বৃহঃস্পতিবার | ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ | টরন্টো | কানাডা |

Breaking News:

  • অন্টারিওতে আক্রান্তের সংখ্যা অস্বাভাবিক বেড়ে যেতে পারে
  • সংক্রমণের চতুর্থ ঢেউয়ের আশঙ্কা
যেন আকাশ থেকে ফসকে গেছে হাত

: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ইকবাল হাসান |

ছবি/আহমাদ ধিরানী, ইউস্পালাশ

ঘর থেকে বাইরে বেরুতেই দেখি, আকাশ অন্ধকার। ‘যেন আকাশ থেকে ফসকে গেছে হাত/

অবাধ্য প্রেম এসেছে আজ কাছে/ ফসকে যাওয়া হাতের কালো দাগ/ কাজলমাখা চোখের জলে নাচে।’[ বরিষন মুখরিত একদিন/নির্মলেন্দু গুণ ]

কিন্তু এমন হবার কথা নয়। আবহাওয়া বার্তায় গম্ভির আকাশ কিংবা বৃষ্টির নামগন্ধ ছিল না আজ,

ছিল সূর্য মেঘের লুকোচুরি।

আর এখন গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনের উপর হঠাৎ কখনো থেমে থেমে, কখনো হুমরি খেয়ে পড়ছে বৃষ্টি।

উইন্ডসিল্ড ওয়াইপারের কল্যানে হাইওয়ের যতদূর দেখা যায়, শুধু বৃষ্টি আর বৃষ্টি ! এযেন ‘হঠাৎ

সুগোল তিমির মতো আকাশের পেটে/ বিদ্ধ হলো বিদ্যুতের উড়ন্ত বল্লম!/বজ্র-শিলাসহ বৃষ্টি, বৃষ্টি:

শ্রæতিকে বধির করে/ গজ্রে ওঠে যেন অবিরল করাত-কলের চাকা,/ লক্ষ লেদ-মেশিনের আর্ত অফুরন্ত আবর্তন!’ [বৃষ্টি, বৃষ্টি/ শহীদ কাদরী]

প্রিয় শহর এই টরন্টোর আবহাওয়া বেশ মুডি, নর্তকী, অভিনেত্রী আর কবি-সাহিত্যিকদের মতো।

এই ভালো, এই মন্দ। আনপ্রেডিক্টেবল। আকাশ পরিষ্কার, এরমধ্যে দেখা গেল, একখন্ড কালো মেঘ

হঠাৎ কোত্থেকে উড়ে এসে এক পশলা বৃষ্টি দিয়ে উধাও! একবার টরন্টোর অদূরে হর্সস্যুভ্যালিতে

বেড়াতে গেলে আমাদের এভাবেই ভিজিয়ে দিয়েছিল একখন্ড কালো মেঘ।

আষাঢ়-শ্রাবণ বলে এদেশে কিছু না থাকলেও মাঝেমাঝে এখানেও বৃষ্টি নামে অবিকল বাংলাদেশের মতো, থাকে একটানা কয়েকঘন্টা। শব্দ ছন্দের সেই রিমঝিম রোমান্টিক বৃষ্টিপাতে নষ্টালজিক হয়ে ওঠে মন। হৃদয়ের অভ্যন্তরে যেন বেজে ওঠে ‘বুনো বৃষ্টির গান’- ‘বৃষ্টি এসে ভেজায় কখন নাগেশ্বরীর মাঠ/ দুরন্ত এক বাতাস নাড়ে বুনো চালতা ফল/ হৃদয় যেন রংগপুরের কনকরঙা মেয়ে/

হঠাৎ সাড়া জাগিয়ে দিয়ে লুকোয় পরান পণে/ এই দেখেছি এই দেখিনি বৃষ্টি ভেজা মাঠ।’ [বুনো বৃষ্টির গান/ সৈয়দ শামসুল হক]

প্রবাসের শীত-বৃষ্টি কিন্তু কবি ফরহাদ মাজহারের ‘বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এস্কিমোদের সবুজ

বরফের বৃষ্টির মতো’ মোটেই রোমান্টিক নয়। শীত সময়ে বরফ ঢাকা পথেঘাটে বৃষ্টি নেমে যে থ্যাকথ্যাকে অবস্থাটা তৈরি হয় পথচারীদের জন্যে তা রীতিমতো বিপদ্দজনক। এই সময়টাতে এখানকার হাসপাতালগুলো বলতে গেলে প্রায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে হাত-পা ভাঙা মানুষদের ভিড়ে।

২.

আমার ঘর থেকে কাজের জায়গার দুরত্ব ৭৫ কিলোমিটার। শুরুতে বলেছি, ঘর থেকে বেরুতেই দেখি অন্ধকার আকাশ। কয়েক কিলোমিটার যেতে না যেতেই অঝোর বৃষ্টি। বৃষ্টি পেড়িয়ে একটু দূরে যেতেই আবার ঝকঝকে রোদ! কোথায় বৃষ্টি ? ওখানে ছিল, এখানে নেই। ‘যেন একটু আগেও

মুখোমুখি ছিলে, এখন দেখছি নাই’! আবার টিপটিপ, আবার রিমঝিম। নতুন প্রেমিক প্রেমিকার মতো বৃষ্টিও রগড় জানে বেশ। যেন ‘আজ ছিল সেই ব্রত কথার দিন/ তোমার খোঁজে টিসার্ট-পরা

বৃষ্টি এসেছিল/ট্যাক্সি ক্যাবে চেপে/ দ্রৌপদীকে দেখি তখন মহাভারত ছেড়ে...’। [আড়াই অক্ষর/ আবু হাসান শাহারিয়ার]

কিংবা নেশা ধরিয়ে দেবার মতো,‘হঠাৎ দেখি মেঘ গিয়েছে/ অনেক উপর দিয়ে/ আমার কিছু

ব্যক্তিগত/ কথা সাথে নিয়ে/ ও মেঘ তুমি মন নেবে কি/ দিতে পারি কথা/ যদি তুমি ভিতর থেকে / ভাঙো নীরবতা। [নেশা/ আতাহার খান]

যদিও বাইরে দিন, তবু সর্বত্র ঘণঘোরের প্রায়-অন্ধকারে সহসা নেমে এলো শিলাবৃষ্টি। সেইসঙ্গে তীব্র বাতাস, হাইওয়ের পাশে অন্য অনেকের মতো ‘ইমারজেন্সি’ সিগনাল দিয়ে বসে বসে ভাবছি ঢাকার কথা। সামান্য বৃষ্টিতেই একহাটু জলের নিচে চলে যায় ঢাকা শহর। অসহনীয় ভোগান্তিতে তলিয়ে যায় আমাদের নাগরিক জীবন।

বিদেশ বিভুইয়ের এমন ঘণঘোর বৃষ্টির দিনে শিল্পী মনসুর উল করীমের একটি ছবির কথা মনে পড়ে গেল। ‘যখন আষাঢ় শ্রাবণ’। রঙ ও রেখার যেন আশ্চর্য এক সাঙ্গিতিক ভুবন। বৃষ্টি যেন চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে, আর ক্যানভাস থেকে উঠে এসে মাথার ভিতর যেন ঢুকে যাচ্ছে বৃষ্টির অলিক শব্দ।

অনুভব করলাম, ছবি শুধুই রঙ ও রেখার খেলা মাত্র নয়, শব্দ ও সঙ্গিতের মতো রচনা করতে পারে

ধ্বনি প্রতিধ্বনিও। দূরদেশে বৃষ্টি দেখলেই রঙ, রেখা, শব্দ ও সঙ্গিতের সেই বর্ষনসিক্ত সন্ধ্যাটির কথা আজো মনে পড়ে যায়।

৩.

একটি বৃষ্টির সন্ধ্যা’য় জয় গোস্বামীর চোখ চলে গিয়েছিল অন্যের প্রেমিকা, তার পায়ে। ‘চোখ, চলে

গিয়েছিল, অন্যের প্রেমিকা , তার পায়ে/ যখন, অসাবধানে, সামান্যই উঠে গেছে শাড়ি/ বাইরে নেমেছে বৃষ্টি/ লন্ঠন নামানো আছে টেবিলের নীচে, অন্ধকারে...’। [ একটি বৃষ্টির সন্ধ্যা/ জয় গোস্বামী]

৩৫ বছর আগের কথা। কির্তনখোলায় বড়ো মনোরম, দিশেহারা ছিল আর এক বৃষ্টি সন্ধ্যা। সে অন্যের প্রেমিকা ছিল না। সেই বর্ষনসিক্ত ঘোর লাগা সন্ধ্যায় গীতবিতানের উজ্জ্বল পংত্তিমালা, নদীর

জলে বৃষ্টির শব্দধ্বনির ভিতর ভাবলাম, এমন দিনে তারে বলা যায়, আমি আকস্মিক বলে ফেল্লাম, এই, আমরা কোথায় যাচ্ছি ?

শুনে সে বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষন, তারপর চোখ নামিয়ে বললো, জানি না।

বৃষ্টির শব্দের ভিতর তার কথা তলিয়ে গেলেও আমি এই ‘না’ এর ভিতর আমার গন্তব্য খুঁজে পেলাম। আনন্দে আমার বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে হল খুব।

সেদিনের সেই বৃষ্টিভেজা আনন্দ, এবং পরবর্তীতে আনন্দ-নিরানন্দ সবকিছু মিলিয়ে আমরা দীর্ঘ ৩৫ বছর পাশাপাশি বৃষ্টিতে ভিজেছি, রোদে পুড়েছি। আজো বৃষ্টির সম্ভাবনা অর্থাৎ মেঘ দেখলে ও ভ্রু নাচিয়ে  বলছে আমাকে এই , জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে দ্যাখোতো বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে কিনা !

ইস্টইয়র্ক, কানাডা


[email protected] Weekly Bengali Times

-->