
নিজের জন্য একটি জোড়া বিলাসবহুল জুতা কেনার ঘটনাই সান্দ্রা ডেমোনটিনির জীবনে বড় এক বাস্তবতার দরজা খুলে দেয়। জুতা জোড়া বাড়িতে এনে তিনি ছিলেন দারুণ উৎফুল্ল। তিন সন্তানের এই মা তখনো বুঝতে পারেননি, তার স্মৃতিতে নীরবে বাসা বাঁধছে এক ভয়ংকর রোগ।
সান্দ্রা ডেমোনটিনি জানান, জুতাগুলো দেখে তার মনে হয়েছিল এগুলো খুবই প্রয়োজনীয় এবং তিনি সেগুলো কিনে বেশ খুশি ছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই তার মনে সন্দেহ জাগে। তিনি সন্তানদের জিজ্ঞেস করেন, বুটগুলো কে কিনেছে। “আমি আগে কখনো এগুলো দেখিনি,” বলেন তিনি। সন্তানরা তাকে জানায়, জুতাগুলো তিনিই কিনেছেন এবং এগুলো তার খুবই পছন্দের।
বুটে পা গলানোর পরই তিনি উপলব্ধি করেন, সেগুলো কেনার কোনো স্মৃতিই তার নেই। সেই মুহূর্তটি ছিল তার জীবনের মোড় ঘোরানো সময়। “আমি তখনই কাঁদতে শুরু করি,” বলেন ডেমোনটিনি।
এই ঘটনার পর তিনি চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হন। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, তিনি আলঝেইমারে আক্রান্ত। রোগটি তখন খুবই প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। বিষয়টি তার জন্য আরও যন্ত্রণাদায়ক ছিল, কারণ তার বাবা বহু বছর ধরে একই রোগে ভুগেছিলেন।
ঘটনাটি ঘটে ২০১৮ সালে। বর্তমানে সান্দ্রা ডেমোনটিনির বয়স ৪৬ বছর। তিনি কানাডার কুইবেক প্রদেশের লিভাইসে একটি অ্যাসিস্টেড-লিভিং ফ্যাসিলিটিতে বসবাস করছেন। যদিও তিনি এখনো অনেকটাই স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করেন, তবে ধীরে ধীরে তার স্বল্পমেয়াদী স্মৃতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। সময় ব্যবস্থাপনায় তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে এবং একই কথা বারবার বলার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
নিজের এই পরিবর্তন তিনি অনেক সময় সরাসরি টের পান না। “আমি নিজে বুঝতে পারি না। কিন্তু যাদের সঙ্গে কথা বলি, তাদের মুখের অভিব্যক্তিতে সেটা দেখতে পাই,” বলেন তিনি।
এই বাস্তবতার মধ্যেই ২০২৫ সালের শুরুতে সান্দ্রা ডেমোনটিনি স্বেচ্ছামৃত্যুর জন্য আগাম আবেদন করেন। তিনি আবেদনের বিস্তারিত প্রকাশ করতে চাননি। তবে তিনি জানিয়েছেন, এর পেছনে বড় কারণ হলো একদিন হয়তো তিনি নিজের সন্তানদেরও চিনতে পারবেন না এই ভয়। “এটা খুব দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়া। এতে আছে দীর্ঘ চিন্তা, অনেক কান্না আর বিপুল ভয়,” বলেন তিনি।
বর্তমান কানাডীয় আইন অনুযায়ী, ‘মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ইন ডাইয়িং’ ব্যবস্থায় আগাম অনুরোধ করার সুযোগ নেই। বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে রোগীকে লিখিতভাবে চিকিৎসা সহায়তায় মৃত্যুর আবেদন করতে হয়, এবং তা করতে হয় রোগীর সম্মতি দেওয়ার সামর্থ্য সম্পূর্ণভাবে হারানোর আগেই।
সান্দ্রা ডেমোনটিনির গল্প শুধু একজন ব্যক্তির নয়, এটি আলঝেইমারের মতো জটিল ও নিষ্ঠুর রোগের সঙ্গে লড়াই করা অসংখ্য মানুষের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। স্মৃতি হারানোর ভয়, আত্মপরিচয় হারানোর আশঙ্কা এবং মর্যাদার সঙ্গে জীবন শেষ করার আকাঙ্ক্ষা এই তিনের টানাপোড়েনেই এগোচ্ছে তার জীবন।

