
কায়সার ভাই শুধু অগ্রজ কৃষিবিদ নয়, তাঁর সাথে আমার সম্পর্কের অনেকগুলো কারন আছে। ভিন্ন মতাদর্শের হলেও এই সম্পর্ক দীর্ঘ চল্লিশ বছরেও অটুট আছে।
১৯৮৯ সালে ঢাকা কৃষি কলেজের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সংখ্যালঘু সদস্য হিসেবে আমি ম্যাগাজিন সেক্রেটারি পদে নির্বাচিত হয়েছিলাম । কায়সার ভাই তাঁর দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ভিপি পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন । কায়সার ভাইয়ে বদান্যতায় সংখ্যালঘু সদস্য হয়েও দায়িত্ব পালনে কোন সমস্যায় পরতে হয়নি। বলা যায় তাঁর কারনেই সেসময়ে কৃষি কলেজের সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলাম।
কায়সার ভাই সিরিয়াস ডাকটিকিট ও মুদ্রা সংগ্রাহক ।তিনি এরসাথে জড়িত সংগঠনগুলোর পৃষ্ঠপোষকতাও করেন। ডাক বিভাগে চাকুরি করার কারনে এবং নিজেও সৌখিন সংগ্রাহক হওয়ার কারনে তাঁর সাথে সম্পর্কটা আরও নিবিড় হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব নিয়ে তাঁর সাথে আলোচনা প্রায় নিয়মিত।

ফেসবুকে জানান দিয়ে দেশে যাই। গতবছরও গিয়েছিলাম। সে খবর জেনে কায়সার ভাই এক দুপুরে লাঞ্চের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তিনি একজন গলফার । আর্মি গলফ ক্লাবে আমাকে দেখাবেন বলে তার সংগ্রহের খানিকটা বয়ে এনেছিলেন লাঞ্চের সময়। দেশে গেলে যাতায়াতের জন্য নির্ভর করতে হয় উবারের উপর। লাঞ্চের পর সেদিনের জন্য কায়সার ভাই তাঁর একটি গাড়ী ছেড়ে দিয়েছিলেন আমাদের জন্য।
সেই কায়সার ভাই কানাডায় বেড়াতে আসবেন তা জেনেছিলাম ফেসবুকের মাধ্যমে। কায়সার ভাই অবশ্য মেসেঞ্জারে ক্ষুদে বার্তা দিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। এতো কাছের একজন কাছাকাছি আসবেন- দেখা করবো না – এমন অকৃতজ্ঞ অবশ্য আমরা নই।

তিনি আসবেন পরিবার পরিজন নিয়ে। টরন্টোর স্থিতি চার পাঁচ দিন। এরপর সবাই মিলে যাবেন কানাডার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আলবার্টা ও ব্রিটিশ কলম্বিয়ায়। তারপরও সাহস নিয়ে ফোন করে আমাদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। শত কিলোমিটারের অধিক দুরত্বের ব্যবধান উপেক্ষা করে তিনি সানন্দে রাজি হয়েছিলেন।
গতকাল বিকেলে সেই কায়সার ভাই এসেছিলেন আমাদের কষ্টে গড়া বাড়ির আঙিনায়। তাঁর বড় ভাই টরন্টোর স্কারবোরোতে এক প্রাসাদোপম বাড়ি বানিয়েছেন সম্প্রতি, তাঁর পরিবার, কায়সার ভাইয়ের বোন থাকেন নিউ ব্রান্সউইকে। কায়সার ভাইয়ের আগমন উপলক্ষে তিনিও এসেছেন, তাঁর পরিবার। তাদেরকে সঙ্গ দিয়ে এনেছেন কায়সার ভাইয়ের বন্ধু আমাদের সবার প্রিয় জোহা ভাই ও শিরিন। এতোদিন কাছাকাছি থাকি, তারপরও মনির ভাই আসেননি আমাদের বাড়ীতে। এ উপলক্ষে তিনিও এসেছিলেন স্বপরিবারে। আমাদের তিন বন্ধু সাব্বির থাকে হ্যামিলটেনে, কামাল মিসিসাগায় এবং ফেরদৌস টরন্টোতে। তাঁদেরকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তাঁরাও এসেছিলে স্বপরিবারে।

আমার শ্যালক আশিক গানপাগল মানুষ। সে থাকে হ্যামিলটনে। কায়সার ভাইয়ের আগমনের সন্ধ্যাটা উপভোগ্য করার জন্য তাকে অনুরোধ করেছিলাম। বিকেলেই সে তাঁর সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল। কোন প্রকার হেলপিং হ্যান্ড ছাড়া রুমু সবার জন্য মজাদার বেশকিছু খাবার রান্না করেছিল।
রবিবারের পড়ন্ত বিকেলে আমাদের ঘাসে মোড়ানো সবুজ কার্পেটের লনে বিক্ষিপ্তভাবে আড্ডায় মত্ত সবাই। চারিদিকে ফুলের সৌন্দর্যে মাতোয়ারা হয়ে উপভোগ করছিলো আশিকের আশি ও নব্বই এর দশকের জনপ্রিয় গানগুলো। বাড়তি পাওনা ছিল কায়সার ভাইয়ের ছোটবোনের জামাই, যিনি এসেছিলেন নিউ ব্রাঞ্চউইক থেকে, তিনিও তার মোসায়েম কন্ঠের গান দিয়ে মুগ্ধ করে রাখলেন বেশ কিছুটা সময়। এর মাঝেই রুমুর রান্না করা খাবারের স্বাদ নিতে নিতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছিল।
কায়সার ভাইয়ের আগমন উপলক্ষে পরিচিত ও বন্ধুজনের এই আড্ডা কতোটা উপভোগ্য ছিলে তা আমরা জানি না তবে আমার এবং রুমুর আন্তরিকতার কোন অভাব ছিল। বেঁচে থাকুক অগ্রজদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং বন্ধুত্বের নিদর্শন।
গুয়েল্ফ, কানাডা

