বৃহঃস্পতিবার | ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ | টরন্টো | কানাডা |

Breaking News:

  • অন্টারিওতে আক্রান্তের সংখ্যা অস্বাভাবিক বেড়ে যেতে পারে
  • সংক্রমণের চতুর্থ ঢেউয়ের আশঙ্কা
ম্যাট কোহেনের দুঃখ

: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১ | সুব্রত কুমার দাস |

ম্যাট কোহেন

১৯৯৯ সালে মৃত্যুর ষোলো দিন আগে ম্যাট কোহেন ইংরেজি ভাষায় রচিত কথাসাহিত্যের জন্যে গভর্নর জেনারেল পুরস্কার লাভ করেন। রাইটার্স ইউনিয়ন অব কানাডার প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ম্যাটকে পুরস্কার তুলে দেওয়ার সময় গভর্নর জেনারেল অ্যাডরিয়েন ক্লার্কসন প্রথা ভেঙে জড়িয়ে ধরেন ম্যাটকে। কেমোথেরাপিতে বিষন্ন ম্যাট পুরস্কার গ্রহণ বক্তৃতায় ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন ‘আরও কম বয়সে যখন চুল বেশি ছিল’ তখন পুরস্কারটি পেলে ভালো হতো। এতে স্পষ্ট হয় ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত ম্যাটের হৃদয়ে ছিল গভীর ক্ষোভ। তাঁর এই সব ক্ষোভ প্রকাশিত হয় ম্যাটের মৃত্যুর পর। ‘টাইপিং : অ্যা লাইফ ইন ২৬ কিইস’ প্রকাশিত হয়েছিল ২০০০ সালেই। পাতার পর পাতা জুড়ে এই বইতে ম্যাট যেমন তাঁর হয়ে ওঠার কথা বলেছেন; তেমনি ব্যাখ্যা করেছেন, উদাহরণ দিয়েছেন সাহিত্য ক্ষেত্রে তাঁর হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলোর। নাম উল্লেখ করে জানিয়েছেন কোন কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছিলেন।

ঔপন্যাসিক, ছোটোগল্পকার, শিশুতোষ গ্রন্থের লেখক ম্যাট কোহেনের জন্ম ১৯৪২ সালে। কানাডার অন্টারিও প্রদেশের কিংস্টন শহরে। তাঁর লেখা নিরীক্ষামূলক উপন্যাসগুলো প্রকাশিত হয় ষাটের দশকের শেষ দিকে। ১৯৬৯ সালে ‘করসোনিলফ’ এবং ১৯৭১ সালে ‘জনি ক্রাকেল সিঙস’ প্রকাশিত হলেও ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত ম্যাটের প্রথম উপন্যাস ‘দ্য ডিসইনহেরিটেড’ তাঁর সাহিত্য-শক্তির উল্লেখযোগ্য বহিঃপ্রকাশ। তাঁর বাকি উপন্যাসগুলো হলো ‘উডেন হান্টার্স’ (১৯৭৫), ‘দ্য কালারস অব ওয়ার’ (১৯৭৭), ‘দ্য সুইট সেকে- সামার অব কিটি মেলোন’ (১৯৭৯), ‘ফ্লাওয়ার্স অব ডার্কনেস’ (১৯৮১), ‘দ্য স্প্যানিশ ডক্টর’ (১৯৮৪), ‘নাদিন’ (১৯৪৭), ‘ইমোশনাল অ্যারিথমেটিক’ (১৯৯০), ‘ফ্রুড: দ্য প্যারিস নোটবুকস্’ (১৯৯১), ‘দ্য বুকসেলার’ (১৯৯৩), ‘লাস্ট সিন’ (১৯৯৭) এবং ‘এলিজাবেথ অ্যা- আফটার’ (১৯৯৯)। শেষ উপন্যাসটির জন্যেই ম্যাট কোহেন গভর্নর জেনারেল পুরস্কার পান। ম্যাটের ঝুলিতে ছোটোগল্প গ্রন্থের সংখ্যাও কম নয় , মোট এগারোটি। ছোটোগল্পের শেষ গ্রন্থ ‘গেটিং লাকি’ প্রকাশিত হয় মৃত্যুর পর। দুটি কাব্যগ্রন্থ লিখেছেন তিনি। ছোটোদের জন্যে মোট বই লিখেছেন দশটি। শেষটি অর্থাৎ ‘দ্য কিড লাইন’ প্রকাশিত হয় মৃত্যুর পর। সবমিলিয়ে দেখা যাচ্ছে ম্যাটের মৃত্যুর পর তার মোট তিনটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। ২০০২ সালে টরেন্টো থেকে প্রকাশিত হয়েছিল ‘আনকমন গ্রাউন্ড: অ্যা সেলিব্রেশন অব ম্যাট কোহেন’। সে সংকলনে রয়েছে ম্যাটকে নিয়ে কানাডীয় সাহিত্যের সকল মহীরূহদের স্মৃতি ও মূল্যায়ন।

বছরের হিসেব করলে দেখা যাবে ম্যাট কোহেনের সাহিত্য-চর্চার কাল ঠিক ত্রিশ বছর। মোট ত্রিশটি গ্রন্থ রচনা করেছেন সাতান্ন বছর বয়সে। অনেকগুলো গ্রন্থই যথেষ্ট সমাদৃত হয়েছিল কানাডীয় সাহিত্যের বর্তমান সময়ের পুরোধা ব্যক্তিদের দ্বারাও। কিন্তু ম্যাট কখনও পুরস্কার পাননি। ১৯৭৯ এবং ১৯৯৭ সালে তার নাম নমিনেশন পেলেও তিনি বিজয়ী হননি। যদিও পুরস্কার পাওয়া নিয়ে ম্যাট কোহেনের রয়েছে একটি গোপন অধ্যায়। সেটি এই সুযোগে বলে নিতে চাই।

ম্যাটের আরেক নাম টেডি জ্যাম। এই ছদ্মনামে তিনি শিশু ও কিশোরতোষ বইগুলো লিখেছেন। বলে রাখা আবশ্যিক যে এই ধারায় তাঁর প্রথম বই প্রকাশিত হয় ১৯৮৭ সালে। ১৯৯১ সালে ‘ডক্টরস কিস সেইজ ইয়েস’ বইয়ের জন্য তিনি গভর্নর জেনারেল পুরস্কার পান। কিন্তু যেহেতু পুরস্কারটি শিশুতোষ বইয়ের অলঙ্করণের জন্যে তাই টেডির হাতে সেটি না উঠে, গিয়েছিল অলঙ্করণ শিল্পী জোয়ান ফিটজেরাল্ডের হাতে। বলে রাখা প্রয়োজন, ১৯৯৭ সালে টেডির লেখা ‘ফিশিং সামার’ আবারো একই পুরস্কারের জন্যে মনোনীত হয়েছিল। কিন্তু টেডি জ্যাম যে ম্যাট কোহেন নিজেই সে কথা তাঁর জীবদ্দশাতে তো নয়ই মৃত্যুর অব্যবহিত পরেও কেউ জানতে পারেননি। ‘দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইল’ পত্রিকার এক নিবন্ধে জেফরে ক্যানটন জানিয়েছেন যে, ম্যাটের শোকসভায় কবি ডেনিস লী শুধু এটুকুই ঘোষণা করেছিলেন যে ম্যাট একজন সফল শিশু সাহিত্যিকও বটে। ডেনিসের ভাষায় ‘কিন্তু আজ অবধি প্রথমবারের মতো ঘোষণা করতে চাই, যে ম্যাট কোহেন ‘অ্যান অব গ্রিন গ্যাবেলস’ এর শেষ খন্ড ব্যতীত বাকি সবই লিখেছেন’ ( ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০০০)।

গ্রাউন্ডউড পাবলিকেশনের মালিক ম্যাট কোহেনের তৃতীয় স্ত্রী প্যাটসি আলদানা জানিয়েছেন, জনসমক্ষে লেখক হিসেবে পরিচিতি হওয়ার ব্যাপারটি ম্যাট পছন্দ করতেন না। লোকে তার লেখালেখি নিয়ে বলছে সেগুলো নিয়ে না ভেবে নিজের মতো করে লেখা চালিয়ে যেতেই তিনি পছন্দ করতেন। এছাড়াও তিনি এটিও চাইতেন না যে তার প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকেরা তাঁর রচনাকে একজন শিশু সাহিত্যিকের লেখা হিসেবে দেখুক।

টেডি জ্যামের লেখা বইগুলোর আমেরিকান প্রকাশকের নিকট লেখকের নামটি খুবই খেলো মনে হয়েছিল। তাই ‘দ্য ইয়ার অব ফায়ার’ প্রকাশের সময় প্রকাশক লেখকের নাম বদলে অ্যাডওয়ার্ড টেডি জ্যাম করে দেন। যদিও প্যাটসি জানিয়েছেন যে, এই ঘটনায় ম্যাট বিশেষ কিছু মনে করেননি। শিশু সাহিত্যিকেরা সাধারণত স্কুলগুলো যান, লাইব্রেরিতে বসেন, কিন্তু টেডি জ্যাম সেগুলোর কিছুই না করায় প্রকাশকেরা বড়ো অসুবিধায় পড়তেন। আমেরিকার সংস্করণের প্রচারের জন্যে একবার যখন লেখকের ছবি চেয়ে পাঠানো হয়, তখন তাকে সাদা-কালোয় আঁকা একটি টেডি বিয়ার জ্যাম জারের ছবি পাঠানো হয়েছিল।

ম্যাট কীভাবে শিশু সাহিত্যিক হলেন? তিনি স্বীকার করেছেন তিনি আসলে শিশু সাহিত্যিক হতে চাননি। সে প্রসঙ্গে জানা যায় এক রাতে তিনি নিজের বাচ্চা নিয়ে সময় কাটাচ্ছিলেন। তখন তাঁর মাথায় ‘নাইট কার’ গল্পটি আসে। আরও জানা যায় পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ছোটোদের জন্যে লেখা বইগুলোর গল্প তাঁর মাথায় এসেছে এবং তিনি লিখেছেন।

ম্যাট কোহেনের সাহিত্যযাত্রা প্রসঙ্গে ‘সালেম ট্রিলজি’র প্রসঙ্গ বারবার উচ্চারিত হয়। অন্টারিওর এক কাল্পনিক শহরের নাম সালেম যেখানে তিনি তার এই ধারার উপন্যাসগুলোর প্রেক্ষিত বানিয়েছেন। সালেমকে প্রেক্ষাপট করে ম্যাটের লেখা উপন্যাসগুলো হলো পূর্বোল্লিখিত ‘দ্য ডিজইনহেরিটেড’, ‘দ্য কালারস অব ওয়ার’, ‘দ্য সুইট সেকেন্ড সামার অব কিটি মেলোন’ এবং ‘ফ্লাওয়ার্স অব ডার্টনেস’। কাল্পনিক এই শহরের নামকরণটি এসেছে ‘জেরুজালেম’ শব্দের শেষ অংশ থেকে। সাথে এসেছে ইহুদী ইতিহাস ও অতীতের কথাও।

সালেম উপন্যাসের পর ম্যাটের লেখা অন্য উপন্যাসগুলোতেও কিন্তু কিংস্টনের কাছাকাছির একই রকমের একটি গ্রামীণ চিত্রকে পাওয়া যায়। ‘এলিজাবেথ অ্যান্ড আফটার’ উপন্যাসের প্রেক্ষাপটও কিন্তু অমন একটি গ্রাম। ওয়েস্ট গাল নামের সেই গ্রামতুল্য শহরটিকে প্রথম পাওয়া গিয়েছিল ‘লাস্ট সিন’ উপন্যাসে। ‘লাস্ট সিন’ উপন্যাস নিয়ে মার্গারেট অ্যাটটড লিখেছেন : ‘কোহেন অধিকাংশ সময়ই বাস্তববাদী। তিনি বাস্তবতাকে ধারণ করতে পারেন। বাস্তবাদিতার চলন তার খুব ভালো জানা। তবে এর বাইরেও রয়েছে কোহেনের দক্ষতা। সারাটা লেখক-জীবন ধরেই কোহেন বাস্তববাদিতা এবং অবাস্তববাদিতার ভেতরে চলাফেরা করেছেন। এবং এই দুইয়ের একটি বড়ো সম্মিলন হলো ‘লাস্ট সিন’। (আনকমন গ্রাউন্ড, পৃ. ৬৭)। ম্যাটকে নিয়ে ষোলো পৃষ্ঠা দীর্ঘ এই প্রবন্ধে মার্গারেট অ্যাটউডের বিশ্লেষণ মনোগ্রাহী। বাস্তবতা এবং অবাস্তবতার মিশেল ম্যাটের প্রথম উপন্যাস থেকেই কীভাবে ক্রমে ক্রমে সফলতার দিকে এগিয়েছে সেটিকে যথার্থভাবে চিহ্নিত করেছেন মার্গারেট। মার্গারেটেরে মতে ওই যে ধরন, সেটির চূড়ান্ত ঘটেছিল ‘এলিজাবেথ অ্যান্ড আফটার’ উপন্যাসে যেটিকে শেষ পর্যন্ত তাঁকে গভর্নর জেনারেল পুরস্কার এনে দেয়।

মৃত্যুর ঠিক আগে ১৯৯৯ সালের অক্টোবরে টরেন্টোর হার্ভারফ্রন্টে আয়োজিত সাহিত্য উৎসবে জন ব্যালসান তার বক্তৃতায় ম্যাট কোহেনের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বলেন, “One of our seminal, contemporary writers” and “an intellectual in the real sense of the word....”  কিন্তু সত্য হলো এই যে বন্ধুদের এইসব স্তুতিবাক্য তাঁকে স্পর্শ করেনি। তিনি লিখলেন ‘টাইপিং’ যার মধ্যে গুমড়ে গুমড়ে মরেছে তাঁর না-পাওয়ার কথা। সমকালীন অনেক লেখক-প্রকাশকেরই ‘টাইপিং’ বইটি পছন্দ হয়নি। ‘আনকমন গ্রাউÐ’ বইতে স্টান ড্রিগল্যান্ড রচিত একটি প্রবন্ধ আছে। শিরোনাম ‘ম্যাট কোহেন : টাইপিং, রাইটিং, ‘রেসিয়াল মেমরিজ’। স্ট্যান বিশ্লেষণ করা চেষ্টা করেছেন কেন ম্যাটের ‘টাইপিং’ এমন নৈরাশ্যবাদী হয়ে উঠলো।

ম্যাট কোহেনের মৃত্যুর পরের বছর থেকেই অকাল প্রয়াত এই লেখকের নামে রাইটার্স ট্রাস্ট অব কানাডা একটি পুরস্কারের প্রচলন করে। কানাডীয় সাহিত্যে সারা জীবনের অবদানের জন্যে দেয়া এই পুরস্কারটির খরচ যোগানো যাদের অবদানে সম্ভব হয়েছিল তাঁদের অনেকেই ম্যাটের বন্ধু ছিলেন, কিন্তু তাঁরা সবাই নিজেদের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছিলেন। তাঁদের একটি মাত্রই ইচ্ছে ছিল ম্যাট কোহনের নাম বেঁচে থাকুক।

ম্যাট কোহেন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন টরন্টো শহরে বন্ধুর ওয়েস্ট এবং স্প্যাডাইনা এলাকায় নিজ বাড়িতে। প্রয়াত লেখকের স্মরণে ওই এলাকায় একটি পার্কেরও নামকরণ করা হয়েছে। তার জীবনীমূলক তথ্য ও রচনা দিয়ে ছয়টি স্মৃতিলেখ তৈরি করা হয়েছে ২০০২ সালে।  ২০০৭ সালে ম্যাটের উপন্যাস ‘ইমোশনাল আরেথমেটিক’ নিয়ে সিনেমাও নির্মিত হয়।

ইস্টইয়র্ক, কানাডা


[email protected] Weekly Bengali Times

-->