
যুক্তরাষ্ট্রে ‘ডি মিনিমিস এক্সেম্পশন’ বা শুল্কমুক্ত চালান প্রবেশের সুযোগ ২৯ আগস্ট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরিত নতুন নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে দশকের পর দশক ধরে প্রচলিত এই বাণিজ্যিক সুবিধার অবসান ঘটানো হয়েছে। ফলে কানাডার অসংখ্য ছোট ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখন নতুন আর্থিক সংকটে পড়েছে।
ডি মিনিমিস অব্যাহতি ছিল এমন একটি বিধান, যার আওতায় ৮০০ মার্কিন ডলারের নিচে মূল্যের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠালে কোনো শুল্ক দিতে হতো না। ফলে কানাডাসহ বিশ্বের নানা দেশের ছোট ব্যবসায়ীরা সহজে এবং কম খরচে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বাজারে নিজেদের পণ্য পাঠাতে পারতেন।
নতুন আদেশ অনুযায়ী, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা প্রতিটি পণ্যেই প্রযোজ্য শুল্ক দিতে হবে, তা যত ছোট বা সস্তা পণ্যই হোক না কেন। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত “দেশীয় উৎপাদন ও শ্রমবাজারকে সুরক্ষিত” রাখার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
কানাডার ই-কমার্স ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বলছেন, এই পরিবর্তন তাদের জন্য এক প্রকার “অর্থনৈতিক ধাক্কা”। জোয়ে ওয়ালশ, কানাডিয়ান ই-কমার্স কোম্পানি হকি স্টিক ম্যান-এর প্রতিষ্ঠাতা বলেন, “ই-কমার্স ব্যবসার জন্য ডি মিনিমিস অব্যাহতি ছিল সবকিছু। এখন সেই সুযোগ চলে যাওয়ায় আমরা কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে টিকে থাকার জন্য লড়াই করতে যাচ্ছি।”
তিনি আরও জানান, এতদিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো খুব সহজে পণ্য পাঠাতে পারত, এখন প্রতিটি চালানের জন্য পূর্ণ কাস্টমস ডকুমেন্টেশন ও শুল্ক পরিশোধের বাধ্যবাধকতা আসছে, যা তাদের খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আইনজীবী জন বসকারিয়াল, ম্যাকার্থি-টেট্রল্ট আইন সংস্থার পার্টনার, বলেন “ডি মিনিমিস অব্যাহতির সুবিধা ছিল, আপনি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বিভাগে বিস্তারিত ঘোষণা বা তথ্য আগেভাগে জমা না দিয়েও ছোট চালান পাঠাতে পারতেন। এখন সেই সুবিধা বাতিল হওয়ায় প্রতিটি রপ্তানির জন্য আনুষ্ঠানিক কাস্টমস প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।” তিনি আরও যোগ করেন, এই পরিবর্তন কানাডার ছোট ব্যবসাগুলোর জন্য বড় ধরনের প্রশাসনিক ও আর্থিক চাপ তৈরি করবে, বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য বিক্রি করত।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপ উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য সম্পর্কের ওপর নতুন উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্য দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর ভিত্তি করে চলছে। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই দেশের মধ্যে শুল্কনীতি ও বাণিজ্য ভারসাম্য নিয়ে উত্তেজনা বাড়ছে।
ডি মিনিমিস অব্যাহতি বাতিলের ফলে শুধু কানাডাই নয়, মেক্সিকো ও অন্যান্য দেশ থেকেও যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। এতে মার্কিন ভোক্তারাও প্রভাবিত হবেন, কারণ ছোট আকারের অনলাইন কেনাকাটায় পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই নীতিতে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দেশীয় উৎপাদকরা কিছুটা সুবিধা পেতে পারে, কারণ বিদেশি সস্তা পণ্যের প্রবেশ ব্যাহত হবে। তবে এর বিপরীতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সীমান্তবর্তী ছোট ব্যবসা ও অনলাইন রিটেইলাররা, যাদের জন্য এই সুবিধা ছিল আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সহজতম পথ।
কানাডিয়ান ফেডারেশন অব ইন্ডিপেনডেন্ট বিজনেস (CFIB)-এর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ডি মিনিমিস অব্যাহতি তুলে নেওয়ার ফলে হাজার হাজার ছোট ব্যবসা সীমান্তের ওপারে বিক্রয় কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে।”
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন সিদ্ধান্ত শুধু এক প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি উত্তর আমেরিকার বাণিজ্যিক ভারসাম্যে একটি বড় ধাক্কা। এখন দেখার বিষয় কানাডা সরকার কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক কোন পথে এগোয়।

