
কানাডার জ্বালানি নীতি কে নির্ধারণ করছেন এই প্রশ্ন এখন অটোয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকের ধারণা ছিল, পরিবেশ ও জলবায়ু ইস্যুতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকা সাবেক পরিবেশমন্ত্রী স্টিভেন গিলবো সরকারের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখবেন। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিচ্ছে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নিজেই কানাডার জ্বালানি কৌশলের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছেন।
কার্নি ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি কানাডাকে প্রথাগত ও পরিচ্ছন্ন উভয় ধরনের জ্বালানির ক্ষেত্রে “সুপারপাওয়ার” হিসেবে গড়ে তুলতে চান। তার এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, শিল্পখাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বিশ্ববাজারে কানাডার জ্বালানি সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করা। তবে এই পরিকল্পনার গতি ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে লিবারেল পার্টির ভেতরেই বিরোধের সুর জোরালো হচ্ছে।
সম্প্রতি গিলবো প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, বড় অবকাঠামো প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার ক্ষেত্রে কার্নির পরিকল্পনা সাবেক কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপারের নীতির চেয়েও কঠোর ও পরিবেশবিরোধী হতে পারে। একজন ক্ষমতাসীন লিবারেল প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে একই দলের একজন এমপির এমন প্রকাশ্য সমালোচনা কানাডার রাজনীতিতে অস্বাভাবিক বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
গিলবোর অবস্থান নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কঠোর পরিবেশনীতি, তেল ও গ্যাস খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানোর পক্ষে সোচ্চার। তার দৃষ্টিভঙ্গি কানাডার বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন ও কর্মীদের অবস্থানের সঙ্গেও মিলে যায়। এই গোষ্ঠীগুলোর অনেকেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর আমলে সরকারি নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পেয়েছিল।
ট্রুডো সরকারের সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে এনজিও ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোকে ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। সমালোচকদের অভিযোগ, সরকারের অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তব অর্থনৈতিক প্রয়োজনের তুলনায় আদর্শিক অবস্থানের দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়েছিল। এমনকি কিছু সংগঠনকে সরকারি অর্থায়নও দেওয়া হয়, যারা পরবর্তীতে তেল ও গ্যাস শিল্পের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়।
কিন্তু কার্নির নেতৃত্বে লিবারেল সরকারের অবস্থান এখন ভিন্ন পথে এগোচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কানাডার অর্থনীতি বর্তমানে বিনিয়োগ সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার চাপে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শিল্পখাতকে দ্রুত সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক গতি ফেরাতে চাইছে সরকার। আর সেই লক্ষ্য পূরণে জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে দ্রুত অনুমোদন এবং নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই মূল দ্বন্দ্ব। কারণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে গেলে শিল্প উৎপাদন বাড়বে, নতুন পাইপলাইন, খনিজ প্রকল্প ও জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণ হবে যার ফলে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণও বাড়তে পারে। কার্নির বর্তমান অবস্থান তার অতীতের বক্তব্যের সঙ্গে কিছুটা সাংঘর্ষিক বলেই মনে করছেন অনেকে। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি আন্তর্জাতিক জলবায়ু উদ্যোগ এবং টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তরের জোরালো সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
তবে কার্নি এখন বাস্তব অর্থনৈতিক চাপকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে। তার ঘনিষ্ঠ মহলের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে কানাডার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে না পারলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়বে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ যখন জ্বালানি নিরাপত্তা ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে নতুন কৌশল নিচ্ছে, তখন কানাডাকেও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে থাকতে হবে।
অন্যদিকে পরিবেশবাদীরা আশঙ্কা করছেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে সরকার জলবায়ু প্রতিশ্রুতি থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে। তাদের মতে, অবকাঠামো প্রকল্প অনুমোদন সহজ করা হলে পরিবেশগত মূল্যায়নের মান দুর্বল হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু সংকট আরও তীব্র হবে।
ফলে কার্নির সরকার এখন এক কঠিন রাজনৈতিক ভারসাম্যের মুখোমুখি। একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের চাপ, অন্যদিকে জলবায়ু আন্দোলন ও পরিবেশবাদী গোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান প্রতিরোধ। আগামী মাসগুলোতে কানাডার জ্বালানি নীতির ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে এই সংঘাত সরকার কীভাবে সামাল দেয় তার ওপর।

