
কানাডার অন্টারিও প্রদেশের পিল ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ড (পিডিএসবিতে) আসন্ন শিক্ষাবর্ষকে ঘিরে এক গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বোর্ডের ৩৩০ জনেরও বেশি স্থায়ী শিক্ষক ছাঁটাইয়ের ঝুঁকিতে রয়েছেন যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় নজিরবিহীন এবং উদ্বেগজনক। শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্বকারী ইউনিয়ন এই সিদ্ধান্তকে “অদূরদর্শী, বিপর্যয়কর এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন” হিসেবে উল্লেখ করেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পিডিএসবির ১৫৯ জন সেকেন্ডারি শিক্ষককে ইতোমধ্যে নোটিশ দেওয়া হয়েছে, যেখানে জানানো হয়েছে যে ৩১ আগস্টের মধ্যে তাদের চাকরি চলে যেতে পারে। এর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে আরও ১৭২ জন এলিমেন্টারি শিক্ষককে জানানো হয় যে, তাদের পদ ‘অতিরিক্ত’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে যার অর্থ, তারাও ছাঁটাইয়ের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। মোট হিসাব করলে দেখা যায়, অন্তত ৩৩০ জন শিক্ষক এই অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।
যদিও শিক্ষকদের অনেকেই এই পরিস্থিতিতে পুরোপুরি অবাক হননি কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি কমে যাওয়ার কারণে শিক্ষকসংখ্যা কমানোর প্রবণতা দেখা গেছে তবুও এবারের পরিস্থিতি তাদের হতাশ করেছে। কারণ, আগের বছরগুলোর তুলনায় এবার প্রায় তিনগুণ বেশি শিক্ষককে অতিরিক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। অতীতে এমন ঘোষণা দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত প্রায় সব শিক্ষককেই আবার কাজে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি পিল অঞ্চলের পাবলিক স্কুল বোর্ডগুলো প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। শিক্ষকদের অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এবার আগের মতো পুনর্বহালের সম্ভাবনা কম। শিক্ষক তানিমা শারমীন বেঙ্গলি টাইমসকে বলেন, “বোর্ডের পরিকল্পনা মোটেও সন্তোষজনক নয়। এই ধরনের ছাঁটাই শিক্ষকদের মধ্যে গভীর অনিশ্চয়তা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে। সদস্যদের এমন অবস্থায় ফেলাটা বোর্ডের দূরদর্শিতার অভাবই প্রকাশ করে।”
অন্টারিও সেকেন্ডারি স্কুল টিচার্স’ ফেডারেশন (ওএসএসটিএফ)-এর ডিস্ট্রিক্ট ১৯ (পিল রিজিয়ন) এই ছাঁটাই প্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করেছে। প্রায় ১৬০ জন সদস্য ছাঁটাইয়ের নোটিশ পাওয়ায় তারা এটিকে “নজিরবিহীন” বলে আখ্যা দিয়েছে। ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে,
“প্রকৃত শিক্ষার্থী ভর্তির সঠিক তথ্য প্রকাশের আগে শিক্ষকদের ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। এই প্রক্রিয়া অবিলম্বে স্থগিত করা উচিত।” তারা সরাসরি অন্টারিও সরকারের প্রধান ডগ ফোর্ড এবং শিক্ষামন্ত্রী পল ক্যালান্দ্রাকে এই সিদ্ধান্তের জন্য দায়ী করে সমালোচনা করেছে।
শিক্ষামন্ত্রী পল ক্যালান্দ্রার দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, এই ছাঁটাই নোটিশগুলো আসন্ন শিক্ষাবর্ষের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিয়মিত প্রক্রিয়ার মধ্যেই দেওয়া হয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বছরের শুরুতেই সম্ভাব্য পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হলে তা শিক্ষার্থীদের জন্য কম ক্ষতিকর হয়। বরং শিক্ষাবর্ষের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে শিক্ষার্থীদের শেখার ওপর গুরুতর প্রভাব পড়ে।
কমিউনিটি ওয়ার্কার রাহাত মজুমদার বলেন, এই পরিস্থিতি কেবল শিক্ষক নয়, পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপরই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। শিক্ষকদের মনোবল ভেঙে পড়া – অনিশ্চয়তা ও চাকরি হারানোর ভয় শিক্ষকদের কাজের মানে প্রভাব ফেলতে পারে। শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব – অভিজ্ঞ শিক্ষক হারালে শিক্ষার গুণগত মান কমতে পারে। নীতিগত প্রশ্ন – প্রকৃত ভর্তির তথ্য না জেনে আগাম ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিসঙ্গত তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রশাসনিক আস্থার সংকট: বোর্ড ও সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর শিক্ষকদের আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পিডিএসবির এই সম্ভাব্য ছাঁটাই কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায় তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক সপ্তাহে সরকারের পদক্ষেপ, প্রকৃত ভর্তির চিত্র এবং ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনার ওপর। তবে আপাতত, শতাধিক শিক্ষক ও তাদের পরিবার অনিশ্চয়তার কঠিন সময় পার করছেন।
সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

