দুই স্ত্রীর টানাটানিতে ৫ বছর ধরে হিমঘরেই স্বামীর লাশ

২৬ জুন ২০১৯


দুই স্ত্রীর টানাটানিতে ৫ বছর ধরে হিমঘরেই স্বামীর লাশ

স্বামী হিসেবে দুই স্ত্রীর দাবি করা মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ায় ৫ বছর ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) হিমঘরে পড়ে আছে খোকন নন্দী ওরফে খোকন চৌধুরী ওরফে খোকা চৌধুরী ওরফে রাজীব চৌধুরীর লাশ। বুধবার খোকনের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। এই পাঁচ বছর ধরেই দুই ধর্মের দুই স্ত্রী স্বামীর লাশের দাবিদার হিসেবে মামলা লড়ে যাচ্ছেন। আদালত এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি কোন ধর্মের ছিলেন খোকন।

ঢামেকের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘আইনি জটিলতা নিরসন না হলে আমাদের কিছু করার নেই। আমরা লাশ সংরক্ষণ করছি। তবে দীর্ঘদিন লাশ থাকলে তা কমবেশি নষ্ট হয়। আর এই লাশের জন্য আমাদের দৈনন্দিন কাজেও কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। আদালত যে আদেশ দেবেন, আমরা তাই পালন করব।’

২০১৪ সালের ১৫ জুন প্রায় ৭০ বছর বয়সী খোকনকে বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। ২৬ জুন তিনি মারা যান। তার লাশ প্রথমে বারডেমের হিমঘরে রাখা হয়। এরপর তার লাশের দাবি করেন দুই স্ত্রী। ফলে কোনো স্ত্রীকেই লাশটি হস্তান্তর করতে পারেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি আদালতে গড়ায়। বারডেমে দীর্ঘ মেয়াদে লাশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আদালতকে জানায় । ওই বছরের ২৩ অক্টোবর সহকারী জজ আদালত এক আদেশে বারডেম জেনারেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় ও তদারকিতে ঢামেক এর মরচুয়ারিতে লাশটি সংরক্ষণের আদেশ দেন। ১৫ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গ লাশটি গ্রহণ করে। এখন পর্যন্ত লাশটি সেখানেই আছে।

জানা গেছে, খোকনের প্রথম স্ত্রীর নাম মীরা নন্দী ও ছেলে বাবলু নন্দী। ১৯৮০ সালে ধর্মান্তরিত হয়ে হিন্দু থেকে মুসলিম হন তিনি। ১৯৮৪ সালে তিনি হাবিবা আকতার খানমকে বিয়ে করেন।

আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যেকোনো এক স্ত্রীর কাছে লাশটি হস্তান্তর করা হবে। এরপরই ধর্মীয়ভাবে লাশের সৎকার বা কবর দেওয়া হবে।

খোকনের এক স্ত্রী সাবেক কলেজ শিক্ষিকা হাবিবা আকতার খানম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আদালত এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারলেন না লাশ কে পাবেন। ওই পক্ষ (মীরা নন্দী) আদালতের কাছ থেকে বারবার সময় চেয়ে নিয়ে সময়ক্ষেপণ করছে। প্রায় ছয় মাস আগে মর্গে গিয়ে লাশ দেখে এসেছি, লাশ গলে যাচ্ছে। ওই পক্ষ  চাইছে, সময় নষ্ট করতে করতে আমি মারা গেলে সম্পত্তি ভোগ দখল করবে। আমার কোনো সন্তান নেই, ফলে তাদের আর কোনো সমস্যাই হবে না। আমাদের যে ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে হয়েছিল, সে সংক্রান্ত নথিসহ বিভিন্ন সাক্ষী আদালতের কাছে হাজির করেছি।’

খোকনের অনেক সম্পত্তি থাকার কারণেই লাশ নিয়ে মামলা হয়েছে এই রকম অভিযোগ করে হাবিবা বলেন, ফার্মগেটের ক্যাপিটাল সুপার মার্কেটসহ স্বামীর অনেক সম্পত্তি ছিল, তবে আসলেই সে সম্পত্তির পরিমাণ কত, তা জানি না। স্বামী নিজে থেকেও কিছু বলেননি বা আমার নামে কিছু দিয়ে যাননি। তবে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত স্বামী তার আগের পক্ষের স্ত্রী বা অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। হাসপাতালে মারা যাওয়ার আগে স্বামীর এক ভাই ওই পক্ষকে খবর দিয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। বারডেম হাসপাতালে লাশ নিয়ে টানাটানি শুরু হলে রমনা থানা থেকে পুলিশ আসে। তারপর তো এত ঘটনা।’

জানা গেছে, বারডেম হাসপাতালে খোকনের লাশ হিমঘরে রাখা বাবদ বিল হয়েছিল ২ লাখ ২৬ হাজার টাকা। আদালতের আদেশে যে স্ত্রী স্বামীর লাশ পাবেন, তাকেই এ বিল পরিশোধ করতে হবে।