
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরকে সামনে রেখে নতুন এক উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে কানাডা। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করতে যাচ্ছে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো। এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে কানাডা সরকার শুধু অবকাঠামোগত প্রস্তুতিই নয়, বরং দেশের ফুটবল সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেছে।
রোববার অটোয়ায় অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্টিনো-কে স্বাগত জানান কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। এ সময় বিশ্বকাপ ট্রফিকেও আনুষ্ঠানিকভাবে অভ্যর্থনা জানানো হয়। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে এটি বিশেষ মর্যাদার বিষয়, কারণ সাধারণত বিশ্বকাপজয়ী দেশ বা কিংবদন্তি ফুটবলাররাই প্রথম এই ট্রফিকে স্বাগত জানানোর সুযোগ পান। ফলে কার্নি এই সম্মান পাওয়ায় বিষয়টি কানাডার জন্য প্রতীকী গুরুত্ব বহন করছে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী কার্নি কানাডায় ফুটবলের উত্থানের ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৮৬ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার পর থেকেই কানাডায় ফুটবলের জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে বেড়েছে। তবে গত এক দশকে সেই অগ্রগতি আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
কার্নি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন টোকিও অলিম্পিকে কানাডার নারী ফুটবল দলের স্বর্ণজয়ের কথা। তার মতে, এই অর্জন শুধু একটি পদক জয় নয়, বরং দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতির পরিবর্তনের প্রতীক। তিনি বলেন, কানাডার নারী ফুটবল দল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে এবং অধিনায়ক ক্রিস্টিন সিনক্লেয়ার সর্বকালের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক গোলদাতার রেকর্ড গড়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। এখনও সেই রেকর্ড তার দখলেই রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, পুরুষ ফুটবল দলও নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘ ৩৬ বছর পর কাতার বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়া কানাডার জন্য ছিল বড় সাফল্য। তার মতে, এসব অর্জন প্রমাণ করে যে দেশটির ফুটবল কাঠামো এখন আন্তর্জাতিক মানের দিকে এগোচ্ছে।
বিশ্বকাপ আয়োজনকে সামনে রেখে সরকার আগামী পাঁচ বছরে ফুটবল উন্নয়নে ৭৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এই বিপুল অর্থের মধ্যে প্রায় ৬৬ কোটি ডলার ব্যয় করা হবে স্থানীয় ক্রীড়া সংস্থা ও তৃণমূল পর্যায়ের শিশু-কিশোর ফুটবল কর্মসূচির জন্য। অর্থাৎ, কানাডা শুধু বিশ্বকাপ আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শক্তিশালী ফুটবল ভিত্তি গড়ে তুলতে চায়।
কার্নি জানান, পাঁচ বছর পরও এই সহায়তা বন্ধ হবে না। স্থানীয় ফুটবল অবকাঠামো আধুনিকায়ন এবং যুব উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য প্রতি বছর আরও ১১ কোটি ৮০ লাখ ডলার বরাদ্দ রাখা হবে।
এই বিনিয়োগ শুধু খেলাধুলার উন্নয়ন নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বকাপ আয়োজনের মাধ্যমে পর্যটন, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং সব ক্ষেত্রেই কানাডা লাভবান হতে পারে। বিশেষ করে তরুণদের খেলাধুলায় সম্পৃক্ততা বাড়লে সামাজিক ইতিবাচক প্রভাবও বাড়বে।
অন্যদিকে, ফিফা প্রেসিডেন্ট ইনফান্টিনোও কানাডার প্রস্তুতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, উত্তর আমেরিকার তিন দেশকে নিয়ে বিশ্বকাপ আয়োজন করা ফুটবলের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় তৈরি করবে। তার ভাষায়, কানাডা বিশ্বকে দেখাতে প্রস্তুত যে তারা শুধু আয়োজক নয়, বরং ফুটবলপ্রেমী এক আধুনিক জাতি।
ইনফান্টিনো কানাডাবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিশ্বকাপ চলাকালে যেন প্রতিটি জানালায় কানাডার পতাকা উড়তে দেখা যায়। এতে বিশ্ব বুঝতে পারবে যে পুরো দেশই এই আয়োজনকে নিজেদের উৎসবে পরিণত করেছে।
২০২৬ বিশ্বকাপে কানাডার প্রথম ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে ১২ জুন টরন্টোতে। প্রতিপক্ষ হিসেবে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও পূর্ণাঙ্গ সূচি ও চূড়ান্ত গ্রুপ বিন্যাস নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি রয়েছে।
২০২৬ বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে কানাডা শুধু একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে না; বরং নিজেদেরকে ভবিষ্যতের শক্তিশালী ফুটবল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেও এগোচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির ঘোষণাগুলো সেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারই স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করছে।

