
পার্লামেন্ট হিলে শরতের অধিবেশন শুরুর আগে এক অনন্য উপায়ে উপস্থিত হলেন কানাডার কনজার্ভেটিভ পার্টির নেতা পিয়েরে পয়লিয়েভর। অধিকাংশ সংসদ সদস্য ও ককাস সদস্যরা যখন সরাসরি পথে রাজধানীতে পৌঁছান, তখন পয়লিয়েভর বেছে নেন পূর্ব আলবার্টা হয়ে বিকল্প একটি পথ। এই প্রতীকী পদক্ষেপের মধ্য দিয়েই তিনি যেন বার্তা দিলেন রাজনীতির মূলধারার বাইরে থেকেও জনগণের পাশে দাঁড়ানোর দৃঢ় অঙ্গীকার তার।
সোমবার সকালে হাউস অব কমন্সে শরৎকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে কনজার্ভেটিভ এমপি ও সেনেটরদের সঙ্গে বৈঠক করেন পয়লিয়েভর। সেখানে দলের অভ্যন্তরীণ কৌশল ও জাতীয় ইস্যু নিয়ে তিনি এক প্রেরণাদায়ী বক্তৃতা দেন। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি বলেন, “আপনারা সবাই যখন সরাসরি পথে এখানে এসেছেন, আমাকে আসতে হয়েছে ইস্টার্ন আলবার্টার মধ্য দিয়ে। তবে পার্লামেন্ট হিলে ফিরে কানাডিয়ানদের জন্য কাজ করতে পারাটা সত্যিই দারুণ অনুভূতি।”
তিনি জানান, কনজার্ভেটিভ পার্টির মূল লক্ষ্য হলো নির্বাচনে লিবারেলদের জয় সত্ত্বেও দেশজুড়ে যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট দেখা দিয়েছে, তার বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করা।
পয়লিয়েভরের মতে, কানাডিয়ানদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, আবাসন সংকট, কর্মসংস্থান, বাণিজ্য বাধা ও অভিবাসন নীতি। “এই সমস্যাগুলোর সমাধান চান সব কানাডিয়ানরা তারা আমাদের ভোট দিন বা লিবারেলদের। লিবারেলরা অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু তার বাস্তব ফল জনগণ দেখছে না,” বলেন তিনি।
কনজার্ভেটিভ নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি দেশকে জি৭ গোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা উল্টো।
“তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন উন্নতির, অথচ উপহার দিয়েছেন জি৭-এর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত সংকুচিত অর্থনীতি, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেকারত্ব, সর্বাধিক পারিবারিক ঋণ ও ভয়াবহ আবাসন মূল্যবৃদ্ধি,” অভিযোগ করেন পয়লিয়েভর।
তিনি আরও বলেন, “কানাডিয়ানরা এমন ব্যর্থ নেতৃত্বের জন্য ভোট দেয়নি।” পয়লিয়েভর প্রধানমন্ত্রী কার্নির জুন মাসের প্রতিশ্রুতির কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। সে সময় কার্নি বলেছিলেন, জনগণ তাকে মূল্যায়ন করবে গ্রোসারি পণ্যের মূল্যস্ফীতির ভিত্তিতে।
কনজার্ভেটিভ নেতা পাল্টা মন্তব্য করেন “খাবারের দাম তো কমেনি-ই, বরং ছয় মাস আগের তুলনায় দ্রুত গতিতে বাড়ছে। কার্নি বলেছিলেন ‘নির্মাণ করো, এগিয়ে যাও’, কিন্তু এখন সেটি দাঁড়িয়েছে ‘ঠেকাও বন্ধু ঠেকাও’ অর্থনৈতিক স্থবিরতার প্রতীক হয়ে।”
পয়লিয়েভর আরও উল্লেখ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রতিশ্রুত বাণিজ্য চুক্তির কথাও। কার্নি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ২১ জুলাইয়ের মধ্যে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হবে। কিন্তু সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি চলে এলেও কোনো বাস্তব চুক্তি হয়নি।
“বরং এখন কানাডাকে আগের চেয়েও বেশি শুল্কের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যা কার্নির নেতৃত্বের দুর্বলতা প্রকাশ করছে,” বলেন পয়লিয়েভর।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পয়লিয়েভরের এই বক্তব্য কেবল সংসদীয় অধিবেশনের প্রস্তুতি নয়, বরং এটি লিবারেল সরকারের বিরুদ্ধে আগাম নির্বাচনী প্রচারণার অংশ। তিনি ক্রমাগতভাবে কার্নি সরকারের অর্থনৈতিক নীতিকে ব্যর্থ বলে তুলে ধরছেন এবং জনগণের হতাশাকে মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।
তার ‘বিকল্প পথে’ পার্লামেন্টে আগমনও অনেকের কাছে প্রতীকী যেন বোঝাতে চান, তিনি প্রচলিত রাজনীতির বাইরে গিয়ে বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে চান।
পয়লিয়েভরের সোমবারের বক্তব্যে স্পষ্ট তিনি এখন পূর্ণমাত্রায় লিবারেল সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরে কনজার্ভেটিভ পার্টিকে “বাস্তব পরিবর্তনের বিকল্প শক্তি” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, আবাসন সংকট এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে তার এই ভাষণ কানাডার রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
আগামী মাসগুলোতে পার্লামেন্ট হিলের বিতর্কে পয়লিয়েভরের এই আক্রমণাত্মক অবস্থান যে আরও তীব্র হবে, তা সহজেই অনুমেয়।

