, সিংহ-দের অত্যাচারে বাঘ-মামারা চাট্টি-বাট্টি গুটিয়ে দেশান্তরী হয়ে যাচ্ছে, সাথে সাথে বুনো-ঘোড়ার দল তৃণ-ভূমির সব ঘাস খেয়ে ফেলায় গোবেচারা হরিণ সম্প্রদায় ক্ষুধার জ্বালায় গ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষের ফসলের ক্ষেতে দুবেলা দুমুঠো অন্নের সংস্থান করে বেড়াচ্ছে। তাদের সাথে আমাদের কৃষক-ভাইরা তখন কি ধরনের ব্যাবহার করবে, সেকথা বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন হয় না। আরও কিছুদিন পর দেখা যাবে স্কুলের ছেলে মেয়েরা তাদের পাঠ্য পুস্তকে পড়ছে- সুন্দরবনে প্রচুর ইউক্যালিপটাস গাছ জন্মে, সেখানে বন্য প্রাণী সিংহ আর বুনো ঘোড়া বসবাস করে। তবে ইতিহাস থেকে জানা যায় এই বনে এক সময় 'সুন্দরী' নামে এক ধরনের গাছ জন্মাতো এবং সেখানে বাঘ এবং হরিণ নামে কিছু বন্য প্রাণী বাস করতো। তারপরে হয়তো বাংলাদেশের যাদুঘরে রয়েল বেঙ্গল টাইগার এবং হরিণের স্টাফ-করা মরদেহ দেখf যাবে। যেমন অস্ট্রেলিয়ার যাদুঘরে চিরতরে বিলীন হয়ে যাওয়া 'তাসমানিয়ান টাইগারের' মরদেহে দেখ যায়।

ইকোলজিক্যাল ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনে কোন বন্যপ্রাণী নিধন করাকে টেকনিক্যাল ভাষায় কালিং (Culling) করা বলা হয়। উট কালিং করা প্রসঙ্গে আলাপ করার আগে অস্ট্রেলিয়ার কয়েকটি বিষয় সকলকে জানাতে চাই। অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে কোন আগ্নেয়গিরি নাই, এই মহাদেশ এমনকি কোন ট্যাকটনিক প্লেটের মাথায়ও অবস্থিত নয়। এই কারনে এই দেশের মাটিতে কোন পরিবর্তন নাই, মাটি অতি প্রাচীন এবং অনুর্বর। মাটিতে ফসফেট বলতে গেলে নাই। সুতরাং এই মাটিতে গাছপালা বেচে থাকতে বিভিন্ন প্রাকৃতিক কৌশল অবলম্বন করে এবং সেই গাছপালার উপর নির্ভর করে যে সব পশুপাখি বেঁচে থাকে তাদের খাদ্য সীমিত এবং সহজলভ্য নয়। এভাবেই এখানকার গাছপালা এবং পশুপাখি তাদের জীবনধারণ করতে অভ্যস্ত। প্রকৃতির এই কঠিন বাস্তবতার কারনে এখানে জীববৈচিত্র আমাদের ধারনার বাইরে সুন্দর এবং বিচিত্র। অস্ট্রেলিয়া আসলে মেগা-ডাইভারস দেশ গুলির অন্যতম। পৃথিবীর মাত্র ১০% এলাকা জুড়ে এই মেগা-ডাইভারস দেশগুলি, কিন্তু সৃষ্টিকর্তার অপূর্ব সৃষ্টি জীববৈচিত্র বা Biodiversity এর ৭০% এই দেশগুলিতে দেখা যায়। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিয়ে বোঝাই, ধরুন কাঁটাওয়ালা বাবলা গাছ সবাই চেনেন- লাঙ্গল বা দা-কুড়ালের হাতল বানাতে বাবলা কাঠের সমকক্ষ শক্ত কোন কাঠ বলতে গেলে নাই। এই গাছের বোটানিক নাম Acacia nilotica, অস্ট্রেলিয়ার চলতি ভাষায় এই Acacia গোত্রের গাছকে ওয়াটেল বলে, ওয়াটেল পাতার ঘন-সবুজ রং আর ফুলের সোনালী-হলুদ রং Green and Gold অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় রং, বুঝতেই পারছেন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বা ফুটবল টিমের জার্সির রং কেন সবুজ আর সোনালী। যাহোক, পুরো এশিয়া মহাদেশে ৮৯টি প্রজাতির ওয়াটেল গাছ দেখা যায়, এদিকে অস্ট্রেলিয়াতে ১২০০ এর উপরে ওয়াটেল গাছের প্রজাতি আছে। এখানে ইউক্যালিপটাস প্রজাতির সংখ্যা ৮০০ এর উপর । শুধু উদ্ভিদ নয়, পশু-পাখীর বৈচিত্র্যও অস্ট্রেলিয়ায় অনন্য, অসাধারণ। লেজে ভর দিয়ে আর পিছনের দুপায়ে লাফিয়ে বেড়ানো অদ্ভুত প্রাণী ক্যাঙ্গারুর কথাই ভেবে দেখুন।

অস্ট্রেলিয়ার বাইরে থেকে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন কারনে, বিভিন্ন গাছপালা এবং পশুপাখি নিয়ে আসা হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার প্রকৃতিতে এই সব গাছপালা এবং পশুপাখির কোন-কোনটার নেতিবাচক প্রভাব এবং তার ফলাফল ভয়াবহ। যেমন বাগানের হেজ করতে ল্যান্টানা, ফল দিয়ে জ্যাম-জেলি বানানোর জন্য ব্লাকবেরী নিয়ে আসা হয়েছিল। আজ বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ল্যান্টানা আর ব্লাকবেরীর জঙ্গল দেখা যায়, সে সব এলাকায় কোনকিছুই জন্মাতে পারে না। চাষ যোগ্য জমি, বনাঞ্চল এবং প্রকৃতির উপরে এই সব গাছের নেতিবাচক ফলাফল প্রকট, অর্থনৈতিক ক্ষয়-ক্ষতির পরিমান লক্ষ লক্ষ ডলার। এক-ই ভাবে অস্ট্রেলিয়ার মরু অঞ্চলে মালামাল বহনের জন্য ১৮৪০ সালে ভারত এবং আফগানিস্তান থেকে উট নিয়ে আসা হয়েছিল। পরবর্তীতে দুর্গম এলাকার সোনার খনি থেকে সোনার-আকর আহরণের জন্য উটের ব্যবহার বাড়তে থাকে। বর্তমান সময়ে অস্ট্রেলিয়ার মরু অঞ্চলে আস্তাবল থেকে হারিয়ে যাওয়া সেই সব উটের বংশধরের সংখ্যা মিলিওন (দশ লক্ষ) এর উপর, যা পৃথিবীর কোন একটা অঞ্চলে বুনো-উটের সংখ্যার প্রেক্ষিতে সর্বাধিক। অস্ট্রেলিয়ার মরুতে কিছু বুনো কুকুর (ডিঙ্গো) ছাড়া আর কোন মাংসাশী বড় প্রাণী নাই, তাই এই সকল উটের বংশবৃদ্ধি করতে কোনই সমস্যা হয় না। মরু অঞ্চলের শুষ্ক ইকোসিস্টেম এবং সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ (খাদ্য এবং পানি) এর উপর এই বিপুল সংখ্যক উটের নেতিবাচক চাপ এখন এমন পর্যায়ে যে এই সব এলাকায় ক্যাঙ্গারু সহ অন্যান্য অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী জন্তু-জানোয়ারের অস্তিত্ব লোপ পাবার উপক্রম হয়েছে। এই সব বন্য উট ক্ষুধায় হিংস্র হয়ে এখন লোকালয়ে আক্রমণ করছে। এই সব দূরবর্তী লোকালয়ের স্থানীয় এবরিজিন কমিউনিটি এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রকৃতি-প্রেমিকদের ক্রমাগত চাপের মুখে যথাযথ বৈজ্ঞানিক জরিপ এবং গবেষণার পর অস্ট্রেলিয়া সরকার উটের পপুলেশন কমানোর জন্য ১৯ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী প্রকল্পের মাধ্যমে বুনো উটের পপুলেশন সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা হবে। বিশেষ ভাবে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত শিকারিরা হেলিকপ্টার থেকে শক্তিশালী রাইফেলের সাহায্যে নিয়মিত উট নিধন করছেন। অস্ট্রেলিয়ার আইনে কোন প্রাণীকে অহেতুক কষ্ট দেবার অধিকার কারও নাই। উট নিধনের সময়ও সেই বিষয়ে শিকারিদের বিশেষভাবে যত্নবান হতে হয়, অন্যথায় শিকারি সহ অস্ট্রেলিয়া-সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের জেল-জরিমানা পর্যন্ত হয়ে যাতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ায় সময়ে সময়ে একই ভাবে অন্য দেশ থেকে নিয়ে আসা বুনো শূকর, হরিণ, বুনো ঘোড়া, কুণো ব্যাং, খরগোশ, শিয়াল, কবুতর এবং শালিক পাখী কালিং করা হয়। এই সকল পশু-পাখী এই মহাদেশে তৎকালীন কলোনি-য় সময়ে ইংরেজরা নিয়ে এসেছিল। অস্ট্রেলিয়ার প্রকৃতি-তে এই সব পশু পাখীর নেতিবাচক প্রভাবের উপর অসংখ্য গবেষণা হয়েছে। ইকোলজিক্যাল রেস্টরেশন প্রসঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার প্রকৃতি প্রেমিক-রা সংঘবদ্ধ এবং তৎপর। এই বিষয়ে পৃথিবীতে অস্ট্রেলিয়ার অত্যন্ত সুনাম রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার জনগণ তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে ইকোলজিক্যাল রেস্টরেশন প্রসঙ্গে সচেতন এবং সেই কারনেই অস্ট্রেলিয়ার যে কোন সমুদ্র এবং বিমান বন্দরে কোয়ারান্টাইন অফিসারদের সদা-তৎপর দেখতে পাবেন।