
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলা হার্ট অ্যাটাক বিষয়ক চিকিৎসা গবেষণায় ব্যবহৃত কুকুরগুলো অবশেষে মুক্তি পাচ্ছে। লন্ডনের সেন্ট জোসেফ’স হেলথ কেয়ার হাসপাতাল সম্প্রতি ঘোষণা করেছে, তারা তাদের গবেষণাগারে ব্যবহৃত আটটি কুকুরকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে চিকিৎসা গবেষণায় প্রাণী নির্যাতন নিয়ে চলমান বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যোগ হলো।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা এই কুকুরগুলোকে একটি “নির্ভরযোগ্য ও অভিজ্ঞ সংস্থা”-র কাছে দত্তক দিয়েছে, যদিও নিরাপত্তা ও কল্যাণের স্বার্থে সংস্থাটির নাম প্রকাশ করা হয়নি। বুধবার এক বিবৃতিতে জানানো হয়, আটটির মধ্যে ছয়টি কুকুর ইতিমধ্যেই নতুন আশ্রয়স্থলে পৌঁছে গেছে, এবং অতি শিগগিরই বাকি দুটি কুকুরকেও সেখানে পাঠানো হবে।
সেন্ট জোসেফ’স হেলথ কেয়ার বহু বছর ধরে একটি গোপন গবেষণা কর্মসূচি পরিচালনা করছিল, যেখানে কুকুরের শরীরে কৃত্রিমভাবে হার্ট অ্যাটাক ঘটিয়ে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত বিভিন্ন পরীক্ষা চালানো হতো। এই তথ্য জনসমক্ষে আসে গত ৭ আগস্ট, যখন পোস্টমিডিয়া ও ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম ব্যুরো যৌথভাবে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে প্রকাশ পায়, দীর্ঘ সময় ধরে প্রাণীর ওপর এমন পরীক্ষাগুলো গোপনে পরিচালিত হচ্ছিল, যা নৈতিকভাবে বিতর্কিত এবং আন্তর্জাতিক প্রাণী অধিকার নীতিমালার পরিপন্থী।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। প্রাণী অধিকার কর্মীরা হাসপাতালের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে এবং গবেষণায় কুকুর ব্যবহারের অবসান দাবি করে। কয়েক দিনের মধ্যেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গবেষণাটি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কুকুরগুলোর নতুন জীবনের প্রস্তুতি ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। তারা এখন একটি নিরাপদ পরিবেশে সামাজিকীকরণ ও প্রশিক্ষণ নিচ্ছে, যাতে তারা ধীরে ধীরে পারিবারিক জীবনে মানিয়ে নিতে পারে। অংশীদার সংস্থাটির এই প্রজাতির কুকুর সামলানোর ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে, এবং তাদের মাধ্যমে দত্তক গ্রহণের হার ৯০ শতাংশেরও বেশি বলে জানানো হয়েছে।
এক বিবৃতিতে হাসপাতালটি জানিয়েছে, “আমরা বিশ্বাস করি, এই কুকুরগুলোকে একটি স্নেহময় পরিবেশে নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। গবেষণার সময় তারা আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে এখন সময় এসেছে তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালনের।”
প্রাণী গবেষণা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বজুড়ে বিতর্ক চলছে। অনেক বিশেষজ্ঞ দাবি করেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে চিকিৎসা গবেষণায় প্রাণী ব্যবহার এখন আর অপরিহার্য নয়। অন্যদিকে, কিছু বিজ্ঞানী এখনো মনে করেন, কিছু নির্দিষ্ট পরীক্ষায় প্রাণীর বিকল্প এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
তবে সেন্ট জোসেফ’স হেলথ কেয়ারের এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই “নৈতিকভাবে সাহসী পদক্ষেপ” হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। কানাডার প্রাণী অধিকার সংগঠন অ্যানিমাল জাস্টিস–এর এক মুখপাত্র বলেন, “এটি শুধু আটটি কুকুরের মুক্তি নয়, বরং গবেষণায় প্রাণী ব্যবহারের ইতিহাসে একটি মানবিক মাইলফলক।”
এই ঘটনাটি শুধু একটি হাসপাতালের নীতিগত পরিবর্তন নয় এটি চিকিৎসা গবেষণার ভবিষ্যৎ নীতিমালায় গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। যখন বিজ্ঞান মানবতার জন্য কাজ করে, তখন সেই মানবতা যেন সব প্রাণীর প্রতিও সমানভাবে প্রয়োগ হয় এই বার্তাটিই যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিল সেন্ট জোসেফ’স হেলথ কেয়ারের এই সিদ্ধান্ত।
এই পদক্ষেপটি চিকিৎসা গবেষণার নৈতিক সীমা ও প্রাণীকল্যাণের মধ্যে ভারসাম্য আনার এক বাস্তব উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে এমন উদ্যোগ যদি আরও প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করে, তাহলে “বিজ্ঞান বনাম সহানুভূতি”র লড়াই এক নতুন দিশা পেতে পারে।

