প্রিয়া নার্গিস

প্রিয়া নার্গিস - the Bengali Times
বিষাদও যে এমন চমৎকারভাবে সামনে আসতে পারে তা হয়ত নজরুল না হলে আমরা কখনোই বুঝতে পারতাম না

বুলবুলি নীরব নার্গিস বনে

ঝরা বন গোলাপের বিলাপ শুনে ।।

- Advertisement -

শিরাজের নওরোজে ফাল্গুন মাসে

যেন তার প্রিয়ার সমাধির পাশে

তরুন ইরান কবি কাঁদে নিরজনে ।।

উদাসীন আকাশ থির হয়ে আছে

জল ভরা মেঘ লয়ে বুকের মাঝে ।

সাকীর শারাবের পিয়ালার পরে

সকরুন অশ্রুর বেলফুল ঝরে

চেয়ে আছে ভাঙ্গা চাঁদ মলিন আননে ।।

বিষাদও যে এমন চমৎকারভাবে সামনে আসতে পারে তা হয়ত নজরুল না হলে আমরা কখনোই বুঝতে পারতাম না। বিষাদময় কালজয়ী এই গান যা অনুধাবন করে অশ্রু বিসর্জনেও পরম শান্তি।শোকাহত মনের আকুতি এই গান, আহত মনের নির্যাসে সিক্ত, হৃদয় দুমড়ে মুচড়ে দেওয়া এই গান।অসহায় মানব জীবনের বেদনাহত এক শৈল্পিক চিত্রে বর্ণিত এই গান।

প্রতিবার গানটি শুনি এবং চোখের সামনে ভেসে ওঠে নীলাভ ফাল্গুনের এক পড়ন্ত বিকেলের নার্গিসের বন যেখানে গোলাপের পাপড়ির মৃত্যু হচ্ছে আর তাদের বিলাপ শুনে বিষাদগ্রস্থ বুলবুলি তার গান ভুলে নিশ্চুপ হয়ে গেছে।

ইরানের শিরাজ শহরের বিখ্যাত নওরোজের সকল উৎসব আয়োজনকে তুচ্ছ করে আমাদের ভগ্ন হৃদয় তরুন  কবি তার দিন কাটায় তার ভালোবাসার প্রেমিকার সমাধির কাছে।কান্নায় ডুকরে ওঠে একাকী এই কবি। নির্জনে চোখের জল ফেলে ভালোবাসার স্মৃতির প্রতি।কবির অশ্রুজল থামিয়ে দেয় চলন্ত আকাশকেও। জলের ভারে নুয়ে পড়া মেঘ নিয়ে সেও হয়ত কাঁদে কবির সাথে সাথে। বেলফুল এবং ভাঙা চাঁদও মিশে যায় বিষাদের এই চিত্রে। সমস্ত প্রকৃতি সঙ্গ দেয় আমাদের দুঃখী এই কবিকে।

জাগতিক সকল সুখ সৌন্দর্যকে অর্থহীন করে তোলে এই গানের প্রতিটি শব্দ প্রতিটা সুরের নোট। নজরুল আর তার বিখ‍্যাত বুলবুলি- তার মনের খুব কাছের আবেগঘন বুলবুলি- তার অকাল প্রয়াত নাবালক পুত্র বুলবুলি।সর্বক্ষণ কিচিরমিচিরে ঘরের আঙিনা মাতিয়ে রাখা বুলবুল।মাত্র তিন বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে যাওয়া বুলবুল, বারবার নজরুলের লেখায় জীবন ফিরে পায়। বুলিবুলির ছোঁয়াতে গানটি আরও বিষাদময় করে শ্রোতাকে আবেগাপ্লুত করে তোলে। গানটির শুরু হয় বুলবুলির নিরবতায়।

তবে গানটি হয়ত লেখা হয়েছিল কবির প্রিয়া নার্গিসকে হারিয়ে। নার্গিস- কবি নজরুলের না পাওয়া প্রেম, বহু গান ও কবিতার পেছনের গল্প এবং অনুপ্রেরণা। নামটা ছিল আসলে সৈয়েদা খাতুন, যাঁকে কাব‍্যিক নার্গিস নামে ডাকতেন প্রিয় কবি।যার রূপ মুগ্ধ করেছিল তরুণ কবি কাজী নজরুল ইসলামকে। নজরুলকে মুগ্ধ করা সেই অপরূপ রূপই সারা জীবন কাঁদিয়ে গেছে সৈয়দা খাতুনকে। সৈয়দা খাতুনের সবচেয়ে সৌভাগ্যেটিই শেষ পর্যন্ত যার হয়ে গেল তার সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের ইতিহাস।

কবি নজরুলের বন্ধু ছিলেন নার্গিসের মামা যার আমন্ত্রণে নজরুল দুই মাস কাটিয়েছিলেন তাদের বাড়িতে। নজরুল তার প্রতিভায়, প্রেমে, বাশির সুরে মুগ্ধ করেছিলেন সৈয়েদা খাতুনকে। আর ষোড়শী সৈয়েদা খাতুনের রূপ দিওয়ানা করেছিল নজরুলকে।নার্গিসের বাড়ীতে বসেই হয়তো নজরুল লিখেছেন তার বেদনা-অভিমান, অবেলা, অনাদৃতা, পথিক প্রিয়া, অকরুণ প্রিয়া, শেষের গান, বেদনামনি, লক্ষিছাড়া, বিদায় বেলা’র মতো গান-কবিতাগুলি। পাশেই কোথাও ছিল ঝিঙে ফুল কবিতার ঝিঙে ফুলে ছাওয়া মাচা।

দুর্ভাগ্যবশত বিয়ের সকল আয়োজন সম্পন্ন করার পরেও বিয়েটা হয়নি নার্গিস এবং নজরুলের।হয়ত খান বাড়ির কোন আচরণ, আকবর আলী খান, বাড়ির অন্য কেউ বা স্বয়ং নার্গিসের কাছ থেকে কিছুটা অনাদর নজরুলের সংবেদী কবি মনকে মারাত্বক ভাবে আহত করেছিল। নার্গিসরা বাউন্ডুলে নজরুলকে গৃহী করার বদলে আরও করে তোলে বাধনহারা। নজরুল কাউকে কিছু না জানিয়ে বাসর রাতেই ত্যাগ করেন নার্গিসদের কুমিল্লার খান বাড়ী।

অভিমানী নজরুল কখনই ফিরে আসেননি প্রিয়া নার্গিসের কাছে। এমনকি উত্তরও দেননি নার্গিসের আকুতি ভরা চিঠিগুলোর। নার্গিস নানান ভাবে প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালিয়ে গেছেন একটিবার কবির সাথে দেখা করার। নজরুল সযত্নে এড়িয়ে গেছেন দেখা হবার সকল সম্ভবনা। শুধু তাই না, নানাভাবে নিবৃত করার চেষ্টাও করেছেন নার্গিসকে। প্রিয়ার কাছে লেখা বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম উজ্জল এক চিঠিতে অনেকটা স্পষ্ট করেই বলেন নিজের বক্তব্য।

“…আমার অন্তর্যামী জানেন তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কি গভীর ক্ষত, কি অসীম বেদনা! কিন্তু সে বেদনার আগুনে আমিই পুড়েছি–তা দিয়ে তোময় কোনদিন দগ্ধ করতে চাইনি। …তোমার যে কল্যান রূপ আমি আমার কিশোর বয়সে প্রথম দেখেছিলাম, যে রূপকে আমার জীবনের সর্বপ্রথম ভালবাসার অঞ্জলি দিয়েছিলাম, সে রূপ আজো স্বর্গের পারিজাত-মন্দারের মত চির অম্লান হয়েই আছে আমার বক্ষে।

…আজকার তুমি আমার কাছে মিথ্যা, ব্যর্থ; তাই তাকে পেতে চাইনে। জানিনে হয়ত সে রূপ দেখে বঞ্চিত হব, অধিকতর বেদনা পাব,–তাই তাকে অস্বীকার করেই চলেছি।

দেখা? না-ই হ’ল এ ধূলির ধরায়। প্রেমের ফুল এ ধূলিতলে হয়ে যায় ম্লান, দগ্ধ, হতশ্রী। তুমি যদি সত্যিই আমায় ভালবাস আমাকে চাও ওখান থেকেই আমাকে পাবে। লাইলি মজনুকে পায়নি, শিরি ফরহাদকে পায়নি, তবু তাদের মত করে কেউ কারো পিয়তমাকে পায়নি।

…যাক আজ চলেছি জীবনের অস্তমান দিনের শেষ রশ্মি ধরে ভাটার স্রোতে, তোমার ক্ষমতা নেই সে পথ থেকে ফেরানোর। আর তার চেষ্টা করোনা। … তুমি সুখি হও, শান্তি পাও–এই প্রার্থনা। আমায় যত মন্দ বলে বিশ্বাস করো, আমি তত মন্দ নই–এই আমার শেষ কৈফিয়ৎ।”

নার্গিসের সাথে বিয়ের ঘটনার মাত্র বছর তিনেক পরেই এই কুমিল্লারই মেয়ে প্রমিলাকে বিয়ে করে নজরুল সংসারী হলেও নার্গিস অপেক্ষা করে গেছেন দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। সুদীর্ঘ ১৭ টি বছর আশায় আশায় নজরুলের পথ চেয়ে কাটিয়েছেন নার্গিস। কবি তার অভিমান হয়তো কখনই ভুলতে পারেননি। নার্গিসের একের পর এক চিঠির প্রত্যুত্তরে নিজেই লিখে গেছেন একের পর অভিমানী-বিরহী গীতি-কবিতা। অভিমান ভরেই কবি লিখে গেছেন–

“যারে হাত দিয়ে মালা দিয়ে মালা দিতে পার নাই, কেন মনে রাখ তারে?ভুলে যাও তারে ভুলে যাও একেবারে।।”

কিন্তু জীবন থেকে নার্গিসকে চিরতরে সরিয়ে দিলেও নার্গিস বারংবার ফিরে এসেছে কবির কবিতায়, গানে, রচনায়–

“তবু মাঝে মাঝে আশা জাগে কেন

আমি ভুলিয়াছি ভোলেনি সে যেন

গোমতীর তীরে পাতার কুটিরে

আজও সে পথ চাহি সাজে।।

আজও মধুর বাশরী বাজে

গোধূলী লগনে বুকের মাঝে।।”

লেখাপড়া, সনদপত্র, রিসার্চ, অর্থ, থিওরি কিংবা সূত্রে ফেলে আর যাই হওয়া যাক না কেন, কবি হওয়া যায় না। খুব করে পড়াশুনা করে, ছন্দমাত্রার অঙ্ক কষে হয়ত একটি দুটি নিরামিষ কবিতা প্রসব করা যায়, তবে তা বড় বিস্বাদ হয়। কবিত্ব সৃষ্টিকর্তার নিজ হাতে তৈরি করা এমন এক বৈশিষ্ট্য যা মানুষকে একইসাথে পরম সৌভাগ্যবান এবং চরম অভিশপ্ত করে তোলে। আয়েশের জীবন কাটানো লোক সাধারণত দিগ্বিজয়ী কবি হতে পারেন না, সব দিক থেকে সম্পূর্ণ আপাতদৃষ্টিতে সুখী মানুষ, কারও সাতে পাঁচে না থাকা মানুষও কবি হতে পারেন না।নজরুল বারে বারে একথা প্রমান করে দিয়েছেন।

আমাদের অভিমানী কবি, বাউন্ডুলে ক্ষ‍্যাপা পাগলাটে কবি, আমাদের চোখের কাজল আর হৃদয়ের স্পন্দনের কবি, আমাদের পরম আদরের কবি, অবুঝ মনা আবার পৃথিবীর সকল রহস্য উন্মোচন করার ক্ষমতাসম্পন্ন কবি – আমাদের প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।একবুকভরা অভিমান আর সমুদ্রসীমা ভালোবাসা ধারন করার বিরল ক্ষমতা নিয়ে জন্মানো এই কবির প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।

মেঘমল্লারের এই দিনে তাঁর লেখা গান শুনতে শুনতে আর গুন গুন করতে করতে কেবলই তাঁর কথা মনে পড়ছে। ইশ যদি একটু সঙ্গ পেতাম এই পাগলাটে প্রেমিক অনবদ্য কবির তাহলে আমার এই তুচ্ছ পাঠক জীবন ধন‍্য হতো।

লেখক প্রাবন্ধিক অনিরুদ্ধ রহমানের প্রবন্ধ থেকে ধার করা হয়েছে আমার এই লেখার অনেক তথ‍্য। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা।

 

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -
পূর্ববর্তী খবর
পরবর্তী খবর

Related Articles

Latest Articles