
কানাডার প্রদেশ আলবার্টা স্বাধীন হওয়ার পথে এগোতে চাইলে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক চুক্তিগুলো। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রশ্ন এখন শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং গভীর সাংবিধানিক ও আইনি সংকটে পরিণত হয়েছে। ফলে আলবার্টার বিচ্ছিন্নতা নিয়ে যে গণভোটের আলোচনা শুরু হয়েছে, তা অনিশ্চয়তার নতুন মাত্রা পেয়েছে।
আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েলে স্মিথ সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী ১৯ অক্টোবর একটি গণভোট আয়োজন করা হবে। সেখানে আলবার্টার জনগণের কাছে জানতে চাওয়া হবে তারা কানাডার অংশ হিসেবেই থাকতে চান, নাকি স্বাধীনতার লক্ষ্যে একটি “বাইন্ডিং রেফারেন্ডাম” আয়োজনের প্রক্রিয়া শুরু করতে চান। তবে স্মিথ স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ব্যালটে সরাসরি “কানাডা থেকে আলাদা হওয়া”র প্রশ্ন রাখা হবে না। কারণ, এর আগেই আদালতে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আবেদন বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।
মে মাসের শুরুতে আলবার্টার আদালতের বিচারপতি শায়না লিওনার্দ একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী পিটিশন খারিজ করে দেন। ওই পিটিশনে সরাসরি আলবার্টার স্বাধীনতা নিয়ে ভোটাভুটির দাবি করা হয়েছিল। বিচারপতির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আলবার্টা সরকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পরামর্শ করার সাংবিধানিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেনি। বিশেষ করে ট্রিটি ৭ এবং ট্রিটি ৮ এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির আওতাভুক্ত ফার্স্ট নেশন সম্প্রদায়ের অধিকার ও ভূমির প্রশ্ন বিচ্ছিন্নতার ফলে সরাসরি প্রভাবিত হতে পারে। এই রায়ের পর থেকেই বিষয়টি নতুন করে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের একজন অধ্যাপক বলেন, “এটি পুরোপুরি একটি নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। বিষয়টি এখন অনেক বেশি অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে।” তার মতে, আলবার্টার স্বাধীনতা প্রশ্নটি শুধুমাত্র জনগণের ভোটে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে কানাডার সংবিধান, ফেডারেল কাঠামো এবং আদিবাসী চুক্তির বৈধতা একসঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। একই ধরনের মত দিয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব অটোয়ার অধ্যাপক আন্দ্রে লেকোর্স। তিনি বলেন, “আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ পরামর্শ ছাড়া এই ধরনের সিদ্ধান্ত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।” কানাডার ফার্স্ট নেশন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে করা ঐতিহাসিক চুক্তিগুলো শুধুমাত্র প্রাদেশিক নয়, বরং ফেডারেল সাংবিধানিক কাঠামোর অংশ। ফলে আলবার্টা আলাদা হয়ে গেলে সেই চুক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ট্রিটি ৭ এবং ট্রিটি ৮ হলো উনিশ শতকের শেষদিকে কানাডা সরকার ও বিভিন্ন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাক্ষরিত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি। এসব চুক্তির মাধ্যমে আদিবাসীদের ভূমি, শিকার, সংস্কৃতি এবং স্বায়ত্তশাসনের নির্দিষ্ট অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আলবার্টা যদি কানাডা থেকে আলাদা হওয়ার পথে এগোয়, তাহলে এই চুক্তিগুলোর আইনি অবস্থান কী হবে, তা স্পষ্ট নয়। কারণ, এসব চুক্তি সরাসরি কানাডিয়ান ক্রাউনের সঙ্গে সম্পাদিত হয়েছিল আলবার্টা প্রাদেশিক সরকারের সঙ্গে নয়। ফলে বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে ফার্স্ট নেশন সম্প্রদায়গুলো আলাদা রাজনৈতিক অবস্থান নিতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রিমিয়ার ড্যানিয়েলে স্মিথ অবশ্য আদালতের এই অবস্থানের সঙ্গে একমত নন। তার দাবি, আদিবাসীদের সঙ্গে পরামর্শের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা সাধারণত পাইপলাইন বা বড় অবকাঠামো প্রকল্পের মতো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়। তিনি জানিয়েছেন, আলবার্টা সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট অব কানাডায় আপিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। স্মিথের মতে, গণতান্ত্রিকভাবে জনগণের মতামত জানার অধিকারকে আদালতের মাধ্যমে সীমিত করা উচিত নয়। তবে বিরোধীরা বলছেন, স্বাধীনতার মতো সংবেদনশীল প্রশ্নে শুধু রাজনৈতিক আবেগ নয়, সাংবিধানিক বাস্তবতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আলবার্টার স্বাধীনতা প্রশ্ন এখন আর শুধুমাত্র প্রাদেশিক রাজনীতির ইস্যু নয়। এটি কানাডার ফেডারেল কাঠামো, আদিবাসী অধিকার এবং সংবিধান সবকিছুর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে অক্টোবরের গণভোট রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, তার ফল বাস্তবে কার্যকর করতে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মুখে পড়তে হতে পারে। বিশেষ করে ফার্স্ট নেশন সম্প্রদায়ের অবস্থান ভবিষ্যতের পুরো প্রক্রিয়াকে নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ফলে আলবার্টার বিচ্ছিন্নতা বিতর্ক এখন শুধু “হ্যাঁ” বা “না”-এর প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি কানাডার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভবিষ্যৎ নিয়ে এক জটিল সাংবিধানিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

