
ভ্যানকুভার অঞ্চলের দুটি ক্যাথলিক বালক উচ্চবিদ্যালয়ে প্রায় পাঁচ দশক আগে সংঘটিত যৌন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ ঘিরে চলমান একটি দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় এসেছে। অভিযোগকারী পক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, প্রায় ৩ কোটি ডলারের প্রস্তাবিত নিষ্পত্তি (সেটেলমেন্ট) গ্রহণ করা দীর্ঘদিনের আদালতযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে বাস্তবিক ও মানবিক দিক থেকে বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে।
ফরিয়াদীদের পক্ষে আইনজীবী জো ফিওরান্তে এক বিবৃতিতে বলেন, সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণের জন্য উল্লেখযোগ্য তহবিল উপলব্ধ রয়েছে এ তথ্য তাদের আশাবাদী করেছে। তাঁর ভাষায়, “ভুক্তভোগীদের জন্য এই মুহূর্তে সত্যিকার অর্থে কিছু ইতিবাচক করা সম্ভব। সেটাই আমাদের এই মীমাংসার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।” তিনি আরও জানান, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ভুক্তভোগীদের জন্য মানসিকভাবে কষ্টকর হতে পারে এবং দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এখন অগ্রাধিকার।
প্রস্তাবিত এই নিষ্পত্তি অনুমোদন পেলে সেন্ট থমাস মোর স্কুলে ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৯ সাল এবং ভ্যানকুভার কলেজে ১৯৭৬ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত অধ্যয়নকালীন সময়ে ‘ক্রিশ্চিয়ান ব্রাদার্স’ নামে পরিচিত ধর্মীয় সংগঠনের সদস্যদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করা সাবেক শিক্ষার্থীরা ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। আইনজীবী ফিওরান্তে জানিয়েছেন, সম্ভাব্য দাবিদারের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে গুরুতর যৌন নির্যাতন, শারীরিক সহিংসতা এবং মানসিক নিপীড়নের একাধিক ঘটনা। ফিওরান্তে বলেন, “আমরা বহু ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জেনেছি, যা শুধু শারীরিক নয়, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ক্ষতও সৃষ্টি করেছে।”
তবে এই ক্ষতিপূরণের পুরো অর্থ ভুক্তভোগীদের হাতে যাবে না। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ক্লাস অ্যাকশন মামলাগুলোর ক্ষেত্রে আইনজীবীদের ফি হিসেবে মোট তহবিলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দেওয়া প্রচলিত নিয়ম। সেই হিসেবে প্রায় ৩ কোটি ডলারের পুল থেকে আইনজীবীদের ফি বাদ গেলে ভুক্তভোগীদের মধ্যে বণ্টনের জন্য প্রায় ২ কোটি ডলার অবশিষ্ট থাকবে।
প্রস্তাবিত ক্ষতিপূরণ কাঠামো দুই স্তরে বিভক্ত। প্রথম স্তরে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার ডলার পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়া যেতে পারে, যা তুলনামূলক কম গুরুতর বা কম প্রমাণযোগ্য ক্ষতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। দ্বিতীয় স্তরে, গুরুতর নির্যাতনের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ সর্বোচ্চ ১০ লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এই কাঠামো নির্যাতনের ধরন ও প্রভাবের ভিত্তিতে ন্যায্য বণ্টনের চেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই মামলার সূচনা হয় ২০২১ সালে, যখন ভ্যানকুভার কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ড্যারেন লিপট্রট আদালতে অভিযোগ দায়ের করেন। তিনি দাবি করেন, ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে শিক্ষক এডওয়ার্ড ইংলিশ তাঁর ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতন চালান। তাঁর এই অভিযোগের পরই ধীরে ধীরে আরও অনেক সাবেক শিক্ষার্থী সামনে আসেন এবং মামলাটি একটি বৃহৎ ক্লাস অ্যাকশনে রূপ নেয়।
আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের মামলায় নিষ্পত্তি শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিষয় নয়; এটি ভুক্তভোগীদের জন্য স্বীকৃতি, ন্যায়বিচার এবং মানসিক পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। যদিও অর্থ দিয়ে অতীতের ক্ষতি পূরণ সম্ভব নয়, তবুও এই উদ্যোগ তাদের কণ্ঠস্বরকে স্বীকৃতি দেয় এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সচেতনতা তৈরি করে।
এখন এই নিষ্পত্তি প্রস্তাব আদালতের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন পেলে এটি কানাডায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘটিত ঐতিহাসিক নির্যাতনের মামলাগুলোর মধ্যে অন্যতম বড় আর্থিক সমঝোতা হিসেবে বিবেচিত হবে।

