'দেশের জন্য যুদ্ধ করে বাবার নাম এখন রাজাকারের তালিকায়'

১৬ ডিসেম্বর ২০১৯


'দেশের জন্য যুদ্ধ করে বাবার নাম এখন রাজাকারের তালিকায়'

যে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় আমার বাবাকে মুক্তিযোদ্ধার সনদ দিয়েছিল সেই একই মন্ত্রণালয় তার নাম রাজাকারের তালিকায় দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মেয়র প্রার্থী বাসদ নেত্রী ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী। সোমবার (১৬ ডিসেম্বর) রাতে ফেসবুকে লাইভে এ ঘটনার তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছেন তিনি।

মনীষা চক্রবর্তী বলেন, ২০০২ সালে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় বাবাকে মুক্তিযোদ্ধার সনদ দিয়েছিল। ২০০৫ সালে প্রকাশিত গেজেটে ১১১ নম্বর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তারা স্বীকৃতি দিয়েছিল। সেই একই মন্ত্রণালয় আমরা দেখলাম, বাবাকে আরেকটি গেজেটের মাধ্যমে নতুন একটি স্বীকৃতি দিল।

তিনি বলেন, আজকে মহান বিজয় দিবসে আমরা যখন দলীয় কর্মসূচিতে ছিলাম তখনও আমরা জানতাম না, আসলে কি রকম একটা খবর আমাদের কাছে পৌঁছাতে যাচ্ছে। খবরটা যখন প্রথমে শুনি তখন মনে হয়েছে, হয়তো কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে। গেজেটটি যতক্ষণ পর্যন্ত আমি নিজের চোখে না দেখেছি ততক্ষণ পর্যন্ত এটি আমি বিশ্বাস করতে পারিনি।

‘গেজেটে যখন দেখলাম আমার বাবা, যিনি বরিশালে সর্বজন পরিচিত একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং উনি এখানে ৯ নম্বর সেক্টরে মেজর জলিলের আন্ডারে যুদ্ধ করেছেন। তার অনেক সহযোদ্ধা বরিশালে অবস্থান করেন। তারা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বর্তমান যিনি কমান্ডার তারা সবাই একসাথে বাবার সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। এরকম একজন মানুষকে যে রাজাকারের তালিকায় নাম দেয়া যায় এবং এই ধরণের একটি প্রক্রিয়া যে বাস্তবিকভাবে সম্ভব তা আজকের এই অভিজ্ঞতা না হলে হয়তো বিশ্বাস করতে পারতাম না।’ বলছিলেন মনীষা।

তিনি বলেন, রাজশাহীতে এড. সুধির কুমার চক্রবর্তীকে পাকিস্তানি মিলিটারি বাহিনী বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। তিনি ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর সহধর্মিণী উষা রানী চক্রবর্তীকে রাজাকারের তালিকায় ৪৫ নম্বরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মনীষা বলেন, এই তালিকায় আমার ঠাকুর মা উষারাণী চক্রবর্তীর নাম। উনি ওই সময়ে বরিশালে বিদুষী নারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। উষারাণী চক্রবর্তী তার স্বামীকে মুক্তিযুদ্ধে হারিয়েছেন। একাত্তর সালের ১২ আগস্ট যখন আমার দাদুকে ঘর থেকে ধরে নিয়ে যায় তখন তিনি ওই ঘরে অবস্থান করছিলেন। তিনি তার অন্যান্য সন্তানদের নিয়ে পরে গ্রামের বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন। তিনি যে তার স্বামীকে হারালেন সেই আত্মত্যাগের মূল্যায়ন রাষ্ট্র কখনো দেখিনি একটা শহীদ পরিবারকে মর্যাদা দিয়ে করেছে। আজকে স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরে এসে মূল্যায়ন তারা করলেন রাজাকারের তালিকায় নাম দিয়ে।

তিনি বলেন, আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। বিজয়ের এই দিনে নিশ্চয়ই এমন একটি খবর তিনি প্রত্যাশা করেননি। যে দেশের জন্য তিনি যুদ্ধ করেছিলেন, যে বিজয়টি তার মতো অসংখ্য মানুষের সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে সেই বিজয় দিবসে সকালে উঠে একজন মুক্তিযোদ্ধা যখন তার নামটি রাজাকারের তালিকায় দেখেন তখন শুধু একজন মানুষের অপমান হয় না, একজন ব্যক্তির অপমান হয় না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে আদৌ যদি কিছু থেকে থাকে, সেই চেতনা যদি কিছু মানুষও ধারণ করে তাদের প্রত্যেকর এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সমগ্র চেতনার অপমান হয়।