৪২ বছরে পদার্পণ : কঠিন সময় পার করছে বিএনপি

১ সেপ্টেম্বর ২০১৯


৪২ বছরে পদার্পণ : কঠিন সময় পার করছে বিএনপি

প্রতিষ্ঠার একচল্লিশ বছর পূর্ণ করে বিয়াল্লিশে পা রাখলো দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি।১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে দলটি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। তিনি ছিলেন এই দলের প্রথম চেয়ারম্যান, অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এর প্রথম মহাসচিব।

দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার বলয় থেকে দূরে বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর এখন সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। দেড় বছর ধরে কারাবন্দি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও লন্ডনে। সেখান থেকে টেলিফোন-স্কাইপিতে দল পরিচালনা করছেন তিনি। দুই শীর্ষ নেতার অনুপস্থিতিতে চরম নেতৃত্ব সংকটে পড়েছে বিএনপি। এই সংকটের মধ্যেই তৈরি হয়েছে নতুন-পুরোনো জোটে অসন্তোষ, অঙ্গসংগঠনগুলোয় অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং দলের নেতাদের মতপার্থক্য প্রায়ই সামনে চলে আসছে। বছরের পর বছর মামলা জট থেকে মুক্ত হতে না পেরে দলের নেতাকর্মীরাও হয়ে পড়ছেন হতাশ ও নিষ্ক্রিয়।সব মিলিয়ে বিএনপি এখন বড় দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

গণতান্ত্রিক দেশে ক্ষমতাসীন দলের পাশাপাশি প্রয়োজন হয় একটি শক্তিশালি বিরোধী দলের। নবম জাতীয় সংসদে স্বল্প আসন নিয়েও প্রধান বিরোধী দলের বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করা বিএনপির আজকের বেহাল অবস্থার মূল কারণ দলটির শীর্ষনেতাদের ভুল সিদ্ধান্ত ও অদূরদর্শী চিন্তাভাবনা। দশম সংসদ নির্বাচন বর্জনের পর থেকে বিএনপি পথচলা ক্রমশই সংকুচিত হয়ে ওঠতে শুরু করে । ব্যাপক সমর্থনের পাশাপাশি জোট গঠন করে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলেও ক্ষমতাসীন দলের কৌশলের কাছে মার খেয়ে ভোটে ভরাডুবি ঘটে দলটির। ভোটের ফল প্রত্যাখ্যানের পরও মুষ্ঠিমেয় বিজয়ীরা শপথ নিয়ে সংসদে গিয়ে বিএনপিকে আরও নাজুক পরিস্থিতিতে ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

প্রতিষ্ঠার চার দশকের এই নিযে চারবার গভীর সংকটে পড়লো বিএনপি। দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার একবছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তৎকালীন নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে হটিয়ে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে দলটি কঠিন সংকটে পড়ে। ওই অবস্থা থেকে উত্তোরণ ঘটাতে বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির হাল ধরেন।১৯৮৪ সালের ১০ মে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন তিনি। আপসহীন ইমেজ গড়ে তোলা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ফের ক্ষমতায় আসে বিএনপি।

দ্বিতীয়বার বিএনপি বড় সংকটে পরে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের বয়কটের মুখে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ আওয়ামী লীগের গড়ে তোলা প্রবল আন্দোলনের মুখে সরকার গঠনের ৪৫ দিন পর বিএনপিকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়। ওই বছরের ১২ জুন অনুষ্ঠিত হয় সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসা এ দলটির হয়ে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। বিএনপি বসে প্রধান বিরোধী দলের আসনে। ২০০১ সালে জামায়াতে ইসলামী সঙ্গে জোট গড়ে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। খালেদা জিয়া হন তৃতীয় মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী।

বিএনপি-জামাত সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা দূর্নীতি-অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ ওঠলে দলটির জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। ২০০৬ সালের ৬ অক্টোবর মেয়াদ শেষে ক্ষতমা হস্তান্তর নিয়ে দেশে শুরু হয় ব্যাপক রাজনৈতিক সংঘাত। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি অবস্থা জারি হয়, দুই বছর ক্ষমতায় থাকেন সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক (ওয়ান-ইলেভেন) সরকার। রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ঢালাও বিদ্বেষ ছাড়নো ওই সরকার প্রধান দুই দলের নেত্রীকে কারারুদ্ধ করে।তবে ক্ষমতাচ্যুত দল হিসেবে বিএনপিই ওয়ান ইলেভেন সরকারে রোষানলে পড়ে বেশি। দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারর‌্যান তারেক রহমান গ্রেফতারের পর দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে লন্ডনে উন্নত চিকিৎসার পাঠানো হয়।

তৃতীয়বারের এই সংকট বিএনপি সামাল দেয় ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে। ওই নির্বাচনে ২৩০ আসনে জয়ী হয়ে শেখ হাসিনা নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলেও মাত্র ৩৩ আসন নিয়েওে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সংসদে বলিষ্ঠ ভূমিকা করে বিএনপি। দূর্যোগ কাটিয়ে দলটির জনসমর্থনের ফের ভিত্তি গড়ে ওঠার ইঙ্গিত মিলে দেশের সিটি কর্পোরেশনগুলোর ভোটে জয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে।

জনসমর্থনে এই স্রোতধারাকে বুঝতে ও কাজে লাগাতে ব্যর্থ হওয়ায় চতুর্থবারের মতো সংকটে পড়ে বিএনপি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বয়কট করে। সেই থেকে শুরু হয় বিএনপির দীর্ঘমেয়াদি সংকট। গত অর্ধযুগ ধরে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবে বিএনপির মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার প্রতিটি পদক্ষেপ মার খেয়েছে সরকারের গৃহিত কৌশলে কাছে। খাদের শেষ কিনারে পৌছে যায় বিএনপি দুর্নীতি মামলায় দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাবন্দি হওয়ার পর। দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে তৈরি হয় জটিলতা। অবস্থা সামলে ওঠতে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ড. কামাল হোসেনকে শীর্ষ নেতা মেনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন নির্বাচনে অংশ নিলেও ফলাফল বেগতিক। কারচুপির অভিযোগ এনে ফল প্রত্যাখ্যান করলেও পরে হাতেগোনা বিজয়ীদের নিয়ে সংসদে যোগ দেয় দলটি। সংসদে যাওয়ার 'বিনিময়ে' দলের চেয়ারপারসনের কারামুক্তির আশাও দূরাশায় পরিণত হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও গ্রেনেড হামলার মামলাসহ কয়েকটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটেও চলছে ব্যাপক টানাপড়েন। ঐক্যফ্রন্ট থেকেও বেরিয়ে গেছে কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগ। আবার ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক এলডিপিও পৃথক জোট গঠন করেছে। সবমিলিয়ে বিএনপির চতুর্থ দফার গভীর সংকটটি কেবলই দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

টানা এক যুগের নাজুক অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন দলের নেতারা। বরাবরই তারা বলে আসছেন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন জোরদার করতে হবে। কিন্তু সেই আন্দোলনে ভিত্তি গড়ে তুলতে পারছেন না।

প্রতিষ্ঠার ৪২তম বছরে এসে বিএনপি চারটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে এগোতে চাইছে। বিএনপির নেতারা জানান, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি, সংগঠন গোছানো, ৪২ তম বছরেই কাউন্সিল করা এবং নির্বাচন আদায়সহ বৃহত্তর ঐক্য গড়ার লক্ষ্যকেই দলটি এখন প্রাধান্য দিতে চায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপি যে রাজনীতি করছে সেটা বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক রাজনীতির চেয়ে অনেকটা পিছিয়ে। আর সেটা থেকে উত্তরণের জন্য বিএনপির রাজনৈতিক পন্থা আরো সময় উপযোগী হওয়া প্রয়োজন।