
কানাডার বৃহত্তম এলজিবিটিকিউ+ উদযাপনগুলোর অন্যতম বার্ষিক টরন্টো প্রাইড প্যারেড এবারও রঙ, বৈচিত্র্য এবং অন্তর্ভুক্তির বার্তায় মুখর হয়ে উঠল। রোববার শহরের কেন্দ্রজুড়ে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই বর্ণাঢ্য আয়োজনে অংশ নেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর টরন্টো প্রাইড প্যারেডে এটিই ছিল তাঁর প্রথম উপস্থিতি, যা আয়োজনে আলাদা মাত্রা যোগ করে।
সকালের দিক থেকেই টরন্টোর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ রংধনু রঙের পোশাক, পতাকা ও নানা প্রতীক নিয়ে প্যারেডে যোগ দিতে আসতে শুরু করেন। রোজডেল ভ্যালি রোড থেকে যাত্রা শুরু হওয়া শোভাযাত্রা দুপুরের দিকে ইয়ং স্ট্রিটসহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অতিক্রম করে। পুরো এলাকা উৎসবমুখর পরিবেশে পরিণত হয়, যেখানে বৈচিত্র্যের উদযাপনের পাশাপাশি সমতা ও মানবাধিকারের দাবিও সমানভাবে উচ্চারিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি টরন্টোর মেয়র অলিভিয়া চাউয়ের সঙ্গে প্যারেডে অংশ নেন। তারা পথের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের সঙ্গে করমর্দন করেন, শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং অসংখ্য দর্শনার্থীর সঙ্গে সেলফি তোলেন। উপস্থিত জনতার উচ্ছ্বাসে প্রধানমন্ত্রীও সাড়া দেন। প্যারেড চলাকালে দর্শকদের ছোড়া জলবন্দুকের পানিতে ভিজে গেলেও তিনি হাসিমুখেই উৎসবের আবহ উপভোগ করেন, যা উপস্থিত মানুষের কাছে আকর্ষণীয় মুহূর্ত হয়ে ওঠে।
প্যারেডের একটি আবেগঘন অংশ ছিল প্রাইড টরন্টোর স্বেচ্ছাসেবকদের অংশগ্রহণ। তাদের হাতে ছিল ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোর পালস নাইটক্লাবে সংঘটিত ভয়াবহ বন্দুক হামলায় নিহতদের নাম ও ছবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড। ওই হামলায় ৪৯ জন প্রাণ হারান এবং আরও ৫৩ জন আহত হন। ঘটনার দশম বার্ষিকীতে প্রাইড টরন্টো জানায়, শুধুমাত্র শোক প্রকাশ নয়, বরং নিহতদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং তাদের সংগ্রামকে সম্মান জানানোই এ বছরের অন্যতম উদ্দেশ্য।
আয়োজকদের মতে, প্রাইড শুধুমাত্র আনন্দ-উৎসব নয়; এটি এমন একটি সামাজিক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে বৈচিত্র্য, সমঅধিকার এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার বার্তা তুলে ধরা হয়। তাই এবারের প্যারেডেও উৎসবের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক সচেতনতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ক্রিস কোলেন্স জানান, সমাজে কুইয়ার সম্প্রদায়ের প্রতি গ্রহণযোগ্যতা যেভাবে বেড়েছে, তা সত্যিই আশাব্যঞ্জক। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, একসময় পরিবারের অজান্তে গোপনে প্রাইড অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হতো। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতিও বদলেছে। বর্তমানে প্রাইড শুধু একটি সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠান নয়, বরং বিভিন্ন বয়স, পেশা ও পরিচয়ের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
একই ধরনের অনুভূতির কথা জানান গ্যাব্রিয়েলে ওগচেট। তিনি এবারের প্রাইডে অংশ নেন তাঁর মা ফেলিসিয়ার সঙ্গে। ওগচেট বলেন, জন্মের পর থেকেই মা তাকে প্রতি বছর প্রাইড প্যারেডে নিয়ে আসছেন। কোভিড-১৯ মহামারির সময় ছাড়া তারা কখনও এই উৎসব মিস করেননি। তার মতে, প্রাইড তাদের পরিবারের কাছে কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং বৈচিত্র্যকে সম্মান করার এবং ভালোবাসার স্বাধীনতাকে উদযাপনের দীর্ঘদিনের পারিবারিক ঐতিহ্য।
এবারের টরন্টো প্রাইড প্যারেডে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির উপস্থিতি রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। কারণ, এটি কানাডার বহুত্ববাদ, সমতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের নীতির প্রতি সরকারের প্রকাশ্য সমর্থনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এবারের টরন্টো প্রাইড প্যারেড শুধু বর্ণিল শোভাযাত্রার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি, ইতিহাসের বেদনাকে স্মরণ, মানবাধিকারের প্রতি অঙ্গীকার এবং ভবিষ্যতের আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলার প্রত্যয়ের এক শক্তিশালী বার্তা।

