বৃহঃস্পতিবার | ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ | টরন্টো | কানাডা |

Breaking News:

  • অন্টারিওতে আক্রান্তের সংখ্যা অস্বাভাবিক বেড়ে যেতে পারে
  • সংক্রমণের চতুর্থ ঢেউয়ের আশঙ্কা
আমার সব শেষ হয়ে গেছে

: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১ | সৈয়দ ইকবাল |

মাথার ভেতরে যেন একঝাঁক মৌমাছি ঢুকে পড়েছে

মোটেই না! সবে শুরু হয়েছে। সিনথিয়ার হাতে আরো দু’টি টিসু পেপার দিয়ে তাপস হঠাৎ উঠে দাঁড়াল সিনথিয়ার হাত ছেড়ে। তারপর উল্টোমুখো হয়ে হনহন করে হাঁটা দিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের দিকে।

সিনথিয়া হতবাক হয়ে বসে ছিল কতক্ষণ কে জানে। ট্রেন এসে দাঁড়াতে তার বোধ ফিরল। ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না কী হচ্ছে এসব তার সঙ্গে। তবে তাপসের একটা কথা তার ভালো লেগেছিল। তার এরকম অবস্থায় একজন দরকার যাকে সব কিছু বলতে পারে। হাতের টিসু পেপারে নজর যেতে সিনথিয়া দেখল একটা মোবাইল নম্বর লেখা। ফেলতে গিয়েও সিনথিয়া কেন যেন তার ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল টিসুটি। তিনদিন পর আবার তাদের দেখা হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেনে। পাশাপাশি সিটে বসল তারা। এর মধ্যে সিনথিয়ার মনে হয়নি ফোন করার ব্যাপারে তার মানসিক অবস্থাও সে রকম নেই।

আগে থেকেই কি আজো ফলো করছিলেন কোন বগীতে উঠব জানতে?

না আজ কাকতালীয়ভাবে একই বগীতে উঠে পড়েছি। তোমার পাশের সিট খালি ছিল বলে বসে পড়লাম। নম্বর দিলাম তারপরও ফোন করনি, তাহলে আর আগে জানবো কীভাবে তুমি আসছো। এ স্রেফ চলার পথে দেখা হওয়া।

ফোন করিনি যেহেতু আমার বলার কিছু নেই।

ঠিক, বলার কিছু না থাকলে কেন ফোন করবে।

আবার দু’জন অনেকক্ষণ চুপচাপ। ট্রেন বিশ্ববিদ্যালয় স্টপে এসে থামছে সবাই উঠে দাঁড়াচ্ছে, নামবে বলে তাপসও উঠে দাঁড়াল তারপর তখনো বসে থাকা সিনথিয়াকে বললো, ঐ ব্যাটার প্রেমহীন পুতুল ছিলে তুমি এর জন্যে এত দুঃখ ভালো না!

দ্রুত নেমে গেল তাপস। সিনথিয়া রাগে লাফিয়ে উঠেছিল। না পালালে রাগে সে কলার চেপে ধরতো, এত সাহস পায় কোত্থেকে, সবাই নেমে যাচ্ছে, সিনথিয়া বসে থাকল, রাগটা কমুক ধীরে সুস্থে নামবে।

বাইরে থেকে ট্রেনের জানালার কাছে এসে তাপস হাল্কা উচ্চ গলায় বলল, সরি সিনথিয়া। জানি ভীষণ রেগে আছো। ইচ্ছে করে তোমার মগজে হাল্কা ধাক্কা দিলাম। এটাও এক ধরনের থেরাপি মনে কর।

ফেরার সময় রেলস্টেশন থেকে রিকশায় বাসার দিকে যেতে যেতে ভেব  ব্যাপারটা।

এরপর ক্লাস করল দু’টো তবে কি পড়ালেন স্যার মাথায় ঢুকল না। মাথার ভেতরে যেন একঝাঁক মৌমাছি ঢুকে পড়েছে। মাথায় সারাক্ষণ ভোঁ ভোঁ করছে। বিশেষ করে একটা শব্দ যেন হুল ফোটাচ্ছে। ইচ্ছে পুতুল। ছুটির পর ট্রেনে ফেরার সময় তাপসের ওপর রাগটা কমে গেছে। আবার কেন যেন কান্না পাচ্ছে। রিকশা নিয়ে বাসায় যাওয়ার পথে ঝিরঝির বৃষ্টি এলো। রিকশাওয়ালা প্লাস্টিকের পর্দা টেনে দিল। ঘেরাটোপে সিনথিয়া একা, রিকশা দুলে দুলে চলছে। বেশি দূর যেন ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। নিজকে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হলো।

অন্যের ইচ্ছেপুতুল হবার তার আর ইচ্ছে নেই। তিন বছর সে যেন অন্য কারো অ্যাকুরিয়ামে মাছ হয়ে ছিল। তাকে এখন বুঝি দেয়ার সময় এসেছে যে সে একজন মানুষ। মাছ নয়। লোকে তাকে ইচ্ছা পুতুল বলবে আর তা সে শুনতে হবে আসরে আসা অতিথিদের। একটা শব্দ এতটা ধাক্কা দেবে ভাবেনি সিনথিয়া।

সে এক ধরনের শাস্তি অনুভব করছে। একান্ত নিজের ভেতরের শক্তি তাপসকে তার ধন্যবাদ দিতে ইচ্ছে করল। আসলে হয়তো কেউ একজন এমন দরকার যে দুমড়ে-মুচড়ে বের করে আনবে তাকে এই কষ্টের সময় থেকে।

ঠিকই আরো দুই দিন পর সিনথিয়া ফোন করে ধন্যবাদ জানায় তাপসকে।

তাপসতো অবাক কীসের এ ধন্যবাদ।

কীসের ধন্যবাদ তা জানার কী খুব দরকার আছে। আপনার যে কোনো ব্যাপারে আমি উপকৃত হয়েছি, তাই এই ধন্যবাদ।

আমিতো ভাবলাম, আমাকে একসেপ্ট করছো বলেই এ ফোন।

কিসের এক্সেপ্ট বুঝলাম না!

মোটকার সঙ্গে একটা সম্পর্ক ছিল বটে তাই বলে এতটা মোটা মাথার মেয়েতো তুমি নও সিনথিয়া। আমি তোমাকে প্রপোজ করেছিলাম। বলেছিলেম গত এক বছর ধরে তোমার তীব্র টান আমাকে টেনে বেড়াচ্ছে।

ও হ্যাঁ। বলেছিলেন। তবে সরি বলা ছাড়া আজ কিছু নেই আমার কাছে। বিশ্বাস উঠে গেছে মানুষের ওপর।

বিশ্বাস তো তৈরি হয় ভাঙার জন্যে। যাতে নতুন বিশ্বাসে আবার বিশ্বাসী হয় মানুষ।

ক্রমাগত তাপসের আলাপ প্রলেপের মতো ধুয়ে দিচ্ছে সিনথিয়ার জমে থাকা কষ্ট। ভেতরে জমে থাকা কষ্টের বাষ্প বেরিয়ে যাওয়ার বড় ফাটল তৈরি না হলেও একটা ছিদ্র হয়েছে। সিনথিয়ার জীবনে ঢুকছে আবার আলোকণা ফাঁকফোকর দিয়ে।

রাতে যখন সিনথিয়ার খুব খারাপ সময় তখনি ফোনে কথা বলা অভ্যাস হয়ে উঠল তাপসের সঙ্গে। বেশ রিলিফ পেত। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় এক সঙ্গে যাওয়া শুরু হলো। ক্লাসের ফাঁকেও দেখা হতে লাগল দু’জনই দুপুরের ট্রেন ইচ্ছে করে মিস করে সন্ধ্যার ট্রেনে ফিরতে লাগল। মাঝে মধ্যে তাপস জেদ ধরে বসত, সিনথিয়া তুমি এখনো আমার প্রপোজাল এক্সেপ্ট করনি।

এক্সেপ্ট আবার কী আছে। সারাদিনতো আমরা কথা বলি, গল্প করি, দেখা হয়! তোমার এই আন্তরিক ভাবে বাড়ানো হাত না পেলেতো আবার জীবনের দিকে ফিরে আসতে পারতাম না।

বুঝলাম সবই! তবে আমি তোমাকে আমার একান্ত আপন করে পেতে চাই। তুমি হ্যাঁ বা না বলবে তো একটা!

উফ, এটার ওপর এতো জোর দিচ্ছ কেন! আমার ভয় যায়নি এখনো।

আরো কাছে একান্ত নিজের করে নিলেই তো ভয় পালাবে।

আমার দ্বিধা তো আমার মধ্যেই জš§ায়। কী করব বলো। তুমি তো ক্যাম্পাসের সুন্দর মানুষ। কত সুন্দরী তোমাকে চায়। কেন তুমি সময় নষ্ট করছ আমার জন্যে!

একটাই উত্তর আমার মন চায় তোমাকে সিনথিয়া।

তাপস আর সিনথিয়া পাশাপাশি বসে আছে ট্রেনে। ট্রেন ছুটছে শহরের দিকে। তাপস মুখ ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে দ্রুত সরে যাওয়া বাইরেটা দেখতে লাগল।

পাঁচ সাত মিনিট চুপচাপ সব। এক সময় সিনথিয়া ধীরে ধীরে তাপসের হাত নিজের হাতে নিল। মুখে বলল, সরি! তোমাকে হার্ট করতে আমি কিছু বলিনি। আমি আমার সঙ্গেই খুব বিরক্ত তাই অন্য কারো বিষয় ভাবতে পারি না।

এজন্যেইতো বলি সিনথিয়া, একবার মনেপ্রাণে আবার যদি মেনে নাও দেখবে শান্তি পাবে। দ্বিধা থেকে মুক্তি মিলবে।

সিনথিয়া মনে মনে ভাবল মানুষ কি চাইলে ইচ্ছেমতো আপন করে নিতে পারে কাউকে। কে জানে। তবে যতটুকু তাপসের সঙ্গে এসেছে তাকেও হারাতে চায় না সিনথিয়া।

আরো চারদিন পর সায়েন্স ফ্যাকাল্টি ক্যান্টিনের পেছনে পাতাহীন বড় গাছটির নিচে সিনথিয়া তাপসকে খুশি করতেই যেন বললে।

ঠিক আছে তোমার প্রপোজ একসেপ্ট করলাম। তাপস আবেগে সিনথিয়াকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরলো।

আরে কর কী! চারপাশে দেখ কত ছেলেপেলে।

মনে মনে সিনথিয়া ভাবল তাপস মুখে বললাম ঠিক যেহেতু তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। তুমি এমন একটা সময় আমার দিকে হাত বাড়িয়েছ যে তোমার হাত ধরে হয়তো আমার পতন আটকে যাবে। তাপস তোমাকে ভালো লাগে তবে এখনি হ্যাঁ বলার মত দ্বিধা কেটে মন তৈরি ছিল না।

ছাড়ো স্যার আসছেন।

তাপস পড়ি কী মরি করে সিনথিয়ার তিন হাত দূরে সরে গেল। সিনথিয়া অনেক দিন পর আবার বালিকার মতো খিলখিল করে হেসে উঠল। তার সুন্দর দাঁতে শেষ বিকালের রোদ স্পার্কেল তৈরি করছে।

ধ্যাৎ কই স্যার! তাপস বুঝল সিনথিয়া দুষ্টুমি করল। তবু সে প্রাণ খুলে হাসল এটাই ভালো লাগছে।

তাপস প্রায় সিনথিয়াকে বলছে, এখন ভীষণ শান্তি লাগছে। এত দিন মন বলছে তুমি আমার।

সিনথিয়া বোঝে এত কথা বলার মানে। বালিকা বয়সে বুঝত না এখন বোঝে। পরের বৃহস্পতিবার একটা মাত্র ক্লাশ ছিল। তারা তা বাদ দিল। বাসস্ট্যান্ডে এসে রাঙ্গামাটির বাস ধরল। সন্ধ্যার পর পর ফিরে আসবে। ঘরে সবাই ভাববে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরছে আর একটু দেরি হয়ে গেলেও অসুবিধা কী! জয়ন্তর বিয়ে হয়ে গেছে শোনার পর সিনথিয়ার মাও অনেকটা শান্ত হয়েছেন। রাস্তা ফাঁকা থাকায় ওরা খুব দ্রæত রাঙ্গামাটি চলে এলো। তাপসের পরিচিত হোটেলটির অর্ধেকটাই লেকের জলে কাঠের মস্ত গুঁড়ি পুঁতে দাঁড় করানো। বেশ ক’টা রুমের কাঠের ফ্লোরের নিচে ছলাৎ ছলাৎ জলের ঢেউ খেলে বেড়ায়। রুম থেকে বেরুলে ছোট্ট বারান্দা লেকমুখী। দূর দূরান্ত যতটুকু দেখা যায় জলরাশির ওপর দিনে সূর্যের আলো রাতে চাদের ঝিলিক খেলে বেড়ায়।

হোটেলটি তাপসের বন্ধু সিপারের বাবার। ম্যানেজারের সঙ্গে খুব খাতির তাপসের। গোপনীয়তা রক্ষা করতে ওস্তাদ এই ম্যানেজার।  একবার কষ্ট করে এলেই হলো, তারপর নো চিন্তা ডো ফুর্তি করে বেরিয়ে যাও। গত ছয় মাসে একবারও আসেনি এদিকে তাপস। গুরু ভাই দাদা হরি যখনি প্রমাণ করে দিলেন তার ভাবযোগ হয়েছে তারপর থেকে সব ক্ষান্ত। শুধু যার কথা ভেবেছে এত দিন আজ তাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। এবার সিপারকে বলতে হয়নি ম্যানেজারই তার জন্যে লেক সাইড রুম রেখেছে। সিনথিয়ার জন্যে একেবারে নতুন পরিবেশ। মুগ্ধ চোখে অপলক তাকিয়ে দেখছে অপরূপ এই পাহাড় আর লেকের সম্মিলন। পাহাড় সাগর বৃষ্টি সিনথিয়ার ভীষণ প্রিয়। ছোটবেলায় পরিবারের সবার সঙ্গে পতেঙ্গা বীচে বেড়াতে গিয়েছে তারা। মাসহ অনেক কাজিন দুই ভ্যান ভর্তি মানুষ। হই হই করতে করতে সবাই গাড়িতে ফিরে আসতে মা চিৎকার করে উঠলেনÑ এই সিন্থী কই? সিনথিয়া ইচ্ছে করে সবার সঙ্গে গাড়িতে ওঠেনি। চুপচাপ একটা পাথরের ওপর বসে সাগরের সঙ্গে কথা বলছিল। ক্লাস ফোরে পড়া মেয়ের কাছে কে আশা করবে এরকম আচরণ।

সিনথিয়ার শরীরের সঙ্গে শরীর মেখে তাপস পেছনে এসে দাঁড়ালো।

স্কারবোরো, কানাডা


[email protected] Weekly Bengali Times

-->