
আমরা বাপ-বেটি বাসা থেকে বের হয়ে শপিং মলের দিকে রওনা দেই। মেয়েটা অনলাইনে জুতো অর্ডার করেছিল; কিন্তু আসার পর পরে দেখে বড় হচ্ছে। ওটা ফেরত দিয়ে আরেকটা কিনবে স্টোর থেকে। অনলাইনে অনেক ভ্যারাইটি পাওয়া গেলেও ইন-স্টোরে কম।
আমার সাথে বাইরে বেরোতে পারলে সে খুশিতে আটখানা। সারাক্ষণ গল্পে মেতে থাকি। বলল, বাবা আই লাভ ইউ
– লাভ ইউ ঠু! মা রে, আমরা যদি বাংলাদেশে থাকতাম, তখন কেমন থাকতাম?
– কেন বাবা?
– হয়তো অনেক স্ট্রাগল করতে হতো, হয়তো তোকেও
– সবাই কি বাংলাদেশে স্ট্রাগল করে?
– না, অনেকে আবার খুব ভালো থাকে।
হঠাৎ সে প্রসংগ পাল্টিয়ে বলল, দেখো বানি [খরগোশ]!
আমি স্টিয়ারিং থেকে চোখ সরিয়ে পাশের ঝোপে খরগোশ খুঁজতে ঘাকি। সে হেসে ফেলে বলল, ঠকালাম বাবা.. হি হি!
– আরে, দেখ সত্যি সত্যি ওখানে বানি। ঐ দেখ!
এবার সে খুঁজতে থাকে।
আমি হেসে বললাম- ধুর, বোগাস.. জোক করলাম..
– বাবা!
আমরা ছোটখাটো ফান করি। কান্ট্রি সাইডে গিয়ে গরু দেখিয়ে বলি, দেখ দেখ হরিণ! তবে এখন আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল; এভাবে তাকে উল্টা ঠকানো ঠিক হয়নি। বাবারা মেয়েদের কাছে হারতে পছন্দ করে, জিততে নয়।
.
আরবান প্ল্যানেট দোকানটায় টিনএজ মেয়েদের খুব আনাগোনা। জামাকাপড়ের দোকান হলেও এদের ম্যাজিক আছে; তা না হলে শুধু স্কুলের মেয়েরা এখানে কেন?
সে জুতা পছন্দ করলো; তবে আট নাম্বার তার কিছুটা বড় হচ্ছে, আবার সাত নাম্বার কিছুটা ছোট। সাড়ে সাত নেই।গবেষণা করে সাত নাম্বারেরটা নিয়ে বিজ্ঞের মতো বলল, এ বছরটা পরা যাবে..
আমরা ক্যাশ কাউন্টারে অনলাইনেরটা ফেরত দিয়ে নতুনটা দিতে অনুরোধ করি। ক্যাশিয়ারের ক্ষমতা সীমিত, সে এনাউন্সমেন্ট করে ম্যানেজারকে ডাকতে থাকে।
– ঐ যে, খুব চলতেছে, লুলাবাবু না কী যেন?
– বাবা আস্তে, এখানে এসব জোরে বলো না তো প্লিজ! আমি কি বেবি?
ম্যানেজার, ক্যাশিয়ার সবাই টিন এজার, সবাই মার্জিত পোষাকে সুন্দর সেজে আছে। কর্মীরা সবাই কী ব্ল্যাক?
.
বৃষ্টিতে আটকা পড়ে যাই। কিছুটা কমে আসতেই দৌড়ে গাড়িতে উঠি। মেয়েটার চোখে মুখে কতো আনন্দ! ইচ্ছে হয় বারবার তাকিয়ে শুধু দেখি..
.
পেট্রোল পাম্প থেকে ফুয়েল নিয়ে বের হতেই দখিনা বলল, বাবা তুমি কি টু হুইলে, না ফোর হুইলে চালাচ্ছো?
– ফোর হুইলে
– ভালো করছো, বৃষ্টিতে রাস্তা পিছলা। জানো বাবা, আমার কাছে গাড়ি জিনিসটা এমেইজিং লাগে, কীভাবে যে ইন্জিন কাজ করে! [সে জানে ইঞ্জিন, টেকনোলজী নিয়ে আলাপ আমার পছন্দ]
– স্কুলে ফিজিক্স ক্লাসে যখন ইঞ্জিন এর ছবি দিয়ে বর্ণনা থাকতো, আমি খুব আগ্রহ নিয়ে শুনতাম, বুঝতাম। অনেকে আমার কাছে বুঝে নিতো। একটা মজার ব্যাপার কি জানিস, তুই যদি কোনো কিছুতে ইন্টারেস্টেড হোস, তখন সেটা ভালো বুঝবি
– বাবা, একদম ঠিক; আমি যখন কোনো ম্যাথে ইন্টারেস্টেড হই, তখন ভালো বুঝি, ইন্টারেস্ট না হলে কিছুই বুঝি না
– মনে রাখবি, সবার মেধা সমান, কেউ কারো থেকে বেশি বা কম না। সব মানুষই ডিফারেন্ট। কারো কোনো সাবজেক্ট ভালো নাও লাগতে পারে। তাছাড়া মনোযোগী না হবার পেছনে অনেক কারন থাকে। নিজেকে কখনও এক্সেপশনাল ভাববি না, অহংকার করবি না
– করি না বাবা
– গুড! একটা দূ:খজনক ঘটনা বলি। জেলা স্কুলে কিছু ফ্রেন্ড কখনো পড়া করে আসতো না, খালি মার খেতো। ওরা কেন পড়া করতে পারতো না জানিস?
– কেন বাবা?
– ওরা কাজ করতো যে? তোর বয়স থেকেই কেউ দোকানে, কেউ লেদ মেশিনে কাজ করে খাবার যোগাতো। তাদের বাবা/মা কেউ ছিল কিনা তাও কেউ জানতো না। স্যান্ডেল পড়ে ক্লাসে আসতো। হয়তো কোনোদিন না খেয়েই ক্লাসে আসতো..
– চাইল্ড লেবার!
– হা। এতো খাটাখাটুনির পরে আবার স্কুলে এসে খুব মার খেতো গরু-ছাগলের মতো!
– ইস! কিন্ত বাবা, ওগুলো তো চাইল্ড এবিউজ!
– অবশ্যই!
– তাহলে তো ওদের চাইল্ডহুড রবারী [ছিনতাই] করা হইছে!
– সত্যি তাই। শুধু টিচার না, আমরা সবাই এজন্য দায়ী। ঐ ছেলেরা মার খাবে জেনেও স্কুলে কিন্তু ঠিকই আসতো!
– কেন বাবা!
– হয়তো বাড়ি থেকেও চাপ দিতো স্কুল করতে। স্কুলে গেলে বড় হবে, ভালো চাকরি পাবে..এই আশায়। কিংবা এমনও হতে পারে কাজ করার হাত থেকে পালিয়ে মার খাওয়াও কিছুটা আরামের!
– খুব ইনহিউমেন বাবা! ওরা কিন্তু খুব সাহসী!
– কষ্টের ব্যাপার কি জানিস, ঐ বাচ্চাদেরকে স্যারেরা, আমরা কেউই হেল্প করতাম না। কখনো আলাদা করে কাছে নিয়ে কেউ জিজ্ঞেস করেনি তাদের সমস্যাটা আসলে কোথায়।
.
বাসার সামনে গাড়ি পার্ক করতে থাকি।
মেয়েটা মলিন মুখে নতুন জুতোজোড়া হাতে বাসায় ঢুকছে..।
মনের গহীনে তার কথাটা বারবার প্রতিধ্বনি হতে থাকে- “ওদের চাইল্ডহুড রবারী করা হইছে!…ওদের চাইল্ডহুড…”
অটোয়া, কানাডা

