রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি সম্পন্ন, কাউকে জোর করে পাঠানো হবে না

২০ আগস্ট ২০১৯


রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি সম্পন্ন, কাউকে জোর করে পাঠানো হবে না

বহুল প্রত্যাশিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কর্মসূচি আগামী ২২ আগস্ট শুরু করার জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ। তবে, ২২ আগস্টে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত নয় সরকার। সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ২২ আগস্টই শুরু হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চত নন।

তবে প্রত্যাবাসনের জন্য একতরফাভাবে মিয়ানমারের তারিখ ঘোষণার পেছনে আন্তর্জাতিক চাপ কমানোর কৌশল থাকতে পারে বলে মনে করছেন বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করেন, সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে মিয়ানমার একটা দায়সারা গোছের প্রত্যাবাসন শুরু করতে চায়। স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরে যেতে চায় এমন রোহিঙ্গাদের তালিকা নিয়ে মিয়ানমারের একটি প্রতিনিধিদল আজ কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে তাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছে।

ওদিকে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম জানিয়েছেন, মিয়ানমার থেকে ছাড়পত্র পাওয়া যে সকল রোহিঙ্গা স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে যেতে আগ্রহী কেবল তাদেরকেই প্রত্যাবাসন করা হবে। কাউকে জোর করে ফেরত পাঠানো হবে না।

এছাড়া, ঢাকা সফররত ভারতীয় পররাষ্টমন্ত্রী জয়শংকর বলেছেন, বাংলাদেশ ভারত ও মিয়ানমারের জাতীয় স্বার্থেই বাস্তচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদে নিজ দেশে ফেরত যাওয়া দরকার। এ ব্যাপারে ভারত রোহিঙ্গাদের সহায়তা করতে প্রস্তুত।

এর আগে সোমবার বিকেলে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম সাংবাদিকদের জানান, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ আগামী ২২ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করার প্রস্তাব করেছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য ইউএনএইচসিআর-এর প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে মঙ্গলবার রোহিঙ্গাদের মতামত গ্রহণের কাজ শুরু হয়েছে।

শরণার্থী কমিশনার আরো জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে নদী পথে নয়; সীমান্তপথ বান্দরবানের ঘুমধুম ট্রানজিট ঘাট দিয়ে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। যে সকল রোহিঙ্গা স্বেচ্ছায় যেতে আগ্রহী, কেবল তাদের পাঠানো হবে। প্রাথমিকভাবে ৩৪৫০ জনের তালিকায় হিন্দু কিংবা খ্রিস্টান রোহিঙ্গাদের নাম নেই। আর চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিনই ৩০০ জন রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসন করা হবে।

মিয়ানমারে তাদের কীভাবে রাখা হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার জানান, মিয়ানমার সরকারের দেয়া তথ্য অনুযায়ী প্রত্যাবাসন হওয়ার রোহিঙ্গাদের প্রথমে রিসিপশন সেন্টারে নিয়ে যাবে। সেখানে এক দিন কিংবা দুই দিন অবস্থান করবে। এরপর তাদের সেখান থেকে ট্রানজিট ক্যাম্পে নেয়া হবে। ইউএনএইচসিআর এর দেয়া তথ্যমতে; গত বছরের ৩১ অক্টোবর ২২ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করে বাংলাদেশ। যার মধ্যে আগামী ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসনের জন্য ৩ হাজার ৪৫০ রোহিঙ্গার ছাড়পত্র দেয় মিয়ানমার।

উল্লেখ্য, রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিষয়টি তদন্তের জন্য সম্প্রতি ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট কমিশন অফ ইনকোয়ারি’ গঠন করেছে মিয়ানমার। ওই কমিশনের একটি প্রতিনিধিদল চার দিনের সফরে গত শনিবার বাংলাদেশে আসে। তদন্ত দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাতিসংঘে জাপানের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি কেনজো ওশিমা।

এদিকে, রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মকর্তারাও রাখাইনে ফিরতে রোহিঙ্গাদের উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। টেকনাফের চারটি রোহিঙ্গা শিবিরেই গতকাল সোমবার একযোগে শুরু হয়েছে রোহিঙ্গাদের স্বদেশ ফিরতে উদ্বুদ্ধ করার কাজ। রোহিঙ্গাদের জানানো হচ্ছে, তারা যদি দেশে ফিরে না যায়, তাহলে তাদেরকে জোর করে পাঠানো হবে না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, যে প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে সে অনুসারে উভয় দেশের সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছাড়া বাকি ৫ দিনে সর্বোচ্চ ১৫০০ জন ফিরতে পারবে। তবে দু’পক্ষের আলোচনার ভিত্তিতে এই সংখ্যা বাড়তে পারে।

মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনীর দমন অভিযান শুরুর পর ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে পরবর্তী সময়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। তার আগে গত কয়েক দশকে এসেছিল আরও চার লাখ রোহিঙ্গা।

আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করে। ২০১৮ সালের নভেম্বরে প্রত্যাবাসন শুরুর প্রস্তুতিও নিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে, মিয়ানমারের পরিস্থিতি নিয়ে রোহিঙ্গাদের মনে আস্থা না ফেরায়  তারা কেউ ফিরে যেতে রাজি হয় নি। জাতিসংঘ কর্মকর্তারা বার বার বলে আসছেন, রাখাইনে পরিস্থিতি রোহিঙ্গাদের ফিরে আসার উপযোগী হয়নি। -পার্সটুডে