
আমরা সেহেরি সেরে ফজরের পর থেকে রান্না শুরু করে দেই।
আমি আগের দিন মনখানেক পিঁয়াজ ছিলে তিন কেজি রসুন, তিন কেজি আদা, পাঁচ কেজি পিঁয়াজ ব্লেন্ড ফ্রিজে রেখে দিয়েছিলাম। আর কেজি তিনেক কাঁচামরিচ ফালি, দশ কেজি বেগুন স্লাইস। আড়াইশো কাঁচা কাবাব বানিয়ে চেস্ট ফ্রিজারে ঢুকিয়ে রেখেছিলাম।
সকালে টেম্পারেচার ছিল প্লাস সাত। এ সুযোগে আমরা ব্যাকিয়ার্ডে ইট দিয়ে খড়ির চুলা বানিয়ে চল্লিশ লিটারের কাঁসার সস্পেন বসিয়ে ছোলা কষাতে লাগলাম। রাতে ভিজিয়ে রাখা বারো কেজি ছোলা সকালে ফুলে ফেঁপে গামলা উপচে পড়ছে। আন্দাজ করেছিলাম খানা একটা দিচ্ছে। কিন্তু কিসের খানা, সেটা সে নিজ থেকে না বললে আমি আর আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করি না। লাভ নাই। সে গতকাল থেকে মুখ এটে, পাঞ্জাবি পরে, চোখে সুরমা মেখে, জিন্নাহ টুপি মাথায় গম্ভীর মুখে ঘুরছে আর বিড়বিড় করে দোয়া দরূদ পড়ছে। সকাল এগারোটার মধ্যে এক ঘুগনি রান্নার ফিনিশিং দিয়ে ফেললো। আমার কাজ শুধু মশলা বানানো, কাটাকুটি করে ধোয়া মোছা করা। রান্নার দায়িত্ব তার।
গত পরশু ওয়ালমার্টে গিয়ে আড়াইশো বোতল পানি, ওয়ান টাইম প্লেট, গ্লাস, চামচ, টিসু আর দশ বোতল রুহ আফজা কিনে রেখেছিলাম। পঞ্চাশ লিটারের দুই কন্টেইনার ভরে শরবত তৈরি করে রেখেছিলাম।
ঘুগনি রান্নার পর আধা ঘন্টার ব্রেক।
তাপমাত্রা উঠে গেল প্লাস এগারোতে। এবার সে পাঞ্জাবি-টুপি খুলে ফেলে লুঙ্গি কাছা মেরে, গায়ে আর্জেনটিনার জার্সি পরে ঘামতে ঘামতে ব্যাঙের মতো উবু হয়ে বুক লেপ্টে তিন হাত লম্বা লোহার পাইপ দিয়ে চুলায় ফুঁ দিতে লাগলো। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো ওক কাঠের গুড়ি!

সে তার পাশের বাড়ির দুই চাইনিজকে ডেকে এনে চেয়ারে বসিয়ে দুই প্লেটে ঘুগনি খেতে দিল। আমি কিছুক্ষণ পর জিজ্ঞেস করলাম, “ভাই কেমন হইছে?”
“গুড”
“লবন?”
“গুড গুড”
“ঝাল?”
“গুড!”
যাই জিজ্ঞেস করি, বত্রিশ পাটি বের করে উত্তর দেয় ‘গুড’। আমরা হতাশ হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলি। তারা খেয়ে দেয়ে হাসিমুখে চলে গেল। সমস্যা হলো ব্যাটারা ডি উচ্চারণ পারে না..
.
এবার তেহারি রাঁধতে একশো চল্লিশ লিটারের কাঁসার ডেকচি দু’জন ধরাধরি করে চুলায় তুললাম। ছোট করে কাটা চল্লিশ কেজি গরুর গোস্ত আর ত্রিশ কেজি কালিজিরা পোলাউ এর চাল ভালমতো ধুয়ে নিলাম তিনবার করে।
বন্ধু দশ কেজি পিঁয়াজ, ছয় লিটার সর্ষে তেল, তিন কেজি ঘি ঢেলে কষিয়ে, খুব অল্প মসলায় তেহারি রাঁধতে থাকলো। নৌকার বৈঠার মতো পাঁচ হাত লম্বা কাঁসার খুন্তি চালাতে লাগলো ফখরুদ্দিন বাবুর্চির মতো; যেন দেশে গ্রামের বাড়িতে আমগাছের তলায় প্যান্ডেল টাঙিয়ে সুন্নতে খতনার খানা রাঁধছে।
কে বলবে সে কোটিপতি?
আমি তিন গামলায় রাখা বরফে চুবানো সত্তরটা করে মোট দুশো দশটা সেদ্ধ ডিম ছিলতে থাকি।
দুপুর দুটা থেকে শুরু হলো ভাজাভুজি।
বেগুন স্লাইসগুলো বেসনে চুবিয়ে বিরাট কড়াইয়ে ছাড়তেই ঠিক বালিশের মতো ফুলে উঠছে। ব্যাটারে চুবিয়ে, ধোঁয়ার মধ্যে চোখ ছোট করে যেভাবে নিখুঁতভাবে ভাজছে; তাকে কুষ্টিয়ার এনএস রোডে শাহীন বেকারিতে জিলাপি ভাজতে বসিয়ে দিলে পারফেক্ট হতো।
কে বলবে, তার তিনটা লাক্সারি গাড়ি আছে?
ঘুগনি সার্ভ করার জন্য ধনেপাতা, কাঁচামরিচ, পিঁয়াজ কুঁচি প্রিপারেশন করে ফেললাম। অসাধারণ মুখরোচক গন্ধে মৌমৌ করছে সারা উঠোন।
.
আমরা আবার দুই চাইনিজকে ডেকে চেয়ারে বসিয়ে তেহারি, কাবাব, বেগুনি প্লেটে তুলে খেতে দিলম।
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, “ভাইসকল, রান্না কেমন হইছে?”
উত্তর শুনে আমরা আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলি..
এবার আমরা তাদেরও কাজে লাগাই; কাজের বিনিময়ে খাদ্য।
তারা হাঁড়ির গলায় দুটা বাঁশ বেঁধে দিল। আমরা চারজন মিলে ডেকচি দুটো আর সব খাবার সাত সিটের বিরাট ক্যাডিলাক এসইউভি তে তুলে নিয়ে একটা স্থানীয় মসজিদে এসে মসজিদ কমিটির হাতে তুলে দিলাম।
সে মসজিদে বসে তজবীহ গোনা শুরু করল। নামাজের পর দোয়ায় বসে আধা ঘন্টা ফুঁপিয়ে, শরীর কাঁপিয়ে কাঁদলো। তারপর বাইরে গিয়ে বিড়ি ফুঁকে, কফি খেয়ে, বাংলা দোকান থেকে লাচ্ছা সেমাই, কিসমিস, দুধ, পেস্তা বাদাম, ডিম, কেওড়া জল, জাফ্রান, সুজি, পায়েস মিক্স, মাশকালাই ডাল কিনে আবার মসজিদে গিয়ে এশা’র নামাজ পড়ে আরেক দফা কান্নাকাটি করে তারাবীহ পড়তে বসলো।
তার কষ্টের কথা সে কখনো শেয়ার করে না। বহু বছর আগে একবার জিজ্ঞেশ করেছিলাম। উত্তরে বলেছিল, “শুনে উহ-আহ্ করবি? শোন রিপন, কখনো নিজের দু:খের কথা বলে লোক হাসাবি না। যাকে বলবি, সে শুনে এমন ভাব করবে, যে তোর থেকে বেশি কষ্ট পাচ্ছে। তুই আবেগে আপ্লূত হয়ে ভাববি কাছের লোক একটা পাইছিস! তারপর তুই চলে গেলে তোর দু:খ নিয়ে হাসবে, মশকরা করবে। বলবে শালা একটা বুকা..”
.
আমরা হাঁড়িগুলো নিয়ে রাত বারোটায় ফিরতেই সে নাক ডেকে ঘুমিয়ে পড়লো।
রান্নাঘরে এক পাহাড় থালাবাসন। তিনবার ডিশ ওয়াশারে দিয়েও কাজ হলো না। কিছু বড় পাতিলের তলা পুড়ে গেছে, ওগুলো ডিশওয়াশারে আটবে না।
এখন বুঝলাম সে কেন সকালে অগ্রীম বাঁশের সাথে লাঠি দিয়ে লাইট ঝুলিয়ে পানির পাইপ টেনে, একটা লোহার র্যাক এনে রেখেছিল।
আমি ব্যাকিয়ার্ডে আলো জ্বালিয়ে বাসন মাজা শুরু করি। একটা স্টেপটুল এনে একশ চল্লিশ লিটারের কাঁসার হাঁড়ি ভেতর নেমে ভেতর থেকে মাজতে থাকি। ওটা সে কিনেছিল পাকিস্তানি দোকান থেকে তিন হাজার ডলার দিয়ে।
রাত দুটার মধ্যে মাজামাজি শেষ করতেই বন্ধু ঘুমঘুম চোখে এগিয়ে এলো। হয়তো ক্যামেরায় সব দেখছিল। দু’জন ধরে হাঁড়িগুলো বেইজমেন্টে নিয়ে রাখলাম।
কাজ শেষ করতে গিয়ে ভোর সাড়ে তিনটা বেজে গেল। একবারে সেহেরি করে ঘুমাতে যাবার আগে দু’দিন পরে সে মুখ খুলল, “রিপন, বলতো কার সবচাইতে বেশি সোয়াব হইছে?”
“দোয়া করিস”
“ফি আমানিল্লাহ।”
আজ আমাকে অটোয়া ফিরতেই হবে। ঈদের বাজার বাকি, বউ-বাচ্চার জামাকাপড় কেনা বাকি।
চার ঘন্টাও ঘুমাতে পারিনি, এরই মধ্যে বন্ধু ডাক দিয়ে তুলে বলল, “রিপন, চলতো একটু। বাংলাদেশের এক কমুনিটি গ্রূপ আমার হাঁড়ি চাচ্ছে। গরীব খাওয়াবে। চল দিয়ে আসি। পরে ঘুমাস। রহমতের মাস, সোয়াব হাসিলের সুযোগ হাতছাড়া করতে নাই।”
আরও সত্তর হাজার নেকি জোগাড় করতে সত্তর কিলোমিটার দূরে বার্লিংটনে কাঁসার হাঁড়ি নিয়ে রওনা দেই।
এবার অবশ্য আমি একা, তার নাকি জরুরী কাজ আছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী এবারের সোয়াবের পুরোটাই নাকি আমার..
অটোয়া, কানাডা

