
কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফিরতে সাধারণত ৯ থেকে ১১ ঘণ্টা সময় লাগে। এ পথে যাত্রীদের বেশির ভাগই রাতের বাসে রওনা হন, যাতে ভোরে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। কিন্তু কুমিল্লার ১৫ বছর বয়সী স্কুলশিক্ষার্থী জান্নাতুন তাজমীন কেন দুপুরে বাসে উঠেছিলেন, আর কেন তাঁকে মাঝরাতে কুমিল্লায় পৌঁছাতে হয়েছিল—এ প্রশ্ন ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা।
তাজমীনের যাত্রার সময় নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরাও। কক্সবাজার আইকনিক বাসের টিকিট কাউন্টারের কর্মী আবদুল্লাহ গণমাধ্যমকে জানান, তাজমীন ও তাঁর সঙ্গে থাকা রাজু চৌধুরী ৬ অক্টোবর রাতে টিকিট কাটতে আসেন। তাঁরা পরদিন বুধবার দুপুর ১২টার টিকিট কেনেন। বাসটি কক্সবাজার ছাড়ে দুপুর ১টার দিকে।
কাউন্টারের ওই কর্মীর ভাষ্য, দিনে রওনা হলে কুমিল্লায় পৌঁছাতে রাত হয়ে যাবে—এ বিষয়টি যাত্রীদের বোঝা উচিত ছিল। তবে যাত্রীর পছন্দের বিষয় থাকায় তিনি জোর দিয়ে কিছু বলেননি বলে জানান।
তাজমীনের একক আসনের টিকিট কাটেন তাঁর পরিচিত রিয়াজ উদ্দিন রাজু ওরফে রাজু চৌধুরী (২০)। এক কিশোরী রাতের বেলায় অপরিচিত শহরে পৌঁছাবেন—এমন পরিস্থিতিতে যাত্রার সময় ও নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাড়ি ফেরার তাগিদ
রাজুর দাবি, কক্সবাজারে অবস্থানকালে তাজমীনের বাবা তাঁকে একাধিকবার ফোন করে বাড়ি ফিরে আসতে বলেন। তাজমীনকে বাবার সঙ্গে কথা বলতে শুনেছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। এরপর দ্রুত বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁরা বাসের টিকিট কাটেন।
রাজু আরও দাবি করেন, তাজমীনকে নিরাপদে কুমিল্লার বাসায় পৌঁছাতে তিনি হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ রাখছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ওই কিশোরী।
রাজুর ভাষ্য অনুযায়ী, হাতঘড়ি নিয়ে মায়ের সঙ্গে ঝগড়ার পর বাড়ি ছেড়েছিলেন তাজমীন। তিনি রাজুকে জানিয়েছিলেন, তাঁর মা মারা গেছেন এবং বাড়িতে থাকা নারী তাঁর সৎমা। পরে এক বান্ধবীর বাসায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যান তাজমীন। সেখান থেকে কুমিল্লায় ফিরে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় থাকাকালেই রাজুর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ শুরু হয়।
পরিবারের উদ্বেগ ছিল আগে থেকেই
পরিবারের দাবি, ঘটনার কয়েক দিন আগে ৪ অক্টোবর বাসা থেকে বেরিয়ে যান তাজমীন। এরপর তিনি কোথায় ছিলেন, কার সঙ্গে ছিলেন—তা নিশ্চিতভাবে জানতে পারেনি পরিবার। যদিও মোবাইল ফোনে যোগাযোগ ছিল, তাঁর অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছিল না স্বজনদের।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, পরিবারের বারবার ফোন এবং বাড়ি ফিরে আসার তাগিদে তাজমীন দ্রুত ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারেন। তবে কী পরিস্থিতিতে তিনি যাত্রার সময় বেছে নিয়েছিলেন, তা নিশ্চিত হতে তদন্ত চলছে।
তাজমীনের মা কেয়া খাতুন জানান, ঘটনার দিন বুধবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। তখন তাজমীন জানিয়েছিলেন, তিনি এক বান্ধবীর সঙ্গে আছেন। মেয়েকে নিয়ে আসতে বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার কথা বললেও তাজমীন ওই বান্ধবীর নাম ও তাঁর মা-বাবার পরিচয় জানাননি।
মায়ের ভাষ্য, মেয়ের বন্ধুবান্ধব নিয়ে আগে থেকেই তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন। কোনো অঘটনের আশঙ্কায় প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি। মেয়ের চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়ে সতর্ক থাকার চেষ্টা করেও তাঁকে রক্ষা করতে পারেননি বলে আক্ষেপ করেন তিনি।
মাঝরাতে বাস থেকে নেমে অটোরিকশায়
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে বাসে কুমিল্লায় পৌঁছান তাজমীন। এরপর শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করেন তিনি।
পরদিন ৮ অক্টোবর সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় অটোরিকশাচালক সুমন মিয়াকে (৩৫) অভিযুক্ত করে পুলিশ। পুলিশ জানায়, শনিবার রাতে তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, তাজমীনের যাত্রাপথ, তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনের ঘটনাগুলো যাচাই করা হচ্ছে। তাজমীনের পরিচিত রাজু কিংবা তাঁর কোনো বান্ধবীর সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, সে বিষয়ে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা রয়েছে।
তাজমীনের মৃত্যু ঘিরে তাই শুধু হত্যাকাণ্ডের রহস্য নয়, সামনে এসেছে আরও কিছু প্রশ্ন—কেন তিনি দুপুরে যাত্রা শুরু করেছিলেন, কেন তাঁকে মাঝরাতে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছিল এবং যাত্রাপথে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুযোগ ছিল কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে তদন্তের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।

