
অন্টারিওর কেম্ব্রিজ শহরে একের পর এক ব্যবসায়িক চেক রহস্যজনকভাবে নির্ধারিত প্রাপকের হাতে পৌঁছানোর আগেই বিকৃত করে জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকে জমা দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। ঘটনাটি ঘিরে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে। বিষয়টি তদন্ত করছে ওয়াটারলু রিজিয়নাল পুলিশ এবং কানাডা পোস্ট। কেম্ব্রিজভিত্তিক বৈদ্যুতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লাইভ ইলেক্ট্রিক-এর প্রেসিডেন্ট ড্যান হাওয়ার্ড জানান, ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকেই তাদের প্রতিষ্ঠানের পাওনা অর্থ আসা অস্বাভাবিকভাবে কমতে শুরু করে। প্রথমদিকে বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হলেও পরে তদন্ত করে দেখা যায়, সমস্যাটি অনেক বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে।
হাওয়ার্ড বলেন, প্রতিষ্ঠানের একাধিক গ্রাহক সময়মতো চেক ডাকযোগে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেই চেকগুলো কখনও তাদের অফিসে পৌঁছায়নি। বিষয়টি নিয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর জানা যায়, চেকগুলো যথারীতি পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই সেগুলো হারিয়ে যায়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ছয় থেকে সাতটি ব্যবসায়িক চেক নিখোঁজ হয়েছে, যেগুলোর মোট অর্থের পরিমাণ ছিল অত্যন্ত বড়। কিছু চেকের মূল্য প্রায় আড়াই লাখ কানাডিয়ান ডলার পর্যন্ত ছিল। ফলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক লেনদেনেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
তদন্তের একপর্যায়ে আরও উদ্বেগজনক তথ্য সামনে আসে। শুধু লাইভ ইলেক্ট্রিকের নামে পাঠানো চেকই নয়, প্রতিষ্ঠানটি অন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশে যেসব চেক ডাকযোগে পাঠিয়েছিল, সেগুলোরও কয়েকটি গন্তব্যে পৌঁছায়নি। অর্থাৎ, সমস্যাটি একমুখী নয়; বরং ডাকব্যবস্থার মাধ্যমে আদান-প্রদান হওয়া ব্যবসায়িক চেকের নিরাপত্তা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
হাওয়ার্ড জানান, পরে তারা এমন কিছু চেকের কপি দেখতে পান, যেগুলো ব্যাংকে জমা দেওয়ার আগে স্পষ্টভাবে পরিবর্তন করা হয়েছিল। মূল প্রাপকের নাম মুছে বা বদলে অন্য নাম বসানো হয়। তার দাবি, পরিবর্তনগুলো এতটাই দৃশ্যমান ছিল যে, সাধারণ চোখেও বোঝা সম্ভব ছিল এটি আসল চেক নয়। হাতের লেখার অসামঞ্জস্য এবং নাম পরিবর্তনের চিহ্নও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল।
তার সন্দেহ, কমিউনিটি মেইলবক্সে চেক জমা দেওয়ার পরই দুর্বৃত্তরা সেগুলো বের করে নেয়। আশপাশের আরও কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে বলেও তিনি জানান। এমনকি কয়েকজন ব্যবসায়ী তাকে ভবিষ্যতে কমিউনিটি মেইলবক্স ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছেন।
এদিকে কানাডা পোস্টও নিশ্চিত করেছে যে, সংশ্লিষ্ট কমিউনিটি মেইলবক্সের তালায় কারসাজির প্রমাণ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, মেইলবক্সে অবৈধভাবে প্রবেশের ঘটনা ঘটেছে, যা এই জালিয়াতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে ওয়াটারলু রিজিয়নাল পুলিশ এবং কানাডা পোস্ট যৌথভাবে পুরো ঘটনার তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। কীভাবে চেকগুলো চুরি করা হয়েছে, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং জালিয়াতির মাধ্যমে কত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই ঘটনা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় অঙ্কের অর্থের চেক ডাকযোগে পাঠানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। সম্ভব হলে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার, ব্যাংক-টু-ব্যাংক পেমেন্ট বা ট্র্যাকযোগ্য কুরিয়ার সেবা ব্যবহার করলে এ ধরনের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
একই সঙ্গে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত ব্যাংক হিসাব পর্যবেক্ষণ, চেকের অবস্থা অনুসরণ এবং কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কেম্ব্রিজের এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, প্রচলিত ডাকব্যবস্থার মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা দুর্বল হলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি এবং জালিয়াতির শিকার হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ অব্যাহত থাকবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

