
যদিও আড্ডা সম্পর্কে মার্কসীয় দর্শন হলো এটি ফিউডাল যুগের অলস বড়লোকদের সময় ধ্বংস কররার একটি বিকৃত প্রতিষ্ঠান, কর্মমুখর ইন্ডাস্ট্রিয়াল যুগের প্রগ্রেসিভ সমাজে তার স্থান নেই তারপরও বর্তমান সময়ে আড্ডা যে সৃজনশীল চিন্তা চেতনার বিকাশ ঘটায় তার অজস্র উদাহরণ আছে। এর অবশ্য জবাব পাওয়ী যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাজে কথা’ কিংবা ‘পনেরো আনা’ য়। তিনি তাঁর লেখায় বলেছেন- জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যদি কাজের মুহূর্ত হয়ে উঠতো, তাহলে পৃথিবীময় শুধু শস্যই ফলতো, ফুল আর ফুটতে না।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেবামুলক সংগঠন রোটারী ক্লাব গঠিত হয় ১৯০৫ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারী। , পল পি. হ্যারিস , গুস্তাভাস লোহর, সিলভেস্টার শিয়েল এবং হিরাম ই. শোরে মিলে আড্ডা দিচ্ছিলেন লোহরের অফিসে। সেই আড্ডা থেকেই ধারনা আসে রোটারী ক্লাব প্রতিষ্ঠার। সত্যজিত রায়ের অনবদ্য চলচ্চিত্র ‘পথের পাঁচালি’র ভাবনাও এই আড্ডা থেকেই শুরু।
আড্ডা শব্দটি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছে গৌরিপ্রশন্ন মজুমদারের লেখা মান্নাদে’র কন্ঠে গাওয়া গানটির সুবাদে। কোলকাতা কলেজ স্ট্রিটের ইন্ডিয়ান কফি হাউজকে ঘিরে সেসময়ে শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিকদের যে আড্ডা বসতো তারই জীবন্ত ছবি ফুটে উঠেছে এই গানটিতে। আড্ডা দিতে খুব ভালবাসতেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সহ তার সমসাময়িক সকল লেখক। সেই লক্ষ্যেই ১৯৮০ সালের দিকে সাগরময় ঘোষ, সমরেশ বসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের যৌথ উদ্যোগে গড়ে তোলা হয় ‘বুধ সন্ধ্যা’। কোনো নির্দিষ্ট স্থানে এই আড্ডা বসতো না। সপ্তাহে প্রতি বুধবার সন্ধ্যায় স্বনামধন্য সব সাহিত্যিক তাদের পরিচিত কারো বাড়ির বৈঠকখানায় জড়ো হয়ে ভাবের দেওয়া-নেওয়া, আলাপ-আলোচনায় মেতে উঠতেন। চল্লিশের দশকে পুরনো ঢাকার ১নং শ্রীশদাস লেনে অবস্থিত বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডা বেশ সুখ্যাতি লাভ করে। এই দোতলা পুরাতন বাড়ির সাথে জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতির এক অনন্য ইতিহাস।
আড্ডার স্থান যেমন একটি বড় ফ্যাক্টর, তেমনি আড্ডায় অংশগ্রহণকারীদের মন মানসিকতা, আচরণের উপর আড্ডার স্থায়ীত্ব ও মাধুর্য নির্ভর করে। আড্ডার স্থান কৃত্রিমতা বর্জিত ও নিরাপদ হওয়া বাঞ্ছনীয়। আড্ডার জন্য ঘর ভাড়া করা আর শোক প্রকাশের জন্য কাঁদুনে ভাড়া করা একই কথা।
গণ অরণ্যের আড্ডার সুখ্যাতি আছে গুয়েল্ফ শহরে। আড্ডাপ্রিয় মানুষের পছন্দের জায়গা শিবব্রত নন্দী দাদার এই বাড়ি। এখানকার আড্ডা থেকে তৈরি হয়েছে আঙিনার কৃষি নামক স্বনামধন্য কমিউনিটি সংগঠনের। গ্যারাজ সেল নামক যে মানবিক সহায়তা কর্মসূচি সেটির উৎপত্তিও এই গণ অরণ্য থেকে।
উইকএন্ডের শনিবারে গুয়েল্ফের কিছু সৃজনশীল মানুষের আড্ডা বসেছিল গণ অরণ্যের ব্যাক ইয়ার্ডে। বারবিকিউ, হাল্কা নাস্তা সহযোগে এই আড্ডার ব্যাপ্তী ছিলো দুপুর থেকে সন্ধ্যার পূর্ব পর্যন্ত। রাজনীতি অর্থনীতি সমাজ নিয়ে এই আড্ডার ধারাবাহিকতায় বেরিয়ে আসবে নতুন কিছু যা হয়তো অবদান রাখবে গুয়েল্ফের সমাজিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনে।
গুয়েল্ফ, কানাডা

