‘যৌনাঙ্গে বুট দিয়ে মেরেছে, জামা টেনে খুলে দিয়েছে’, দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ

‘যৌনাঙ্গে বুট দিয়ে মেরেছে, জামা টেনে খুলে দিয়েছে’, দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ - the Bengali Times
ছবি সংগৃহীত

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর নির্যাতন, শারীরিক হেনস্তা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষার্থী, সমাজকর্মী ও সাংবাদিকেরা। কয়েকজন বিক্ষোভকারী তাঁদের শরীরের আঘাতের চিহ্নও দেখিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি বিবিসি বাংলা। প্রতিবেদন প্রকাশের আগে দিল্লি পুলিশের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

গত ১০ ও ১১ অক্টোবর দিল্লিতে বিক্ষোভ চলাকালে এসব আটকের ঘটনা ঘটে। আটক ব্যক্তিদের অভিযোগ, তাঁদের জোর করে বাসে তোলা, মারধর, চুল টানা, পোশাক টেনে তোলা এবং গোপনাঙ্গে লাথি মারার মতো ঘটনা ঘটেছে। তবে এমন অভিজ্ঞতার পরও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন অনেকে।

- Advertisement -

পোশাক টেনে মাথার ওপর তুলে দেওয়ার অভিযোগ

আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী ও স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার (এসএফআই) সদস্য শরণ্যা শর্মাকে ১১ অক্টোবরের বিক্ষোভ থেকে আটক করা হয়। তাঁর অভিযোগ, নারী পুলিশ সদস্যরা তাঁর পোশাক টেনে মাথার ওপর তুলে দেন এবং চুল ধরে টানেন। পরে পুরুষ কমান্ডোরা ধাক্কা দিয়ে তাঁকে একটি বাসে তোলেন।

শরণ্যার দাবি, বাসের লোহার দরজা বন্ধ করার সময় তাঁর পা বাইরে আটকে যায়। ভেতরে থাকা কয়েকজন নারী বিষয়টি জানিয়ে দরজা খোলার অনুরোধ করলেও পুলিশ সদস্যরা দরজা ঠেলতে থাকেন। এতে তিনি আরও বিপদে পড়েন বলে অভিযোগ করেন।

শরণ্যাকে সকাল ১১টার দিকে আটক করে নাঙ্গলোইয়ের একটি আটককেন্দ্রে নেওয়া হয়। গভীর রাতে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানান তিনি। ওই কেন্দ্রে খাবার, পানীয় জল ও শৌচাগারের মতো মৌলিক সুবিধার অভাব ছিল বলেও অভিযোগ তাঁর।

‘আধমরা অবস্থায় ফিরবে’ বলে হুমকির অভিযোগ

এসএফআইয়ের দিল্লি সভাপতি ও উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী নাদিয়াকে ১০ অক্টোবর আটক করা হয়েছিল। পরে তাঁর শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। এরপরও ১২ অক্টোবর বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার বিক্ষোভে অংশ নেন তিনি।

নাদিয়ার অভিযোগ, আটক অবস্থায় নারী পুলিশ সদস্যরা তাঁর চুল টানেন, চিমটি কাটেন এবং লাথি মারেন। মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে বাধা দেন তিনি। এরপর চার পুলিশ সদস্য তাঁর ওপর চড়াও হন বলে দাবি করেন এই শিক্ষার্থী।

নাদিয়া বলেন, তাঁকে আধমরা অবস্থায় ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য, আটকের সময় বাসে থাকা অন্য এক নারীও পুলিশের হেনস্তার শিকার হন। কয়েকজন নারী বিক্ষোভকারীর জামা টেনে মাথার ওপর তুলে দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

নাদিয়ার মতে, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতেই এভাবে আটক করা হচ্ছে। ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের বিক্ষোভ চলবে।

তিন ঘণ্টা বাসে আটকে রেখে মারধরের অভিযোগ

দিল্লিতে পিএইচডি করা নোভেল ১০ অক্টোবর ভগৎ সিংয়ের পোস্টার হাতে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে তাঁকে আটক করে পোস্টার নিয়ে যেতে দেখা যায়।

নোভেলের অভিযোগ, তাঁকে একটি কমলা রঙের দিল্লি পরিবহন সংস্থার বাসে জোর করে তোলা হয়। সেখানে প্রায় তিন ঘণ্টা আটকে রেখে ১০ থেকে ১৫ মিনিট পরপর চড় মারা হতো। এ সময় তাঁর জামা ছিঁড়ে দেওয়া হয় এবং লাথি মেরে চশমা ভেঙে ফেলা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।

নোভেল বলেন, বাসে তিনি একা ছিলেন। পুলিশ সদস্যরা তাঁকে এমন কথাও বলেছিলেন যে, বাসে একা থাকায় তাঁর সঙ্গে কী ঘটছে, তা কেউ জানতে পারবে না। এতে তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভীত হয়ে পড়েন।

পিএইচডি করার পাশাপাশি শিক্ষকতা করেন—এ কথা জানিয়ে মুক্তি চাইলেও তাঁকে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ নোভেলের। প্রায় তিন ঘণ্টা পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

গোপনাঙ্গে বুট দিয়ে আঘাতের অভিযোগ

১১ অক্টোবর দিল্লির কনট প্লেস এলাকায় বিক্ষোভ চলাকালে আটক হওয়া সমাজকর্মী অর্জুনের অভিযোগ, পুলিশ সদস্যরা তাঁর মুখে ঘুষি মারেন, বুকে ও গোপনাঙ্গে বুট দিয়ে লাথি দেন এবং গলা চেপে ধরেন। এতে তাঁর পোশাকও ছিঁড়ে যায় বলে জানান তিনি।

অর্জুনের দাবি, আটক করার পর একটি বন্দিবাহী গাড়িতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য পালাক্রমে তাঁর ওপর হামলা চালান। পরে তাঁকে গাড়ির ভেতরের ছোট একটি খুপরিতে পাঠানো হয়।

ওই গাড়িতে কয়েকজন অপ্রাপ্তবয়স্ক বিক্ষোভকারীও ছিলেন বলে দাবি করেন অর্জুন। তাঁদের কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন, এমনকি কারও হাড় ভেঙে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ তাঁর। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে বিবিসি বাংলা।

বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে আটক সাংবাদিকেরাও

বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে ১০ ও ১১ অক্টোবর একাধিক সাংবাদিকও পুলিশের হাতে আটক হন। সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টসের (সিপিজে) তথ্য অনুযায়ী, দিল্লি, আহমেদাবাদ ও পুনেতে অন্তত ৩৭ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে ৩৫ জনের বেশি ছিলেন দিল্লির।

আটক সাংবাদিকদের মধ্যে স্ক্রল, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, নিউজলন্ড্রি ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস হিন্দির প্রতিনিধিরা ছিলেন। তাঁদের কয়েকজনের মুঠোফোন জব্দ করা হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস হিন্দির সাংবাদিক শাশ্বত, সিয়া ও বিজয় কুমারের অভিযোগ, পরিচয়পত্র দেখানোর পরও তাঁদের জোর করে বাসে তোলা হয়। প্রায় ৪৫ মিনিট পর ছত্রসাল স্টেডিয়ামের কাছে তাঁদের নামিয়ে দেওয়া হয়।

বিক্ষোভস্থল থেকে দূরে নেওয়ার অভিযোগ

গত ২ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ১০ অক্টোবর আরও তীব্র হয়। বিক্ষোভকারীরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছিলেন। তবে ১০ অক্টোবর যন্তর-মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি দিল্লি পুলিশ। এ ছাড়া দিল্লিতে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি ছিল।

বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮ থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত দিল্লি পুলিশকে সহায়তা করতে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ২২১ কোম্পানি, অর্থাৎ প্রায় ২৩ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। পাশাপাশি দিল্লি পুলিশের অন্তত ১৫ হাজার সদস্য দায়িত্ব পালন করেন বলে সিপিজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আটক ব্যক্তিদের বাওয়ানা, মুন্ডকা, বুরারি ও নারেলার মতো দূরবর্তী এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে তাঁদের পরিবার ও সহকর্মীদের পক্ষে অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

দিল্লি পুলিশের যুগ্ম কমিশনার নূপুর প্রসাদ এর আগে বলেছিলেন, জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেছিলেন তিনি।

শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের আটক নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ

১১ অক্টোবর ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ করেন, শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের বেআইনিভাবে আটক করা যায় না। কাউকে আটক করার ক্ষেত্রে আইননির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে বলেও আদালত উল্লেখ করেন।

আটকের পর শারীরিক ও মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছেন অনেক বিক্ষোভকারী। তবে তাঁদের কেউ কেউ আবারও আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। অন্যদিকে, পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা মারধর ও হেনস্তার অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত দিল্লি পুলিশের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে বিবিসি বাংলা।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles