
রাশিয়ার সোচি শহরের ৩২ বছর বয়সী মার্গারিটা রিউট ছিলেন ভ্রমণপ্রিয়, সাহসী ও অ্যাডভেঞ্চারপিপাসু একজন নারী। প্যারাসুট থেকে লাফ দেওয়া, গো-কার্ট চালানো, ওয়াটার পোলো খেলা থেকে শুরু করে দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ানো—ছিল তার স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ। কিন্তু সেই পরিচিত জীবন থেকেই হঠাৎ করে তার নাম জড়িয়ে যায় রুশ এক নৌ কর্মকর্তাকে হত্যার অভিযোগে।
গত ১৩ আগস্ট ক্রিমিয়ার সেভাস্তোপোলে রাস্তার পাশে ডাস্টবিনে রাখা বোমার বিস্ফোরণে নিহত হন রুশ কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরের সাবমেরিন ব্রিগেডের উপ-কমান্ডার রবার্ট শাগিয়েভ। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্গারিটাকে আটক করে রুশ পুলিশ।
তদন্তকারীদের দাবি, তার কাছ থেকে একটি দূরনিয়ন্ত্রক যন্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, যা বোমা বিস্ফোরণে ব্যবহৃত হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাশিয়ার নিরাপত্তা সংস্থা এফএসবির ভাষ্য, মার্গারিটা হামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন এবং ইউক্রেনীয় গোয়েন্দাদের সঙ্গে যুক্ত একজন ব্যক্তি তাকে বিপুল পরিমাণ ক্রিপ্টোকারেন্সি ও রাশিয়া ছাড়ার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ইউক্রেনও এ ঘটনায় কোনো মন্তব্য করেনি।
শৈশবের বন্ধুদের কাছে মার্গারিটা ছিলেন নির্ভীক ও প্রাণবন্ত। তিনি গাছে উঠতেন, ঝুঁকিপূর্ণ খেলাধুলায় অংশ নিতেন এবং নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সন্ধানে ছুটে বেড়াতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় প্যারাসুটিং ক্লাবের সদস্য হন, ওয়াটার পোলো দলের গোলরক্ষক হিসেবে খেলেন এবং গো-কার্ট প্রতিযোগিতায় পুরস্কারও জেতেন।
পরে সোচিতে গিয়ে তিনি বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত হন। স্বাস্থ্য, প্রাণীর অধিকার ও পরিবেশ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখতেন। তুরস্ক, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়াতেন। পরিচিতজনদের ভাষায়, ভবিষ্যৎ নিয়ে তার অনেক পরিকল্পনা ছিল।
তবে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যায়। বন্ধুদের দাবি, যুদ্ধ নিয়ে তিনি ক্রমেই বেশি ক্ষুব্ধ ও প্রকাশ্য সমালোচক হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে রুশ সেনাবাহিনী নিয়ে মন্তব্য করার অভিযোগে তাকে জরিমানাও করা হয়। পরে নিজের বংশপরিচয় নিয়ে করা এক পোস্টে তিনি নিজেকে ‘রুশ হিসেবে লজ্জিত’ বলেও উল্লেখ করেন।
চলতি বছরের বসন্তের শেষ দিকে তার আচরণে আরও পরিবর্তন লক্ষ্য করেন ঘনিষ্ঠরা। তিনি দ্বিতীয় একটি ফোন কেনেন, বন্ধুদের সঙ্গে পরিকল্পিত ভ্রমণ বাতিল করেন এবং অনেকটা গুটিয়ে যান। পরে ক্রিমিয়ায় তার যাতায়াতও বেড়ে যায়।
তার ঘনিষ্ঠদের কেউই নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না, ঠিক কীভাবে সেই ভ্রমণপিপাসু ও প্রাণবন্ত নারী এমন একটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে জড়িয়ে পড়লেন।
তবে তার এক পুরোনো বন্ধুর ভাষায়, মার্গারিটার একটি বৈশিষ্ট্য ছিল স্পষ্ট—কোনো কিছু করার সিদ্ধান্ত নিলে শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করার প্রবল জেদ।
তবে শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার অভিযোগ সত্য কি না, নাকি ঘটনার পেছনে অন্য কোনো গল্প রয়েছে—সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।

