
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম-প্রিয় মনজুর ভাই। ১৯৯৮ সালে গ্যালারী টুয়ান্টি ওয়ানে আমার ছবির তৃতীয় একক প্রদর্শনী From Darkness to Light এবং ২০০১ সালে বেঙ্গল গ্যালারী অফ ফাইন আর্টসে চতুর্থ ছবির একক প্রদর্শনী Mindscape এর ক্যাটালগের জন্যে ইংরেজীতে লিখে দিয়ে ছিলেন দীর্ঘ লেখা। স্নেহ করতেন আমাকে অন্যদের চেয়ে হয়তো দুই এক রত্তি বেশি। কারণ ওনার স্ত্রীর একমাত্র ভাই বর্তমানে অস্টেলিয়া প্রবাসী ডাক্তার রঞ্জু আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো। তাই হয়তো কাছের মনে করতেন একটু বেশি।
২০০১ বেঙ্গলে মাইন্ডস্কেপ প্রদর্শনীর চরম সাফল্য আমার আর্টিস্ট জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। প্রদর্শনী শেষ হতে যথারীতি কানাডায় ফিরবো। মনজুর ভাইয়ের ফোন এলো-কি ইকবাল! ভালোইতো ছবির বিক্রী বাট্টা করলে! তা অবিক্রিত আছে কিছু?
উত্তরে বল্লাম ওনাকে-একটি রয়ে গেছে কিছুটা এরোটিক বলে।
-যাক ভালো! সেটি ফেরার আগে আমার বাসায় দিয়ে যেও। আবার কবে ফিরো ঠিক আছে প্রিয় কানাডা থেকে!
কানাডা ছিলো মনজুর ভাইয়ের প্রিয় দেশ। বিশেষ করে মন্ট্রিয়ল শহর। বেশ কয়েক বছর তিনি ছিলেন মন্ট্রিয়লে ম্যাকগীল ইউনিভার্সিটিতে পি এইচ ডি করার সময়। শহরের পথ ঘাট চেনা বিশেষ করে ওল্ড মন্ট্রিয়লের অনামী ছোট-ছোট আর্ট গ্যালারী,অদ্ভুত সব ক্যাফে। তার কথা শুনে পরে আমিও ঘুরে দেখে এসেছি সেখানে।
তিনি বলতেন আমি মিস করি মন্ট্রিয়লের ‘ফল সিজান’ নভেম্বর পাতা ঝরার মাস। ম্যাকগীলের সামনে আর পেছনে গাছের জঙ্গল। পাতা ঝরে ভরে যায় জমিন।হাঁটলে মচ মচ পায়ের শব্দ এখনো শুনতে পাই।গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে ঘন্টা কে ঘন্টা বসে কাটতো কখনো। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মন্ট্রিয়ল প্রীতির আরেক নমুনা হচ্ছে তাঁর একমাত্র পুত্র মহা মেধাবী বিশ্বের প্রায় সব বড় ইউনিভার্সিটি থেকে আমন্ত্রণ পেয়ে ছিলো ফুল স্কলারশীপের। মনজুর ভাই কিন্তু পুত্রকে ঠিকই পাঠালেন তার প্রিয় ম্যাকগীলে।
একবার আমি টরন্টো থেকে মন্ট্রিয়ল যেতে ওনা পুত্রের সাথে দেখা করে টিম হর্টনের বসে কফি খেয়ে ছিলাম। আমি তাকে জিজ্ঞেস করে ছিলাম –কেমন লাগছে মন্ট্রিয়ল?
পুত্র বল্লো- বাবা এমন ভাবে বলতেন সব মন্ট্রিয়ল আর ম্যাকগীলের কথা যে এখানে এসে আমার মনে হচ্ছে সবই আমার চেনা-জানা!
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম সমসাময়ীক চিত্রকলা ভালো বুঝতেন-লিখতেনও! তবে তেমন একটা জাহির করতেন না।
তার কিছু উপন্যাস আর অসংখ্য গল্প সব বই হয়ে আছে। যা অন্য মাত্রার, তাকে বলা যেতে পারে লেখকদের জন্যে লেখক। যেমন কমল কুমার মজুমদার,কাফকা বা জেমস জেয়স ঘারানার লেখক। আমার প্রদর্শনীর পোস্টারের সাথে মিশিয়ে তাঁর সাথে যে ছবিটি দিলাম সেটি ঢাকা ক্লাবে ২০২৪শে এক পার্টির।সম্ভবত জিয়াউল করীম ও নিউ ইয়র্কের জিকোর দেয়া পার্টি।শিল্পীরাই বেশির ভাগ অতিথি।বেশির ভাগের হাতে বাংলাদেশে কিছুটা দুষ্প্রাপ্য পানীয় রেড ওয়াইন।হাসি আড্ডা আর কথায় হল গমগম করছে।বরেণ্য শিল্পী মনিরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলছিলেন মনজুর ভাই হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে আমাকে কাছে ডাকলেন,জানতে চাইলেন কবে ফিরে যাচ্ছি।
বল্লাম-এবার বেশ কয়েক মাস ছিলাম আগামী সপ্তায় ফিরে যাবো।
তিনি হেসে বল্লেন-এসো পাশে দাঁড়াও,ছবি তোলো।কবে আবার আসবে,দেখা হবে ঠিক আছে!
এটাই ওনার সাথে শেষ ছবি। এখনতো ছবির মানুষ হয়ে গেলেন প্রিয় মনজুর ভাই।

