আত্মীয় না হলেও রোগীকে কিডনি দেয়ার বৈধতা দিয়ে আদালতের রায়

৫ ডিসেম্বর ২০১৯


আত্মীয় না হলেও রোগীকে কিডনি দেয়ার বৈধতা দিয়ে আদালতের রায়

আত্মীয় না হলেও কোনো ব্যক্তিকে কিডনি দান করার বিধান রেখে আইন সংশোধনের রায় দিয়েছে বাংলাদেশের হাইকোর্ট। বাংলাদেশে মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন ১৯৯৯ এর তিনটি ধারাকে কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, এই মর্মে জারি করা রুলের ওপর আজ আদালত এই রায় দেন। রায়ে বলা হয়েছে, নিকটাত্মীয়ের বাইরেও বা মানবিক ও সহানুভূতিশীল যে কেউ চাইলে কিডনি দান করতে পারবেন।

২০১৮ সালে আইনের একটি সংশোধনী অনুযায়ী ২৩ জন নিকট আত্মীয়ের বাইরে কেউ একজন রোগীকে কিডনি দান করতে পারতেন না। এবার আরেক দফা ঐ আইন সংশোধনের পর কিডনির প্রতিস্থাপন আগের চাইতে সহজ হবে বলে মনে করেন রিটকারী আইনজীবী রাশনা ইমাম।

রাশনা ইমাম বলেন, "আইনে এতোদিন বলা হয়েছে নিকট আত্মীয় ছাড়া কেউ অঙ্গ দান করতে পারবেনা। অনেক সময়ই নিকটাত্মীয়দের মধ্যে ম্যাচ পাওয়া যায় না। আবার ম্যাচ পাওয়া গেলে তাদের সদিচ্ছার অভাব থাকতে পারে। তাই কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে আমাদের এই নিকটাত্মীয়দের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন ছিল।"

তবে এই সুযোগের যেন অপব্যবহার না হয় সেক্ষেত্রে আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং এই ক্ষেত্রে যে হাসপাতালগুলো কিডনি প্রতিস্থাপন হবে সেখানে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন বল মনে করেন আইনজীবী রাশনা ইমাম। সংশোধিত নতুন আইনে আরো সুস্পষ্ট নীতিমালাও সংযুক্ত করা যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

'আত্মীয়রা কিডনি দিতে রাজি হয়নি'

আত্মীয়রা রাজি হয়নি বলে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়নি, এরকম রোগীর সংখ্যা বাংলাদেশে অনেক।

আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ব্যক্তিরা অনেকসময় দেশের বাইরে গিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করতে সক্ষম হলেও ব্যয়বহুল হওয়ায় বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের পক্ষে তা সম্ভব হয় না। আড়াই বছর আগে সন্তান প্রসব করতে গিয়ে কিডনি জটিলতায় আক্রান্ত হন নুসরাত জাহান। সে সময় তার জরুরি ভিত্তিতে কিডনি প্রতিস্থাপন জরুরি হলেও নিজ আত্মীয় স্বজনের মধ্যে কোন দাতা না থাকায় তা সম্ভব হয়নি।

সেই থেকে আজ পর্যন্ত কিডনি সচল রাখতে ঢাকার একটি হাসপাতালে সপ্তাহে দুই তিনবার ডায়লাইসিস করতে যেতে হয় ২৩ বছর বয়সী এই নারীকে।

"বাংলাদেশে যদি বাইরের লোকদের থেকে কিডনি দেয়ার ব্যবস্থা থাকতো, তাহলে আমি কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করে ফেলতাম। বছরের পর বছর এতো কষ্ট করতাম না।"

"আত্মীয় স্বজন কেউ রাজি হয়নি। তারাও আমার মতো অসুস্থ হতে চায়নি, সেটাই স্বাভাবিক। আর দেশের বাইরে গিয়ে এই চিকিৎসা করার সাধ্য আমার নেই। প্রথম তিন মাসের চিকিৎসায় ১০-১২ লাখ টাকা চলে গেছে। এখন মাসে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়।"

বাংলাদেশে কিডনি সংক্রান্ত রোগের চিত্র

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা যায় কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে। কিডনি অকেজো হয়ে পড়লে একে কৃত্রিমভাবে চালু রাখা বা ডায়ালাইসিসে যে পরিমাণ খরচ হয় তার চাইতে সহজ উপায় কিডনি প্রতিস্থাপন। কিডনি প্রতিস্থাপনের খরচ কম ও এটি স্থায়ী সমাধান হলেও দাতা পাওয়া যায়না।

এই ভোগান্তির চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে কিডনি ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যানে, যেখানে বলা হয়েছে বাংলাদেশে প্রতিবছর ৪০ হাজার রোগীর কিডনি পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়ছে।

গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের ডায়ালাইসিস বিভাগের প্রধান তাজুল ইসলাম বলেন, "দেশে কিডনি জটিলতায় আক্রান্ত ৪০ হাজার রোগী। এরমধ্যে প্রতিস্থাপন যোগ্য রোগী ২৫ হাজার। কিন্তু দেশের ভেতরে ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয় মাত্র ২৫০টি। দেশের বাইরে হয় ১২০০-১৫০০। চাহিদা ও যোগানে ব্যাপক ফারাকের কারণ দেশের প্রচলিত আইন।"

"যদি সবাই স্বেচ্ছায় বা মরনোত্তর কিডনি দিতে পারতো, দেশে এ নিয়ে একটা কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ থাকতো, এবং অরগান ব্যাংক থাকতো তাহলে চাহিদা ও যোগানে অনেকটাই ভারসাম্য আনা যেত।"

কিডনি বাণিজ্য বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা

আত্মীয় স্বজনের বাইরে অন্য কারও থেকে কিডনি প্রতিস্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় দেশে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বাণিজ্য শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের কিডনি বিভাগের অধ্যাপক রফিকুল আলম।

কিডনি প্রতিস্থাপন বৈধতা পাওয়ায় স্বল্প আয়ের মানুষজন বিশেষ করে ছিন্নমূল এবং শরণার্থীরা অভাবের তাড়নায় কিডনি বিক্রি করতে আগ্রহী হতে পারেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। মি. আলমের মতে কিডনি প্রতিস্থাপনের বিকল্প দিকগুলোর দিকে মনযোগ দেয়া উচিত বাংলাদেশের।

"উন্নত দেশগুলোয় ৮০-৯০% কিডনি প্রতিস্থাপন হয় 'ব্রেনডেড' রোগীর থেকে। এদিকে আমরা এক শতাংশ সক্ষমতা অর্জন করতে পারিনি। এদিকটায় আমরা মনোযোগ দিতে পারি।"

'অর্গ্যান সোয়াপিং' বা অঙ্গ বিনিময় পদ্ধতিও কাজে আসতে পারে। ধরেন এই ফ্যামিলির কারও কিডনি দরকার কিন্তু তার পরিবারের যিনি দিতে আগ্রহী তারটা ম্যাচ হচ্ছেনা। আবার আরেক রোগীর ফ্যামিলিতেও একই সমস্যা। তখন এই দুই রোগীর পরিবার ফেয়ার ডোনেশনের ভিত্তিতে কিডনি আদান প্রদান করতে পারে।" বলেন রফিকুল আলম। এছাড়া রক্তের গ্রুপ না মেলা সত্ত্বেও উন্নত দেশগুলোয় সফল কিডনি প্রতিস্থাপন সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশ সেই চিকিৎসা পদ্ধতি বাংলাদেশে আনতে পারে বলেও পরামর্শ দেন তিনি। -বিবিসি বাংলা