বাইক লেন অপসারণের পরিকল্পনাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা

বাইক লেন অপসারণের পরিকল্পনাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা - the Bengali Times
টরন্টোর ব্যস্ততম সড়কগুলো থেকে বাইক লেন অপসারণের পরিকল্পনাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে দেওয়া আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্টারিওর ফোর্ড সরকার

টরন্টোর ব্যস্ততম সড়কগুলো থেকে বাইক লেন অপসারণের পরিকল্পনাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে দেওয়া আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্টারিওর ফোর্ড সরকার। বুধবার বিকেলে এক সরকারি মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন যে প্রাদেশিক সরকার সুপিরিয়র কোর্টের দেওয়া রুলিংয়ের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে আপিল করবে।

বুধবার সকালে সুপিরিয়র কোর্টের বিচারপতি পল শাবাস এক ঐতিহাসিক রুলিংয়ে জানান, টরন্টোর ব্লুর স্ট্রিট, ইয়ং স্ট্রিট এবং ইউনিভার্সিটি এভিনিউ থেকে বাইক লেন সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত কানাডার সংবিধান ও চার্টার অব রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডমসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিচারপতির মতে, জীবন, স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার যে মৌলিক অধিকার সংবিধান নাগরিকদের দিয়েছে, প্রদেশের এই পদক্ষেপ সেই অধিকারের পরিপন্থী।

- Advertisement -

রুলিংয়ে আরও বলা হয়, গত জুলাই মাসে প্রাদেশিক সরকার যে সংশোধিত আইন পাস করেছে, সেটিও চার্টারের লঙ্ঘন। সেই আইনের আওতায় মূল সড়ক থেকে বাইক লেন সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যাতে যানজট কমানো এবং গাড়িচালকদের চলাচল সহজ হয়। কিন্তু আদালতের মতে, এটি জনস্বার্থের পরিপন্থী এবং সাইক্লিস্টদের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে।

প্রাদেশিক পরিবহন মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, “অন্টারিওর জনগণ আমাদের সরকারকে নির্বাচিত করেছে তাদের যাতায়াত ব্যবস্থা আরও কার্যকর ও নিরাপদ করার জন্য। যানবাহনের জন্য পর্যাপ্ত লেন নিশ্চিত করা এবং প্রধান সড়কগুলোতে চলাচল মসৃণ করা আমাদের অঙ্গীকারের অংশ। আদালতের এই রায় আমাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত করবে, তাই আমরা রুলিংয়ের বিরুদ্ধে আপিল করব।”

এই রুলিংটি আসে কয়েক মাসের টানা আইনি লড়াই এবং আদালতের দেওয়া স্থগিতাদেশের পর। সেই স্থগিতাদেশের কারণে এতদিন ফোর্ড সরকার টরন্টোর তিনটি প্রধান সড়ক থেকে বাইক লেন অপসারণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। বিচারপতি শাবাস তার পূর্ববর্তী রুলিংয়েও উল্লেখ করেছিলেন, সাইক্লিস্টদের নিরাপত্তা জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, এবং সরকার যদি বাইক লেন সরিয়ে দিতে চায়, তাহলে তাদেরকে জননিরাপত্তা এবং যানজট হ্রাসের যথাযথ তথ্যপ্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করতে হবে।

ফোর্ড সরকারের “রোড রিস্টোরেশন ইনিশিয়েটিভ” নামে পরিচিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, টরন্টোর প্রধান সড়কগুলোর কয়েকটি অংশে বাইক লেন সরিয়ে সেগুলো পার্শ্ববর্তী গলি বা সেকেন্ডারি রাস্তায় স্থানান্তর করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। সরকারের যুক্তি ছিল, এতে ট্রাফিকের প্রবাহ স্বাভাবিক হবে এবং ব্যবসায়িক এলাকা গুলোতে যানজট কমবে। কিন্তু পরিবেশবাদী গোষ্ঠী, সাইক্লিং সংগঠন এবং স্থানীয় নাগরিকদের একাংশ শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছিল।

তাদের মতে, বাইক লেন সরিয়ে ফেলা মানে নগরজীবনের টেকসই উন্নয়নের পথে পশ্চাদপদতা। সাইক্লিস্টদের নিরাপত্তা, পরিবেশবান্ধব চলাচল এবং কার্বন নির্গমন কমানোর যে লক্ষ্য টরন্টো সিটি কাউন্সিল গ্রহণ করেছিল, তা এই সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আদালতও তার রুলিংয়ে এসব বিষয় বিবেচনা করে বাইক লেন অপসারণের পদক্ষেপকে নাগরিক অধিকারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে অভিহিত করেছে।

২০২৪ সালের শেষের দিকে পাস হওয়া “বিল ২১২” আইনের মাধ্যমে প্রদেশ সরকারকে স্থানীয় সড়ক নীতিতে হস্তক্ষেপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। টরন্টো সিটি প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই প্রদেশ চাইলে বাইক লেন স্থানান্তর বা অপসারণ করতে পারত। আদালতের সাম্প্রতিক রুলিং কার্যকর হলে এই আইনের গুরুত্বপূর্ণ ধারা স্থগিত থাকবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, টরন্টো ইতিমধ্যেই উত্তর আমেরিকার অন্যতম সাইক্লিস্ট-নির্ভর নগরী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। মহামারির সময় থেকে শহরে বাইক ব্যবহারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা যানজট কমাতে ও পরিবেশ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখছে। এমন প্রেক্ষাপটে বাইক লেন অপসারণের পরিকল্পনা অনেকের কাছে পশ্চাদমুখী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে, গাড়িচালক সংগঠনগুলো বলছে, শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় যানজট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ট্রাফিক স্বাভাবিক রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাদের দাবি, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির সহায়তায় বিকল্প লেন ব্যবস্থা করলে সাইক্লিস্ট ও গাড়িচালক উভয়ের জন্যই ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান সম্ভব।

এদিকে আদালতের রুলিং নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে। কেউ কেউ একে নাগরিক অধিকারের বিজয় বলে আখ্যা দিয়েছেন, আবার কেউ মনে করছেন সরকারকে বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে যাতে উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষা হয়।

ফোর্ড সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা দ্রুত আপিল দাখিল করবে এবং প্রয়োজনে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত নিয়ে যাবে। পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা আইনি সীমার ভেতরে থেকে আমাদের নীতি বাস্তবায়ন করব, তবে সবার নিরাপত্তা ও জনস্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে।”

টরন্টো নগরের বর্তমান বাস্তবতায় এই রুলিং ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনায় বড় প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আদালত, সরকার এবং নাগরিক সমাজের এই ত্রিমুখী বিতর্ক এখন টরন্টোর পরিবহন নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

This article was written by Sohely Ahmed Sweety as part of the LJI.

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles