গাছে উঠে জীবন বাঁচাল ৮ বছরের জোয়াল, তিন বছর নয়—কয়েক দিন পরই মায়ের কোলে

গাছে উঠে জীবন বাঁচাল ৮ বছরের জোয়াল, তিন বছর নয়—কয়েক দিন পরই মায়ের কোলে - the Bengali Times
হাসপাতালে মা মাতি মায়া তামাংয়ের সঙ্গে কথা বলছেন ছেলে জোয়াল ঘাল

চারদিকে শুধু পানি, পাথর আর কাদা। চোখের সামনে ভেসে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, স্কুল ও পরিচিত জনপদ। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে জীবন বাঁচাতে জঙ্গলে ছুটে গিয়ে একটি গাছে উঠে আশ্রয় নিয়েছিল আট বছরের জোয়াল ঘালে। এরপর কয়েক দিন ধরে নিখোঁজ ছিল সে। শেষ পর্যন্ত উদ্ধার হয়ে শুক্রবার মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে তার। মা-ছেলের সেই পুনর্মিলনের দৃশ্য ছিল হৃদয়স্পর্শী।

নেপালের উত্তরাঞ্চলীয় রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর এই ঘটনা ঘটে। বন্যার সময় স্কুলে থাকা অবস্থায় জোয়াল ও তার ভাই নিখোঁজ হয়ে যায়। সন্তানদের খুঁজতে এক আশ্রয়কেন্দ্র থেকে আরেক আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন তাদের মা ২৮ বছর বয়সী মত্তি মায়া তামাং। একপর্যায়ে তিনি ধরে নিতে শুরু করেছিলেন, তার দুই সন্তানই হয়তো আর বেঁচে নেই।

- Advertisement -

বুধবার সকালে দুই ভাই স্কুলের গাড়িতে করে স্কুলে যায়। এদিকে বাড়িতে বসে বুননের কাজ করছিলেন তাদের মা। হঠাৎ ভূমিকম্পের মতো বিকট শব্দ শুনতে পান তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারেন, ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে এসেছে এলাকায়।

লাংটাং লিরুং পর্বতশৃঙ্গের কাছে হিমবাহের নিচের অংশ ধসে পড়ার পর বরফ ও পাথরের বিশাল ধস তৈরি হয়। শুরু হয় ব্যাপক ভূমিধস। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিস্তীর্ণ এলাকা পানি ও ধ্বংসাবশেষে তলিয়ে যায়।

তামাং বলেন, ‘আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, সবকিছু ভেসে যাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছিল, আমার সন্তানরাও হয়তো ভেসে যাচ্ছে।’

বন্যার সময় জোয়াল এক বন্ধুর সঙ্গে স্কুল থেকে দৌড়ে জঙ্গলের দিকে চলে যায়। পরে বন্যার পানি থেকে বাঁচতে একটি গাছে উঠে আশ্রয় নেয়। সেখানেই কোনোভাবে টিকে থাকে সে।

উদ্ধারের পর জোয়ালের ডান পা ভাঙা ছিল। মুখে ছিল কাটা-ছেঁড়ার দাগ। বৃহস্পতিবার নুয়াকোটের একটি হাসপাতালে তাকে দেখতে পান রয়টার্সের সাংবাদিকেরা। তখনও তার পরিবারের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

পরিবারের খোঁজ পাওয়ার আশায় জোয়ালের ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হয়। পরে সেই তথ্যের সূত্র ধরেই তার মা তামাংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়।

জোয়াল জীবিত আছে—এই খবর প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না তামাং। দীর্ঘদিনের উৎকণ্ঠা ও সন্তান হারানোর আশঙ্কার মধ্যে হঠাৎ ছেলেকে ফিরে পাওয়ার খবর যেন তার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল।

শুক্রবার অবশেষে কাঠমান্ডুর হাসপাতালে ছেলের কাছে পৌঁছান তামাং। কয়েক দিন ধরে নিখোঁজ সন্তানদের খুঁজে বেড়ানোর পর ছেলের শয্যার পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। মা-ছেলের সেই আবেগঘন পুনর্মিলনে দীর্ঘ উৎকণ্ঠার অবসান ঘটে।

তামাং জানান, জোয়ালকে খুঁজে পাওয়ার পর তিনি তার ছোট ছেলেকেও জীবিত অবস্থায় খুঁজে পান। তিনি বলেন, ‘বড় ছেলেকে খুঁজে পাওয়ার পর মনে হলো, আমার জীবনটা যেন আবার ফিরে পেলাম।’

এদিকে ভয়াবহ এই দুর্যোগে নেপালের রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলায় হাজারো শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক শিশু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তাদের শনাক্ত ও পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনে নেপাল সরকারের সঙ্গে কাজ করছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা।

ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে পুরো জনপদ যখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, তখন গাছে উঠে প্রাণ বাঁচানো জোয়ালের বেঁচে ফেরার ঘটনা যেন সেই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও এক টুকরো আশার গল্প হয়ে উঠেছে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles