
কানাডার আলবার্টা প্রদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটি এখন আর কেবল একটি অভিবাসী জনগোষ্ঠী নয় বরং একটি সুসংগঠিত, ক্রমবর্ধমান এবং সাংস্কৃতিকভাবে সক্রিয় প্রবাসী সমাজ। বিশেষ করে এডমন্টন ও ক্যালগেরিভিত্তিক বাংলাদেশ সেন্টার ও কমিউনিটি সংগঠনগুলো প্রবাসীদের মিলনস্থল, সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্র এবং নতুন অভিবাসীদের সহায়তার অন্যতম নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
আলবার্টায় বাংলাদেশি কমিউনিটির অন্যতম পুরোনো ও প্রভাবশালী সংগঠন হলো বাংলাদেশ কানাডা অ্যাসোসিয়েশন অফ এডমন্টন (বিসিএই)। ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং কমিউনিটি উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সংগঠনটি বাংলাদেশ থেকে আগত অভিবাসী পরিবার এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে কানাডিয়ান সমাজে সম্পৃক্ত হতে সহায়তা করছে। নতুন দেশে বসতি স্থাপন, চাকরি অনুসন্ধান, শিক্ষা ও সামাজিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিসিএই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, স্ট্যাটিসটিক্স কানাডার তথ্য বলছে, শুধু এডমন্টন শহরেই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা প্রায় ২,৩৭০ জন। এই সংখ্যা গত এক দশকে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কমিউনিটির সম্প্রসারণের স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। এডমন্টনের পাশাপাশি ক্যালগেরিতেও বাংলাদেশি কমিউনিটি দ্রুত বিকশিত হয়েছে। বাংলাদেশ হেরিটেজ অ্যান্ড এথনিক সোসাইটি অফ আলবার্টা(ভেসা) আলবার্টায় বাংলা সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। ভেসার আয়োজনে নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, পারিবারিক উৎসব, যুব কার্যক্রম এবং বাংলা নববর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠিত হয়। এসব আয়োজনে প্রবাসী শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা প্রজন্মগত সংযোগ বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
২০১৬ থেকে ২০২১ সময়কালে ক্যালগেরি মহানগর এলাকায় নতুন অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে আগত মানুষের সংখ্যা ছিল অন্তত ৬৪০ জন যা দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী প্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত। তথ্যসূত্র হিসেবে উইকিপিডিয়ায় প্রকাশিত পরিসংখ্যান উল্লেখযোগ্য।
কমিউনিটি নেতাদের মতে, বর্তমানে আলবার্টা প্রদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আনুমানিক ৮ থেকে ১০ হাজারের মধ্যে। প্রতিবছর নতুন শিক্ষার্থী, দক্ষ কর্মী ও পেশাজীবীরা যুক্ত হওয়ায় এই সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কানাডাজুড়ে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা ইতোমধ্যে এক লাখের কাছাকাছি পৌঁছেছে এ তথ্যও বিভিন্ন উন্মুক্ত উৎসে প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলাদেশ সেন্টারগুলোর কার্যক্রম শুধু উৎসবকেন্দ্রিক নয়; বরং এগুলো প্রবাসে সামাজিক সহায়তার গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করছে। নিয়মিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে – বাংলা নববর্ষ উদযাপন, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস অনুষ্ঠান, ঈদ পুনর্মিলনী, শিশুদের বাংলা শিক্ষা কার্যক্রম, যুব নেতৃত্ব উন্নয়ন কর্মশালা এবং নতুন অভিবাসীদের চাকরি ও বসবাস সংক্রান্ত সহায়তা। বিশেষ করে শীতপ্রধান আলবার্টায় দীর্ঘ শীত মৌসুমে এসব কমিউনিটি সেন্টার প্রবাসীদের মানসিক সংযোগ ও সামাজিক বন্ধন অটুট রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সপ্তাহান্তে পরিবারভিত্তিক আড্ডা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে বাংলাদেশি পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
কমিউনিটি সংগঠকরা বেঙ্গলি টাইমসকে জানিয়েছেন, “বাংলাদেশ সেন্টার শুধু অনুষ্ঠান করার জায়গা নয় এটি প্রবাসে আমাদের পরিচয়, ঐক্য এবং শিকড় ধরে রাখার কেন্দ্র।” দ্রুত সম্প্রসারিত বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর কারণে আগামী বছরগুলোতে আলবার্টায় এসব কমিউনিটি কার্যক্রম আরও বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে এমন প্রত্যাশাই করছেন প্রবাসী নেতৃবৃন্দ ও সচেতন নাগরিকরা।

